টাকার লোভে নির্দোষ ব্যক্তিকে গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি



সেন্ট্রাল ডেস্ক ২

  • Font increase
  • Font Decrease
নিরপারাধ হয়েও গ্রেফতার। টাকা দিয়েও মুক্তি মেলেনি, উল্টো রিমান্ডে সয়েছেন নির্যাতন। সম্মান বাঁচাতে পরিবারের কাকুতি-মিনতি, আহাজারি, যুক্তি, প্রমাণ কিছুই কাজে আসেনি। গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি করে আদালতে তুলে চাওয়া হয় রিমান্ড। আদালত দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলে অমানুষিক নির্যাতন। তখনও ছিল একই আহাজারি- আমি নির্দোষ। কে শোনে কার কথা। রিমান্ড শেষে জেল হাজতে। দীর্ঘ সময় পর জামিন। কথাগুলো বলছিলেন ধর্ষক না হয়েও পুলিশের কারসাজিতে গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি হওয়া সাভারের আশুলিয়ার আউকপাড়া গ্রামের ভুক্তভোগী রাজ্জাক সিকদার। অভিযোগ উঠেছে, টাকা হাতিয়ে নিতে ও কম সময়ে নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা নিরাপরাধ রাজাজ্জক সিকদারকে গণধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি করেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আশুলিয়ার আউকপাড়া গ্রামে রাজ্জাক নামে দুই ব্যক্তি রয়েছেন। তাদের একজন রাজ্জাক সিকদার। রাজনীতিতে জড়িত বলে এলাকাবাসীর কাছে তিনি মন্ত্রী রাজ্জাক নামে পরিচিতি। অপরজন হোটেল ব্যবসা করেন বলে তাকে হোটেল রাজ্জাক নামে ডাকেন পরিচিতজনেরা। কথা আছে, নামে নামে জমে টানে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক শামীম হাসানের ঘৃণ্য কৌশলের শিকার হয়ে সেই জমের নাগাল পান মন্ত্রীখ্যাত নিরাপরাধ রাজ্জাক। প্রত্যেক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের বক্তব্য উপেক্ষা করে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত হোটেল রাজ্জাককে বাদ দিয়ে তিনি গ্রেফতার করেন ‘মন্ত্রী’ রাজ্জাককে। তখনকার আশুলিয়ায় থাকার সেই পুলিশ কর্মকর্তা বদলি হয়ে এখন শরীয়তপুর জেলায় কর্মরত। শামীম বদলি হওয়ার পর পরিদর্শক জাহিদুল আশুলিয়ায় থানায় যোগ দিলে ওই গণধর্ষণ মামলার তদন্তভার পড়ে তার ওপর। আর তখনই বেরিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য। মামলার অভিযোগ ও নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, গত বছরের ৮ আগস্ট আশুলিয়ায় দোসাইদে গণধর্ষণের শিকার হন বাউলশিল্পী এক তরুণী। এর একদিন পর অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে আশুলিয়া থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগী তরুণী। সেই রাতে পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তা শামীম হাসান মন্ত্রীখ্যাত রাজ্জাকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠান। প্রায় ৪৪ দিন জেলহাজতে থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন তিনি। আশুলিয়ার দোসাইদের আদর্শপাড়া গ্রামের ওই  বাড়িতে গণধর্ষণের শিকার বাউলশিল্পীকে স্থানীয়দের সহযোগিতায় উদ্ধার করে পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার সাক্ষীরা দাবি করেন, উদ্ধার হওয়া নারী সে সময় তাকে ধর্ষণের জন্য কয়েকজনের নামসহ হোটেল রাজ্জাকেই দায়ী করেছিলেন। তবু মন্ত্রী রাজ্জাকেই গ্রেফতার করে পুলিশ। এদিকে, মন্ত্রী রাজ্জাক গ্রেফতারের সুযোগ নেন অপরাধীর তালিকায় থাকা হোটেল রাজ্জাক। ইতোমধ্যে গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি। তারা ভাড়া বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোসাইদের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, মন্ত্রী রাজ্জাকের টাকা-পয়সা আছে, আর হোটেল রাজ্জাক দরিদ্র। ফলে টাকা হাতিয়ে নিতেই মন্ত্রী রাজ্জাককে বলির পাঠা বানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা শামীম হাসান। এমনকি মামলার অন্য আসামিদেরও চাপ সৃষ্টি করে রাজ্জাক সিকদারকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করার জন্য। ভুক্তভোগী রাজ্জাক সিকদার জানান, নিরপারাধ জেনেও সম্মান রক্ষায় টাকা দিয়ে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে আমার পরিবার। আমার বড় ছেলে জুয়েল ও বাড়ির ভাড়াটিয়া স্বপন নামে একজনকে দিয়ে গ্রেফতার হওয়ার রাতে এক লাখ ৭০ হাজার টাকা তুলে দিই পরিদর্শক শামীমের হাতে। পরদিন সকালে আরও ১০ হাজার টাকা স্বপনের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। কিন্তু রেহাই মেলেনি। উল্টো রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। প্রায় দেড় মাস পর জামিনে বের হয়েছি। আমি ও আমার পরিবারের সদস্যরা লজ্জায় বাড়ি বাইরে বেরুতে পারি না। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, আমাকে অব্যহতি দেওয়া হবে। কিন্তু আমার এই অপূরণীয় ক্ষতি কি আর পূরণ হবে? এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত এবং হয়রানিমুলক ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর জন্য পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক শামীম হাসানের বিচার দাবি করেন রাজ্জাক সিকদার। এ বিষয়ে রাজ্জাক সিকদারের প্রতিবেশী স্বপন জানান, শামীম স্যারের (তদন্ত কর্মকর্তা) দাবিমতো টাকা পৌঁছে দিয়েছি। তবু তিনি রাজ্জাক সিকদারকে ছাড়েননি। এ মামলার অন্য আসামি বর্তমানে জামিনে থাকা আতাউর রহমান অভিযোগ করেন, গ্রেফতারের রাতে চাপ সৃষ্টি করে মন্ত্রী রাজ্জাকে শনাক্ত করতে বলেন শামীম স্যার। কিন্তু আমি রাজি হয়নি। উল্টো স্যারকে বলেছি, নিরপারাধ ব্যক্তিকে আমি শনাক্ত করতে পারবো না। প্রত্যেক্ষদর্শী ও মামলার সাক্ষী ছালেহা বেগম জানান, অসুস্থ অবস্থায় ভুক্তভোগী নারীকে যখন উদ্ধার করা হয়। তখন কয়েকজনের নামের সঙ্গে হোটেল রাজ্জাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু পরে শুনি, নিরপারাধ মন্ত্রী রাজ্জাককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছি; কিন্তু কী হলো বুঝতে পারলাম না। এছাড়া যে ঘরে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে সেখানে হোটেল রাজ্জাক বাস করত। মন্ত্রীখ্যাত রাজ্জাক এই এলাকায় আসতেন না। স্থানীয় ইউপি সদস্য খালেক হোসেন ও এলাকাবাসী আতঙ্কের কথা জানিয়ে বলেন, পুলিশ যদি এভাবে তদন্ত না করে আসামি গ্রেফতার করে তাহলে আইনের প্রতি আস্থা কমে যাবে। এ ঘটনাকে আরও শক্ত করতে মমলা নামে নারীকে ভয় দেখিয়ে সেলিনা বানিয়ে আসামি করার অভিযোগ করেন একই মামলায় ভুক্তভোগী আরেক নারী। ওই নারী জানান, আমাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে জবানবন্দি নিয়েছেন ‘শামীম স্যার’। এসব কথা বললে ছেড়ে দেবে না হলে অকথ্য নির্যাতন করবে। তাই তিনি আমাকে যা বলতে বলেছেন আমি ভয়ে তাই তাই বলেছি। এ বিষয়ে মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ‘আমি রাজ্জাক সিকদারকে শনাক্ত করিনি। আমি তদন্ত কর্মকর্তা শামীম স্যারকে বলিনি যে, রাজ্জাক সিকদার জড়িত আছেন।’ এ বিষয়ে বদলি হওয়া পুলিশ পরিদর্শক শামীম হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নিজের সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, বাদীর শনাক্তের ভিত্তিতেই মন্ত্রী রাজ্জাককে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে যখন বলা হয়, নতুন তদন্ত কর্মকর্তা এ ধরনের কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ পাননি মন্ত্রী রাজ্জাকের বিরুদ্ধে, তখন শামীম হাসান আসামির তালিকা থেকে তার নাম বাদ দিতে বলেন। এ ছাড়া টাকা নেওয়ার বিষযটি অস্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম জানান, আমার তদন্তে যেসব তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। ফলে গত ডিসেম্বরে মন্ত্রীখ্যাত রাজ্জাককে এই মামলা থেকে অব্যহতি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি অভিযুক্ত হোটেল রাজ্জাককে মামলায় আসামির তালিকায় সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের কর্মকর্তার তদন্ত বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাঈদুর রহামন জানান, তদন্ত করে নিরাপারাধ ব্যক্তি মামলা থেকে বাদ দিয়ে প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি গাফিলতির প্রমাণ পেলে সাবেক তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।