২০ টাকার খেসারত দিতে মা বেছে নিলেন সন্তানদের

এই দুই সন্তানকে নিয়েই ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিতে চাইলেন মা নাজমা আক্তার, ছবি: বার্তা২৪

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, চট্টগ্রাম, বার্তা২৪.কম

স্বামী মনির হোসেন। পেশায় একজন ভ্যানগাড়ি চালক। স্ত্রী নাজমা আক্তার। বাসায় এলাকার ছেলে-মেয়েদের আরবি পড়ানো আর সেলাই মেশিনের কাজ করে সংসার চালাতেন। মনিসা আক্তার মীম (৯) ও ছেলে নাজমুল হাসান (৪) নিয়ে চলছিল তাদের দাম্পত্য জীবন।

মঙ্গলবার (১২ফেব্রুয়ারি) সকালে স্বামী ও স্ত্রী মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। নিজেদের মধ্যে ঝগড়ার খেসারত দিতে গিয়ে নাজমা বেছে নিলেন তার ফুটফুটে সন্তানদের।

দুপুর ৩টা ২০মিনিটে নগরীর ষোলশহর স্টেশন থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া শাটল ট্রেনে সন্তানদের নিয়ে ঝাঁপ দেয় নাজমা আক্তার। পরে স্থানীয়রা দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধারের পরেও সন্তানদের ওপর রাগ এতটা কমেনি। তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য রেললাইনের পাশে পুকুরে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করেন। এরপরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে। মা নাজমাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। আর তার সন্তানদের হাসপাতালে নিয়ে আসে।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে কলেজে (চমেক) হাসপাতালের ২৮নম্বর ওয়ার্ডে বাচ্চাগুলো এক পলক দেখতে নার্স, পুলিশ আর উৎসুক মানুষের ভিড় জমে। আবেগঘন পরিবেশ আর আক্ষেপ ছিল সবার চোখে-মুখে।

ভিড় টেলে খুঁজে ফিরছিলাম প্রত্যক্ষদর্শীর কাউকে। ওয়ার্ডের এক কোণে শার্ট আর জিন্সের প্যান্টে রক্তের চাপ কাদা আর পায়ে জুতো ছাড়া নিজামের চোখে তখনও ভাসছে ঘটনা।

কথার বলার এক পর্যায়ে সে বার্তা২৪.কম-কে জানান, বিকেল চারটার সময় বড়দিঘি পাড় এলাকায় তার বন্ধু টিটু দেখতে পায় ট্রেনের ক্রমশ হর্ন দিচ্ছে। কিন্তু লাইনে এক মহিলা তার বাচ্চা নিয়ে রেললাইন হেঁটে যাচ্ছে। ক্রমশ হর্নের পরেও নাজমা না সরায় টিটু দৌড়ে এসে রেললাইন থেকে ধাক্কা দিয়ে তাদের পাশে সরিয়ে নেন। ট্রেনের ধাক্কায় টিটু ডান হাতে আর আঘাত পান। মীম কাঁধে আর নাজমুল দুপায়ে জখম হয়। বাচ্চাদের ট্রেনে নিচে মারতে না পেরে পাশে পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে মারার চেষ্টার সময় সিএনজি চালক মো. বেলাল দ্বিতীয়বারের মতো বাচ্চাদের প্রাণ রক্ষা করেন।

পরে স্থানীয়দের সহায়তায় সিএনজি করে বাচ্চাদের হাসপাতালে নিয়ে আসে চালক। ওয়ার্ডের বেডে পাশাপাশি সুয়ে থাকা মীম তখনও ঘোরের মাঝে। নাজমুলকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। কিছুক্ষণ পর এসে উৎসুক মানুষ এসে বাচ্চার খোঁজ-খবর নিচ্ছিল। কেউ বা এসে এমন পাশবিক ঘটনার ধিক্কার জানান।

কানের পাশে এসে মীমের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে ভয়ে এদিক-সেদিক চেয়ে থাকে। জিজ্ঞেস করতেই মীম জানায়, সে দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। সকালে বাবা-মায়ের মধ্যে ২০টাকা নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। দুপুরে কাউকে না জানিয়ে মা তাদের নিয়ে বাসা থেকে বের হন। বিকেলে তাদের নিয়ে ট্রেনে ঝাঁপ দেয়। তারা কান্না করলেও মা ট্রেন থেকে সরেননি।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মীমের গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের আমানবাজার এলাকার হারুন জমিদারের ভাড়া বাসায়। তারা হাটহাজারী উপজেলায় বসবাস করেন। সকালে নিজেদের মধ্যের ঝগড়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও এর কারণ জানাতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) পুলিশ ফাঁড়ির এসএসআইন মো. আলাউদ্দীন তালুকদার বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ঘটনার পরে নাজমাকে হাটহাজারী থানায় হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। অসুস্থ বাচ্চাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

জাতীয় এর আরও খবর