‘আমার নামডা তো নিলাইন না’

উবায়দুল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, ময়মনসিংহ, বার্তা২৪.কম
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মসজিদ-মাদরাসার সামনের পথগুলো দখলে নিয়েছে ভিক্ষুকরা। হাঁটার জো নেই। দাঁড়াবার জায়গা নেই। সর্বত্রই ভিক্ষুকে ঠাসা। এসব ভিক্ষুকের জটলায় নারী, পুরুষ বা শিশু-কিশোর বলে কোনো কথা নেই। সবাই একদিনের ভিক্ষুক। কেউ পেশাদার, আবার কেউ মৌসুমী।

থালা-বাটি সামনে নিয়ে মানুষজন দেখলেই টাকা চাচ্ছেন। রোজগারের আশায় আগলে ধরছেন পথ। আর প্রত্যেকে খুশি মনেই হাত খুলে দান করছেন।

এদিকে ভিক্ষুকের জটলার কারণে যানজট লেগে যায় ময়মনসিংহ নগরী’র গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে। কিন্তু বছরের এই একটি দিনের জন্যই এসব ভিক্ষুকের অপেক্ষা। ফলে নিরাশ করছেন না কেউই।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, ঘটা করে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচিতে তবে কী ফল মিলেছে? ভিক্ষার হাত হবে কর্মের- এই মন্ত্র এখনো পৌঁছেনি এসব ভিক্ষুকদের কাছে। উল্টো প্রতিটি শবে বরাতেই ভিক্ষুকের সংখ্যাই যেন বাড়ছে।

আর কোনো সংবাদকর্মী এদিন ভিক্ষুকদের উপস্থিতি কাভারেজে গেলে তাদেরও ঘিরে ধরছেন ভিক্ষুকরা। সংবাদকর্মীর প্যাডের পাতায় নিজেদের নাম তুলতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তাদের বিশ্বাস খাতায় নাম উঠলেই দান-অনুদান মিলবে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/22/1555875728326.jpg

রোববার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যার পর নগরীর চরপাড়া, ভাটিকাশর, গুলকিবাড়ি, সানকিপাড়া, জিরো পয়েন্টের বুড়া পীরের মাজারসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।

‘আমার নামডা তো নিলাইন না’ এই প্রতিবেদককে উদ্দেশ্য করে জাহানারা (৫০) নামে এক ভিক্ষুকের হাঁক ডাক। তিনি থাকেন জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছনকান্দা গ্রামে। সরকার ভিক্ষুকদের রিকশা, ভ্যান, নগদ টাকা দিচ্ছে। আপনি পাননি এমন প্রশ্নে জাহানারার চোখ ছানাবড়া।

‘৭ বছর ধইরা ভিক্ষা করি। কেউ তো কোনোদিন আইলো না। কোনো সাহায্যও পাইলাম না। শখেতো আর রাস্তাত নামছি না। পেট তো চালাইতে অইবো। দুই পোলারে তো মানুষ করতে অইবো। তাগরে তো আর ভিক্ষুক বানাইবাম না।’ ফ্যালফ্যাল চোখে অসহায় জাহানারার এই উক্তিই বলে দিচ্ছে ময়মনসিংহে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

ময়মনসিংহে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। ২০১০ সালের দিকে ময়মনসিংহ থেকেই এই কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরুতে ৩৭ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করতে রিকশা, ভ্যানসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি তুলে দেওয়া হয়েছিল।

এরপর এই কর্মসূচি মুখ থুবড়ে পড়ার পর আবারো ভিক্ষুকদের দিকে নজর দেয় সরকার। ঘটা করে গত বছর ফুলপুরে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস। ওই সময় ২৫ জন ভিক্ষুককে রিকশা, সেলাই মেশিন, চায়ের দোকান ও ঝাল মুড়ির ভ্যান দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু মাত্র কয়েক মাস যেতেই কী হলো? ফুলপুর থেকেও কয়েকশ ভিক্ষুক নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে থালা-বাটি নিয়ে বসে গেছেন। এ উপজেলা থেকেই আসা একজন সাংবাদিক পরিচয় দিতে আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকলেন। ওই নারী বলেন, ‘সরকার আমরার দিকে চাইয়াও দেহে নাই। দেখলে কী আর ভিক্কা করতাম।’

জেলার ত্রিশাল উপজেলা থেকে আসা রাশিদা (৪৫) দলবল নিয়ে ভিক্ষা করছেন নগরীর বুড়া পীরের মাজার সংলগ্ন এলাকায়। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন কোলের সন্তানকেও। রাশিদা জানান, অভাবের সংসারে টিকে থাকতে ভিক্ষাই তার পেশা। প্রায় ৫ বছর যাবৎ এ পেশাতে আছেন তিনি।

নগরীতে ভিক্ষুকদের আধিক্যে সমালোচনা করছেন অনেকেই। নগরীর ভাটিকাশর এলাকার ব্যবসায়ী সানোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কাজের কাজ তো কিছুই হলো না। শুনলাম ময়মনসিংহ থেকেই ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এদের কারণে আমাদের জেলার মান-সম্মান হানি হচ্ছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের দৃষ্টি দেওয়া উচিত।’

ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্পর্কে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘আমরা জেলার ১৩ উপজেলায় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন করার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৭ হাজার ভিক্ষুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রতি মাসে তাদের নগদ টাকাও দেয়া হচ্ছে। আজ (শবে বরাত) যারা ভিক্ষা করছে তাদের বেশিরভাগই মৌসুমী ভিক্ষুক।’

আপনার মতামত লিখুন :