রোজার আগে খাদ্য নিরাপত্তায় প্রয়োজন সাঁড়াশি অভিযান



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
বিষাক্ত জেলি মেশানো চিংড়ি/ ফাইল ছবি: বার্তা২৪

বিষাক্ত জেলি মেশানো চিংড়ি/ ফাইল ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

রোজাকে সামনে রেখে খাদ্যে ভেজাল দানকারী ও মজুদদার চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন হিমাগারে পাওয়া যাচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ, নষ্ট ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য সামগ্রী।

প্রশাসনের চোখ এড়াতে রাজধানী ছাড়িয়ে মফস্বলের হিমাগারেও মজুদ করে রাখা হয়েছে বিপুল পরিমাণ খেজুর, মিষ্টি, ফল, মাংস। কম দামে নিম্নমানের খাবারগুলো কিনে রমজানের সময় চড়া দামে বাজারে ছেড়ে উচ্চ মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার মতলবে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র এহেন অপকর্ম করছে।

সম্প্রতি খাদ্য নিরাপত্তা বিনষ্টের এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন অভিযানেও আটক হয়েছে ভেজাল ও নষ্ট খাদ্য সামগ্রীর বিরাট মজুদ।

খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা বার্তা২৪.কমকে জানিয়েছেন, পবিত্র রমজানের আগে বিভিন্ন ধরনের নিম্ন ও বিপজ্জনক মানের প্রচুর খাদ্য গুদামজাত করেছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। অভিযানে অনেক পণ্য জব্দ করা হচ্ছে।

তবে ভোক্তা অধিকারের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, প্রশাসনের গতানুগতিক অভিযান ভেজালের বন্যা থামাতে পর্যাপ্ত নয়। প্রয়োজন সাঁড়াশি তল্লাশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বার্তা২৪.কমকে জানায়, সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা, কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত এগারসিন্দুর, ভৈরব, চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বিপুল ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য সামগ্রী জব্দ করে নষ্ট করা হয়েছে।

বিমানবন্দর এলাকার বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সবজি ও মৎস্য হিমাগারে আগে বানানো, পচা ও পুরনো মিষ্টি রেখেছিল উত্তরার নামী প্রতিষ্ঠান আলী বাবা সুইটস। সেই হিমাগারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে অভিযান চালায় র‌্যাব। র‌্যাবের অভিযানের সময় হিমাগার থেকে ১৫ মণ খেজুর, ২০০ মণ আমদানি করা পচা মাংস, ১১০ মণ মিষ্টিসহ মেয়াদোত্তীর্ণ বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় রেন পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিংকে ১৫ লাখ টাকা, আলী বাবা সুইটসকে ১০ লাখ টাকা ও ইউনিভার্সেল ট্রেডিং হাউজকে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

আরেক অভিযান পরিচালিত হয়
কিশোরগঞ্জে গত ২৮ এপ্রিল। জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজে অভিযান চালায় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। হিমাগারের ২৪টি প্লাস্টিকের ড্রামে মেয়াদোত্তীর্ণ ২৪ মণ মিষ্টির সন্ধান পায় তারা। ৬০টি কার্টনে ১৫ মণ মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুরও পাওয়া যায়।
২৪ মণ মিষ্টি কিশোরগঞ্জ জেলা সদরে অবস্থিত সবচেয়ে নামি ও সুপরিচিত মিষ্টির দোকান হিসেবে খ্যাত মদন গোপাল সুইটস কেবিনের বলে নিশ্চিত হন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। আগামী ৬ মে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য দিনে মিষ্টির ব্যাপক চাহিদাকে মাথায় রেখে অধিক মুনাফার আশায় এই বিপুল পরিমাণ মিষ্টি মজুদ করা হয় বলে অভিযান পরিচালনাকারী জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জানায়।

অন্য আরেক অভিযানেও বিপুল মালামাল জব্দ হয় বন্দর শহর ভৈরবে। আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ভৈরব উপজেলার কয়েকজন ব্যবসায়ী ৬০টি কার্টনে ১৫ মণ মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর মজুত রাখেন বলে প্রশাসন সূত্রে জানা যায়।

ভেজাল ও নিম্ন মানের খাদ্য বিরোধী অভিযানকালে জব্দ করা মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি ড্রাম থেকে মাটিতে ফেলে বালু দিয়ে নষ্ট করা হয়। এছাড়া ১৫ মণ খেজুর আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়। এ ঘটনায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এর ৫১ ধারায় মেয়াদোত্তীর্ণ মালামাল সংরক্ষণের দায়ে এগারসিন্দুর কোল্ড স্টোরেজ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

তবে কিশোরগঞ্জের ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের কয়েকজন নেতা বার্তা২৪.কমকে অভিযোগ করেন যে কোল্ড স্টোরেজকে জরিমানা করা হলেও মিষ্টি ও খেজুরের মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে জেলার নাগরিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

যারা ভেজাল দেয় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের ব্যানারে একটি সংগঠন মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) জেলা শহরে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এবং অভিযুক্তদের দ্রুত শাস্তির দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবরে স্মারকলিপি দেয়।

কয়েকজন চিকিৎসক ও রসায়নবিদ বার্তা২৪.কমকে এ প্রসঙ্গে বলেন, 'সাধারণ হিমাগারে কোনো মতেই তৈরি ও পচনশীল খাবার রাখা উচিত নয়। স্বাস্থ্য বিধির দিক দিয়ে এহেন কাজ খুবই বিপজ্জনক, স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।'

তারা বলেন, 'হিমাগারের পরিবেশে সংরক্ষিত খাদ্যে অন্যান্য স্থানের তুলনায় জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি শতগুণ বেশি। তাই জনস্বার্থে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।'

রোজার আগে নষ্ট ও মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি, খেজুর ও খাদ্য সামগ্রী মজুদ ও বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ প্রশাসনিক অভিযানের পাশাপাশি র‌্যাবের মাধ্যমে দেশব্যাপী চিরুনি অভিযান চালিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে আসছে নাগরিক সমাজের অধিকার নিয়ে আন্দোলনরত বিভিন্ন সংগঠন। রমজানে হাট-বাজারের খাদ্য নিরাপত্তা ও ভেজাল দূরীকরণে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কঠোর নির্দেশনা প্রত্যাশা করছেন তারা।