চাল রফতানিতেই সমাধান খুঁজছে সরকার

ইসমাঈল হোসাইন রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ধানের দাম বাড়াতে চাল রফতানির চিন্তা করছে সরকার/ ছবি: সংগৃহীত

ধানের দাম বাড়াতে চাল রফতানির চিন্তা করছে সরকার/ ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

সরকার ৩৬ টাকা কেজি দরে চাল কিনলেও প্রভাবশালী, মিলার ও সরকারি কর্মকর্তাদের কারণে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। খাদ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ধান কেনা শুরু করলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌড়াত্ম্যে বাজারে সৃষ্টি হয়েছে নতুন সংকট। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বোরো আবাদ বেশি হওয়ায় কিছুতেই বাড়ছে না ধানের দাম। এক্ষেত্রে দেশের চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত চাল বিদেশে রফতানি করার পরিকল্পনা করছে সরকার।

বোরা মৌসুমের ৫০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। কিন্তু ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের। এবার প্রতি মণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা। ফলে প্রতি মণে কৃষকের লোকসান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তবে ধানের দাম ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা হলেও বাজারে মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে গড়ে ১৬০০ থেকে দুই হাজার টাকায়। ফলে প্রতি মণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দখলে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৪৫০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে ধানের ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ো হাওয়ার কারণে অনেক এলাকায় ধান পড়ে গেছে। সেই সঙ্কট শেষ হতে এখন মধ্যস্বত্বভোগীদের কবলে পড়ছেন কৃষকরা। বরাবরই কৃষকদের কাছ থেকে না কিনে মিল মালিকদের কাছ থেকে ধান কিনে সরকার। ফলে মধ্যস্বত্বভোগীরা সংকট সৃষ্টি করার সুযোগ পায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/15/1557934323946.png

তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তারা চাল রফতানির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে ৪৮ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে আট লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড, ৩৯ লাখ ৬০ হাজার হেক্টরে উফশী ও ৩২ হাজার হেক্টরে স্থানীয় জাতের ধান আবাদ করা হয়েছে।

বোরো আবাদে শীর্ষে রয়েছে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর, যশোর, বরিশাল ও চট্টগ্রাম অঞ্চল। আর ধান কাটায় এগিয়ে রয়েছে হাওড় অঞ্চলের জেলাগুলো। হাওড় অঞ্চলের সাত জেলায় প্রায় শতভাগ জমির ধান ঘরে তোলা হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে পিছিয়ে রয়েছে উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি জেলা ও রাজধানীর আশপাশ, বিশেষ করে ময়মনসিংহ ও কুমিল্লা অঞ্চল।

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘সরকার ৩৬ টাকা দিয়ে চাল কিনলেও কৃষক সেটা পাচ্ছে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে হাওড় এলাকা থেকে ধান কিনেছে। ধানের উৎপাদন বেশি হওয়ায় সরকারের ক্রয় অভিযান এবার কাজে আসবে না।’

চাল রফতানির পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন, ঘোষণা দিয়েও যথাসময়ে সরকার ধান সংগ্রহ না করাসহ নানা কারণে উৎপাদন মূ্ল্যের চেয়েও বাজারে ধানের দাম কম। এখন চাল রফতানি করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না।’ কৃষকদের স্বার্থে ধানের পরিবর্তে বিকল্প শস্য উৎপাদনেরও পরিকল্পনার কথা জানান কৃষিমন্ত্রী।

এদিকে সিরাজগঞ্জে ধান ও চাল ক্রয় উদ্বোধন শেষে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত চাল বিদেশে রফতানি করার পরিকল্পনা করছে সরকার।’

তিনি বলেছেন, ‘সরকারিভাবে ধান ও চাল কেনার কারণে যেন বাজারে তার প্রভাব পড়ে। ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো রকম অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। মধ্যস্বত্বভোগীরা যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।’

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় ধান পেকে গেছে। অনেক জায়গায় রাত-দিন পরিশ্রম করে ধানকাটা হচ্ছে। আবার কোথাও শ্রমিক সঙ্কটের কারণে থেমে আছে। শ্রমিক সঙ্কটে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও। এক মণ ধান বিক্রি করেও একজন শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করা যাচ্ছে না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/15/1557934354040.jpg

ধান কাটার যন্ত্র দিয়ে ১০০ শ্রমিকের কাজ করা যায়। এক্ষেত্রে সেই মেশিনটি কিনতে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে সেই ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানো গেলে সমস্যা অনেকটাই সমাধান হবে। কৃষকদের ভর্তুকি যদি একটু বাড়ানো যায় অর্থাৎ সার, বীজ, সেচের ক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়াতে পারলে উৎপাদন খরচ কমে আসবে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার চুটলিয়া গ্রামের কৃষক আবু কালাম বার্তা২৪.কমকে জানান, এ বছর প্রতি বিঘা বোরো ধান আবাদ করতে সেচ খরচ চার হাজার টাকা, সার খরচ চার হাজার, পরিচর্যা তিন হাজার, ধান কেটে ঘরে তুলতে শ্রমিক খরচ পাঁচ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এক বিঘায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আর ৩০ মণ ধান বাজারে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে।

খাদ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, বোরো মৌসুমে ১২ লাখ ৫০ হাজার টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০ লাখ টন সেদ্ধ ও দেড় লাখ টন আতপ চাল। এছাড়া ধান সংগ্রহ করা হবে দেড় লাখ টন (এক লাখ টন চালের সমপরিমাণ)। প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ধরা হয়েছে ২৬ টাকা। প্রতি কেজি সেদ্ধ চাল ৩৬ ও আতপ চালের সংগ্রহ মূল্য ৩৫ টাকা ধরা হয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল শুরু হওয়া ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।

আপনার মতামত লিখুন :