Alexa

শিগগিরই দূর হচ্ছে ক্যাডার বৈষম্য

শিগগিরই দূর হচ্ছে ক্যাডার বৈষম্য

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, ছবি: বার্তা২৪.কম

বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই স্বপ্ন থাকে লেখাপড়া শেষে ভালো কোথাও চাকরি করার। আর সেটা যদি হয় বিসিএস’র মাধ্যমে, তাহলে স্বপ্নের ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে যায়। তবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে যখন কেউ উত্তীর্ণ হন, তখন ক্যাডার আর নন-ক্যাডারভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করা হয়।

যারা একটু বেশি নম্বর পান, তাদের স্থান হয় ক্যাডারে আর কম নম্বর প্রাপ্তদের স্থান হয় নন-ক্যাডারে। ফলে এক ধরনের বিভাজন সৃষ্টি হয় শুরু থেকেই।

আবার ওই ক্যাডারের মধ্যেও রয়েছে বৈষম্য। যারা প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পান, তারা শুরু থেকেই বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। অথচ একই গ্রেডে চাকরিতে যোগদান করে কয়েকটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা যখন পদোন্নতি পেয়ে সচিব, সিনিয়র সচিব বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হচ্ছেন, তখন অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ক্যাডার বৈষম্য নিয়ে প্রশাসন ক্যাডার ও অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলে আসছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন বৈষম্য প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে।

অথচ ক্যাডার বৈষম্য দূর করতে ১৯৭৫ সালের চাকরি পুনর্গঠন ও শর্তাবলী অ্যাক্টেই সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে। সেই অ্যাক্ট অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাডারে একই গ্রেডের কর্মকর্তারা সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন। তাদের মধ্যে বেতন বা অন্য কোনো বৈষম্য করা যাবে না। কিন্তু সুদমুক্ত গাড়ি কেনার সুবিধা ও সুপারনিউমারারি পদন্নোতির অতিরিক্ত সুবিধা প্রশাসন ক্যাডাররাই পেয়ে আসছেন। এক্ষেত্রে অন্যরা বঞ্চিত। যা ওই অ্যাক্টের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিষয়টির সুরাহা চাইতে বিসিএস ২৬ ক্যাডার সমন্বয় কমিটি ২০১২ সালের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন। সেসময় প্রধানমন্ত্রী তার জনপ্রশাসন বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে ক্যাডার বৈষম্য দূর করার নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ওই কমিটি প্রধানত তিনটি বৈষম্য দূর করার জন্য কাজ শুরু করে। সেই প্রধান তিন বৈষম্য হচ্ছে-প্রতিটি ক্যাডারে একটি করে গ্রেড-১ পদ থাকতে হবে, সব ক্যাডারের কর্মকর্তা চতুর্থ গ্রেডের টাইম স্কেল পাবেন (যা আগে শুধু প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পেতেন) এবং সব ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দেওয়া হবে।

পরে সেই সুপারিশের প্রথম ও দ্বিতীয়টি আংশিক মানা হলেও বাস্তবায়ন হচ্ছে না সুপারনিউমারারি পদোন্নতির সুপারিশ। অথচ প্রশাসন ক্যাডারে পর্যাপ্ত পদ না থাকা সত্ত্বেও পদের অতিরিক্ত সুপারনিউমারারি পদোন্নতি পাচ্ছেন। কিন্তু অন্যান্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। ইদানিং পুলিশ ও শিক্ষা ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদন্নোতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা এখনও কোনো আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। এনিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা দক্ষতা বাড়াতে বছর ধরেই চাকরি জীবনে একাধিকবার বিভিন্ন দেশে একাধিক প্রশিক্ষণ কোর্সে যাচ্ছেন, কিন্তু কয়েকটি ক্যাডার বাদে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে পুরো চাকরি জীবনে একবারও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ জুটছে না। যা এক ধরনের বৈষম্য বলে মনে করছেন তারা। এছাড়াও প্রশাসন ক্যাডার বাদে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সম্প্রতি উপ সচিব ও তার ওপরের গ্রেডের কর্মকর্তারা বিনা সুদে গাড়ি কেনার সুবিধা পেলেও একই গ্রেড বা উপ-সচিব সমমানের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যা অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে। সেই ক্ষোভ থেকে এরই মধ্যে কৃষি ক্যাডারের কর্মকর্তারা হাইকোর্টে একটি রিটও করেছেন।

বিদ্যমান ক্যাডার বৈষম্য নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের কাছে। তিনি গত ১৩ মে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাৎকারে বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমরা সবার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমাদের যে প্রস্তুতি রয়েছে তাতে আমরা হয়তো খুবই অল্প সময়ের মধ্যে বৈষম্য দূর করে নিশ্চিত সমাধান দিতে পারব। আমরা সব ক্যাডারের মধ্যে আন্তঃবৈঠক করেছি। আশা করি, ১৫ দিনের মধ্যে ভালো সমাধান উপস্থাপন করতে পারব।

এ বিষয়ে বিসিএস ২৬ ক্যাডার সমন্বয় কমিটির প্রচার সম্পাদক শ ম গোলাম কিবরিয়া বার্তা২৪.কমকে বলেন, ক্যাডার বৈষম্যটা দীর্ঘ দিন ধরেই চলে আসছে। এখন বর্তমান মন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে চান, তাহলে হয়তো সমাধান হবে।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা যদি চাকরি এত বছর হয়েছে তার ভিত্তিতে পদোন্নতি পেতে পারেন, তাহলে অন্যান্য ক্যাডারে নিয়োজিতরাও কেন পাবেন না? বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় সংসদে চাকরি পুনর্গঠন ও শর্তাবলী অ্যাক্টেই উল্লেখ করা আছে, কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এখন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ৩০ লাখ টাকায় সুদমুক্ত গাড়ি কেনার যে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, সেটা ওই শর্তাবলীর পরিপন্থি। এর একটা যৌক্তিক সমাধান হওয়া উচিত।

মন্ত্রীর কথা অনুযায়ী যদি এবার সেই ক্যাডার বৈষম্যের অবসান ঘটে, তাহলে দীর্ঘ দিনের পুঞ্জিভূত সমস্যার অবসান ঘটবে। পাশাপাশি সরকারি কাজের অগ্রগতিও বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করছেন, আসলেই সমাধান হবে কি না সেটা সময়ই বলে দেবে।

 

আপনার মতামত লিখুন :