Alexa

সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহে কচ্ছপ গতি

সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহে কচ্ছপ গতি

পুরনো ছবি

কচ্ছপ গতিতে চলছে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ। যে কারণে মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে কৃষকরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার দ্রুত ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করলে বাজারে দুই ধরনের প্রভাব পড়তো। চাষিরা লাভবান হতেন এবং মিল মালিকরা বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করতেন। ফলে প্রতিযোগিতা তৈরি হতো এবং প্রান্তিক চাষিরা ধানের দাম পেতেন।

অভিযোগ আছে, ধান-কাটা ও মাড়াই শেষ হতে চললেও অনেক উপজেলায় ধান সংগ্রহ শুরুই হয়নি। অথচ গত ২৫ এপ্রিলথেকে ধান-চাল সংগ্রহের ঘোষণা দেয় সরকার। ঘোষণার এক মাসে (২২ মে পর্যন্ত) মাত্র ২ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহকর হয়েছে।

সরকার দ্রুততার সঙ্গে ধান-চাল ক্রয় শুরু করলে দু’ধরনের প্রভাব পড়তো বাজারে। একদিকে কিছু চাষি সরাসরি সরকারকে দিয়ে লাভবান হতে পারতো। অন্যদিকে মিল মালিকরা বাজারে নামতে বাধ্য হলে বাজারে প্রতিযোগিতার তৈরি হতো। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুযোগ কমে যেত। প্রান্তিক চাষিরা অনেকটা লাভবান হতো।

কিন্তু ধান-কাটা মাড়াই শেষ হতে চললেও অনেক উপজেলায় ধান সংগ্রহের কাজ শুরুই করতে পারেনি সরকার। অথচ সরকারিভাবে গত ২৫ এপ্রিল থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করার ঘোষণা ছিল। ঘোষণা অনুযায়ী ১ মাস কাল অতিবাহিত হলেও (২২ মে পর্যন্ত) মাত্র ২ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।

খাদ্য অধিদফতরের (এমআইএসএন্ডএম বিভাগ) অতিরিক্ত পরিচালক মো. আনিসুজ্জামান বার্তা২৪.কমকে জানিয়েছেন, মৌসুমে সারা দেশের প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে (সর্বোচ্চ ৩ টন) দেড় লাখ টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ২২ মে পর্যন্ত ২ হাজার ৫৪৩ মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে। আর সাড়ে ১১ লাখ টন চালের বিপরীতে সংগ্রহ করা হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন।

ধান সংগ্রহের ধীরগতি প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘কৃষি বিভাগ থেকে প্রকৃত চাষিদের তালিকা পেতে বিলম্ব হওয়ায় ধান সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে। এখন দ্রুতগতিতে ধান-চাল সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের ২০টি মনিটরিং টিম মাঠে নামানো হয়েছে। কোথাও কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইচ্ছা করে ধান-চাল ক্রয়ে বিলম্ব করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’

খাদ্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক (সংগ্রহ) সাইফুল কবীর খান বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘অর্থ বরাদ্দের কোনো সংকট নেই। পুরোদমে ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কৃষি বিভাগ ইচ্ছা করেই কৃষদের তালিকা দিতে বিলম্ব করেছে। তাদের কাছেতো এটা রেডি থাকার কথা। তাদের ওয়েব সাইটেও এটা থাকা উচিত। কারণ আমরা ১০ টাকায় কৃষকদের অ্যাকাউন্ট করে দিয়েছি। সেই তালিকাটা হালনাগাদ করলেই তো হয়। এখানে নিয়ম হচ্ছে তারা স্লিপ দেবে, সেভাবে প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ধান কেনা হবে।’

ধানের দাম না পওয়ার প্রতিবাদে সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজন কৃষক ধানক্ষেতে আগুন দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও বাজারের কোনো উন্নতি হয়নি।

বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সরকার ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করলে সাধারণত বাজার উর্ধমুখী হয়। কিন্তু এবার সেটা না হওয়ায় ফড়িয়ারা সুযোগ নিচ্ছে। সরকার ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান-চাল সংগ্রহের সময় নির্ধারণ করে।

চলনবিল এলাকায় আমিনুল ইসলাম নামের একজন চাষি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘হাওর ও চলনবিল অঞ্চলে এপ্রিলের শুরুতে ধান কাটা-মাড়াই শুরু হয়। বন্যার সম্ভাবনা থাকায় ১০-১৫ দিনের মধ্যে ধান কাটা-মাড়াই শেষ হলেও কৃষকরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারছেন না।’

বোরো ধান সংরক্ষণ করা খুবই কঠিন। আবার প্রান্তিক চাষিদের অর্থের প্রয়োজন। তাদেরকে ধান বিক্রি করেই মজুরি মেটাতে হয়। সে কারণে ধান ধরে রাখার সময় এবং সুযোগ অনেক প্রান্তিক কৃষকের থাকে না। তারা বাধ্য হন মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে বিক্রি করতে। তাই অনেকেই মনে করেন বোরো ধান এপ্রিলের শুরু থেকে সংগ্রহ শুরু করা জরুরি।

আবার মিল মালিকদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করার অভিযোগও তুলছেন কেউ কেউ। অনেক গোডাউনে ধানের পরিবর্তে চাল নেওয়া হচ্ছে। এতে হতাশ হচ্ছে চাষিরা।

এদিকে, লোকাল সাপ্লাই ডিপোর (এলএসডি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কৃষকদের  অভিযোগ, ডিপোতে ধান নিয়ে গেলেও বলা হয় আদ্রতা ঠিক নেই, গোড়াউনে জায়গা নেই। আবার অনেক সময় মিলারদের সঙ্গে যোগসাজসে টিআর কাবিখারচালানে কাগজ ট্রানজেকশন দেখানো হয়। অর্থাৎ মিলাররা প্রকল্প চেয়ারম্যানের কাগজ কিনে নেন কমদামে।এরপর সেই চালপ্রথমে বের করা দেখানো হয়, আবার পরক্ষণেই গুদামে লোড দেখানো হয়। প্রকৃত অর্থে চাল লোড-আনলোড করা হয় না।শুধু কাগজে কলমে বিতরণ ও ক্রয় দেখানো হয়। ফলে বাজারে প্রভাব কম পড়ে। কঠোর মনিটরিং ছাড়া এটা রোধ করা কঠিন।

চলতি মৌসুমে ধানে বাম্পার ফলন হয়েছে। এবার ৪৭ লাখ ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এতে ১ কোটি ৯০ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। সরকারিভাবে খাদ্য মজুদের সক্ষমতা রয়েছে মাত্র সাড়ে ২১ লাখ টন। বর্তমানে ১১ লাখ ৩১ হাজার টন চাল, ২ হাজার ৫৪৩ টন চাল ও ২ লাখ ৯৭ টন গম সরকারি গুদামগুলোতে মজুদ রয়েছে বলে খাদ্য অধিদফতর জানিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :