Alexa

জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই খাল খনন

দলিল হাতে দিনভর জমি পাহারা দিচ্ছেন রহিমা

দলিল হাতে দিনভর জমি পাহারা দিচ্ছেন রহিমা

জমি হারানোর শঙ্কায় দলিল হাতে পাহারা দিচ্ছেন রহিমা বেগম/ ছবি: বার্তা২৪.কম

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের বৃদ্ধা রহিমা বেগম (৭০)। দলিল-পর্চাসহ কাগপত্র নিয়ে গেল সপ্তাহ ধরে দিনভর জমি পাহারা দিচ্ছেন। শনিবারও (২৫ মে) তীব্র রোদ উপক্ষো করে জমি পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি। তার পিছনের জমিতে চলছে ভ্যাকু দিয়ে খাল খনন। দুপুর দেড়টার দিকে সেখানে গিয়ে কাগজ নিয়ে জমিতে বসে থাকার কারণ জানতে চাইলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন বৃদ্ধা রহিমা।

জানালেন, ৪৮ বছর আগে স্বামী হারানো রহিমার শেষ সম্বল ১৮ কাঠা জমি। ঐ জমির এক কোণে তার ছোট্ট কুঁড়েঘর। চলতি বছর জমি থেকে ১৮ মণ ধান পেয়েছেন। এ ধানেই সংসার চলে তার। পাঁচ মেয়ের সবাইকে বিয়ে দিয়েছেন। আয়ের উৎস জমিটুকুই। যা হারানোর শঙ্কায় ক্ষণ গুণছেন তিনি।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/25/1558793404549.jpg
রহিমা বেগমের ঘর/ ছবি: বার্তা২৪.কম

 

রহিমা বেগম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘ক’দিন আগেও এই জমিতে ছয়টি মেহগনি গাছ ছিল। খাল খোঁড়ার কথা বলে অপরিচিত লোকজন এসে তা কেটে ফেলেছে। এলাকার অনেক হোমড়া-চোমড়া নেতাদের কাছে গেছি, সবাই বলছে- তারা কিছুই করতে পারবে না। এত জায়গা রেখে আমার জমিটুকুই কি ওদের (প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা) নজরে পড়ল!’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুকনো মৌসুমে পানি রাখা ও বর্ষা মৌসুমে নিষ্কাশনের জন্য বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন (বিএমডিএ) কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন নিয়ে খনন কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী- বাঘার মোশিদপুর থেকে নওটিকা আরিফপুর পর্যন্ত আট দশমিক দুই কিলোমিটার জমিতে খাল খনন করা হবে।

স্থানীয়রা বলছেন, অধিগ্রহণ ছাড়াই ফসলি জমিতে খাল খনন প্রকল্প অনুমোদন করানো হয়েছে। যা বাস্তবায়ন হলে এলাকার কৃষকদের না খেয়ে থাকতে হবে।

বিএমডিএ’র প্রকৌশলীরা বলছেন, কোনো প্রকার সার্ভে না করেই প্রকল্প শুরু করার কারণে এমনটি হচ্ছে।

রহিমা বেগম যে জমি পাহারা দিচ্ছেন তার পাশের জমিতে ধান কাটছিলেন চন্ডিপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামের আশাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘অনুমোদিত প্রকল্পের সম্পূর্ণটা ফসলি জমি। আমাদের কিছু না জানিয়ে, ভূমি অধিগ্রহণ না করে প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। আমার সব মিলিয়ে ৩২ কাঠার মতো জমি আছে। খাল খনন হলে প্রায় সবটুকু খালে চলে যাবে।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/25/1558793673420.jpg

চাকিপাড়া গ্রামের এক একর ৩২ শতাংশ জমির মালিক একরামূল হক। যার সবটুকু খনন প্রকল্পের আওতায় পড়েছে। তিনি বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘৩৫ বছর আগে খাল খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেয়। তখনও আমাদের বাপ-চাচারা কাগজপত্র দেখানোয় জমির উপর দিয়ে আর খাল খনন করেনি। এখন অধিগ্রহণ ছাড়াই গোপনে প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে খাল খনন প্রকল্প চলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ৩০ জন ভুক্তভোগী একসঙ্গে আদালতে মামলা করেছি। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছি। বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না প্রশাসন ও প্রকল্পের লোকজন। প্রকল্পের টাকায় আর্থিকভাবে লাভবান হতে বিএমডিএ ও স্থানীয় প্রশাসন ফসলি জমিতে খাল খনন করতে মরিয়া।’

এদিকে, ফসলি জমি দখল করে খাল খনন বন্ধের দাবিতে শনিবার (২৫ মে) দুপুরে উপজেলার চন্দ্রগাথী গ্রামে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা। কর্মসূচিতে দুই শতাধিক জমির মালিক জমির কাগজপত্র নিয়ে মানববন্ধনে অংশ নেন। তারা ভূমি অধিগ্রহণ করে খাল খননের দাবি জানান।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/May/25/1558793643046.jpg

মানববন্ধনের খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন রেজা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে এসে খাল খনন ও মানববন্ধন কর্মসূচি দুটোই বন্ধ করে দেন।

জানতে চাইলে ইউএনও বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘খাল খননের বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ঝামেলা হচ্ছে শুনে সেখানে গিয়েছিলাম। খনন কাজ একদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়ে এসেছি। ভুক্তভোগীদের বলেছি- একদিনের মধ্যে তারা যেন উপযুক্ত কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা প্রশাসনকে দেখায়। কাগজপত্র দেখার পর এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

জানতে চাইলে বিএমডিএ-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী খান জাফরুল মাহমুদ মেহেদী বলেন, ‘স্থানীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সুপারিশে খাল খনন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের আওতায় পড়া জমি সার্ভে করার সুযোগ পাওয়া যায়নি। সার্ভে করা গেলে হয়তো এমন অসুবিধায় পড়তে হতো না।’

আপনার মতামত লিখুন :