‘আয়রনের ছ্যাঁকার ভয়ে আম্মারে কিছু কই নাই’

উবায়দুল হক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ময়মনসিংহ
হাসপাতালের বিছানায় গৃহকর্মী লিমা খাতুন/ ছবি: বার্তা২৪.কম

হাসপাতালের বিছানায় গৃহকর্মী লিমা খাতুন/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

‘আন্টির বাসায় যাওয়ার পর মাস দুয়েক ভালাই আছিলাম। গত রমজানে বাড়ি আসার কথা কওয়ার পর থেইকাই নির্যাতন শুরু অয় আমার উপরে। বাড়ির নাম নিলেই সমানে পিটাইতো।’

‘আন্টিরে কইছিলাম, আমার বেতন দিয়া দেন আমি বাড়ি যামু গা। এই কথা শোনার পর আমারে আয়রন গরম কইরা ছ্যাঁকা দিছে। আন্টি কইতো, বাড়ির নাম নিবি না আর তর মা’রে বলবি না। আয়রনের ছ্যাঁকার ভয়ে আম্মারে কিছুই কই নাই।’

বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁপা-কাঁপা গলায় এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন গৃহকর্ত্রীর অমানুুষিক নির্যাতনের শিকার হওয়া গৃহকর্মী লিমা খাতুন (১৫)।

এ সময় দেখা যায়, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ পুড়া, মুখের সামনের পাটির দুটি দাত ভাঙ্গাসহ বেশকিছু ক্ষত চিহ্ন।

লিমার অভিযোগ, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট কচুক্ষেত এলাকার চৈতালী ১/ডি ব্লকে সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার বাসায় গত দুই মাস ধরে চলে এমন নির্যাতন।

লিমা বলেন, ‘তালা দিয়া মাইরা দাঁতও ফালাইয়া দিছে। আন্টি মারার পর তার ছেলে রড দিয়া মারতো। এরপর আরেক কাজের মেয়েরে দিয়া পিটানো হইতো। এমন মাইর কোনো মানুষরে কেউ মারে না। ব্যাথার চুটে যহন বড়ি (ট্যাবলেট) চাইতাম তখন তাও আইন্না দিছে না।’

অভিযুক্ত গৃহকর্ত্রী মীম নিহত সেনা কর্মকর্তা তানভীরের স্ত্রী বলে জানা গেছে। আর নির্যাতিতা লীমা হালুয়াঘাট উপজেলার কৈচাপুর ইউনিয়নের দর্শারপাড় গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে।

লীমার মা লিপি বেগম বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, ‘চার মাস আগে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা বেতনে কাজের কথা বলে আমাদের পাশের গ্রামের আছিয়া আক্তার ওই বাসায় নিয়ে যায়। গত রমজানে সে বাড়িতে আসতে চাইছিলো কিন্তু পরে আবার না করছে। সে তো আর এইসব মারধরের আমারে বলতো না ভয়ে। আর আমি যেহেতু চিনি না তাই দেখতে যাইতেও পারি নাই। যারা আমার মেয়েরে এই অবস্থা করছে আমি তাগর কঠিন বিচার চাই।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/11/1562862943155.jpg

লিপি বেগম জানান, নির্যাতনের পর মেয়ের অবস্থা যখন খুব খারাপ তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) হালুয়াঘাটের একটি বাসে করে মেয়েকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয় তারা। বাড়িতে আসার পর মেয়েকে এই অবস্থা দেখে বুধবার (১০ জুলাই) প্রথমে হালুয়াঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ও পরে রাতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করানো হয়।

প্রতিবেশী আছিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি ঢাকায় বিভিন্ন বাসায় কাজের মেয়ে দেই। মীম ম্যাডামের মাকেও আমি কয়েকবার কাজের মেয়ে দিছি। এর বিনিময়ে আমি টাকা পাই। মীম ম্যাডামের মা বলার কারণে তার মেয়ের বাসার জন্য আমি লিমারে ওই বাসায় দিয়া আইছি। এরপর তাকে আমি কয়েকবার দেখতে চাইলেও ম্যাডাম বলতো আমি কুমিল্লা আছি, এইখানে-সেইখানে আছি। এইসব বলায় যাওয়া হয় নাই। এখন এই অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি শুইনা তারে দেখবার আইছি।’

মমেক হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক শামীম ফয়সাল কল্লোল জানান, রোগীর মাথায়, মুখে, বুকে, পায়ে আঘাত রয়েছে। কিছু আঘাত নতুন আবার কিছু পুরনো। সে মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত। তাকে সব ধরণের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

নির্যাতনের বিষয়ে জানতে গৃহকর্ত্রী মীমের সাথে বেশ কয়েকবার মোবাইলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

হালুয়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর নির্যাতিতা কিশোরীর পরিবারের সাথে কথা বলেছি। তারা এখনো কোন অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :