চোরাচালানের চলন্ত স্বর্গ!

ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা বাই মৈত্রী এক্সপ্রেস: ভারতের সীমান্ত পয়েন্ট গেদে হয়ে বাংলাদেশের দর্শনা সীমান্ত পয়েন্ট পার হলো- মৈত্রী এক্সপ্রেস। ভ্রমণ ক্লান্তির ঘুম থেকে আড়মোড়া দিয়ে উঠে টয়লেট যাবো ভেবে বের হলাম।

কেবিন থেকে বের হলে পথরোধ করে রেলওয়ে পুলিশ। জানতে চায়, কোথায় যাবেন? টয়লেটের কথা শুনে চেয়ার সিটের বগির বাথরুমে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বললেন, এখানকার টয়লেটগুলো বন্ধ।

ওদিকে রেলের দরজার দিকে বেশ হট্টগোল। এগিয়ে গিয়ে দেখা গেলো, ট্রেনের দরজা ও বাথরুমের সামনে ঠাসাঠাসি করে ভারতীয় পণ্যের লাগেজ, বস্তা ও গাট্টি রাখা। সাধারণ যাত্রীদের বাথরুম যাওয়া বন্ধ। পণ্যের গাট্টির সামনে ব্যবসায়ী ও পুলিশ আর্থিক লেনদেনে ব্যস্ত। দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না, এগুলো ভারত থেকে আনা চোরাচালান পণ্য। ট্রেনের গতি কমিয়ে রেল পুলিশের সহায়তায় চোরাকারবারিরা একের পর এক গাট্টি-বস্তা ফেলছে ট্রেন থেকে।

দায়িত্বরত রেল পুলিশ (উপ-পরিদর্শক) মনিরের কাছে ‘কি হচ্ছে’ -জানতে চাইলে বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ভারতীয় কাস্টমসকে ম্যানেজ করে মাল এনেছে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। আপনি ভেতরে যান।’

প্রতিবেদকের সঙ্গে কথোপকথনের সময় এক চোরাকারবারির আকুতি, ‘স্যার আমার কাছে আর টাকা নেই, তিন হাজারই নেন।’ সাধারণত পুলিশের ইউনিফর্মের সঙ্গে বুকে নাম লেখা থাকে। কিন্তু দায়িত্বপালনরত ওই পুলিশের নেমপ্লেট গায়েব। এমতাবস্থায় ওই পুলিশ সদস্য জানায়, ‘তোরে না বলছি, পাঁচ হাজার দে- ম্যানেজ করে দেবো।’ চোরাকারবারি দাবী, ‘তাহলে মির্জাপুরে একটু স্লো কইরেন, গাট্টিগুলো ফেলবো।’

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী ট্রেনে এভাবে অবাধে চলছে চোরাচালানি। সপ্তাহে দু'দিন চলাচলকারী এ ট্রেনে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে কোটি কোটি টাকার চোরাই পণ্য। এতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। সামনে রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে বহুগুণে বেড়েছে এ চোরাচালান।

/uploads/files/kCnOesGqvGcNWlly2yZbKulanNaEyzcAeM6aBVYI.jpeg

চোরাচালানের কাজে সহায়তা করছে ভারত-বাংলাদেশ রেলওয়ের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা, শুল্ক কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ রেল পুলিশ। চোরাকারবার পরিচালনা করতে দুই দেশের কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে ‘সখ্যতা’ গড়ে তুলেছেন। দেখে মনে হবে, দু’দেশের পুলিশ, কাস্টমস ও রেল কর্মকর্তারা চোরাচালানের জন্য ‘মৈত্রী বন্ধনে’ আবদ্ধ হয়েছেন।

চলন্ত মৈত্রী ট্রেনে কথা হয় কয়েকজন চোরাকারবারির সঙ্গে। তারা জানায়, ২০-২৫টি সিন্ডিকেট চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করছে। সিন্ডিকেট সদস্যদের মধ্যে দুই দেশের ট্রেন চালক, টিটি, অ্যাটেনডেন্টরা জড়িত। তাদের ইশারায় দর্শনা বর্ডার পার হওয়ার পর ঈশ্বরদী, মির্জাপুর ও টঙ্গিসহ বিভিন্ন স্থানে ২ থেকে ৫ মিনিট করে ট্রেন স্লো করা হয়। এ সময় পণ্যের গাট্টি, লাগেজ দ্রুত গতিতে ফেলে দেওয়া হয়। আরেকদল পণ্য সংগ্রহ করে নেয়।

চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় পাসপার্ট নিয়ে খালি হাতে ভারতে প্রবেশ করে। ফেরার সময় ট্রেনে অবৈধভাবে পণ্য ওঠায়। পরে আবার সাধারণ যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চোরাচালানের সঙ্গে দু’দেশের লোকই জড়িত। ১৫ মে মঙ্গলবার ১০-১২ জন ভারতীয় অবৈধ ব্যবসায়ী দেখা যায়। যারা ট্রেনে করে মালামাল এপারে পৌঁছে দিয়ে ওইদিন রাতেই বাসে করে ফের কলকাতা ফেরত যাবেন।

মৈত্রী ট্রেনের টিকিট পেতে হাজারো ভোগান্তি পোহাতে হয় সাধারণ যাত্রীদের। সেখানে কলকাতা থেকে ফিরতি ট্রেনের ৮০ শতাংশ কেবিন চোরাকারবারিদের দখলে থাকে। ২০ শতাংশ সাধারণ যাত্রীরা হাতে। দুই দেশের কাস্টমসকে ম্যানেজ করে অবৈধ এসব ব্যবসায়ী কেবিন ভর্তি করে পণ্য ওঠায়। বগিগুলোর অবস্থাও প্রায় একই।

চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত ভারতের ব্যবসায়ী সামির। কলকাতার খিদিরপুরের বাসিন্দা। সামির বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘পুরো ব্যাপারটা চলে একটা সিস্টেমের ওপর। এখানে দুই দেশের পুলিশ, কাস্টমস, রেলের চালক ও টিটিসহ নানা পর্যায়ের কর্মকর্তা জড়িত। এমনকি টিকিট পর্যন্ত তারা ম্যানেজ করে দেয়।'

/uploads/files/c4q8G1F3zPDtQNzWV6wJcG65OZyvUVM2lY3TLa3y.jpeg

সামির আরও জানায়, মালের দামের ওপর নির্ধারণ করা হয় ঘুষের পরিমাণ। এক লাখ টাকার পণ্যের বিপরীতে অসাধু কর্মকর্তারা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ টাকা ঘুষ নেয়। অনেক সময় আলাপ-আলোচনা করে টাকা কম-বেশ করা যায়।

এ সব বিষয়ে কথা হয় ঢাকা কাস্টমস হাউসের উপ-কমিশনার (প্রিভেন্টিভ) ওথেলো চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘ট্রেনে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। কাস্টমস কর্মকর্তারা চোরাকারবারিদের সঙ্গে জড়িত না। রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব হচ্ছে। অনিয়ম করে যেখানে-সেখানে ট্রেন স্লো করা হচ্ছে।’

প্রতিবেদকের মৈত্রী ট্রেনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলে, তিনি বলেন, ‘হয়তো আপনি অন্যকোনো বগিতে ছিলেন, এ জন্য অভিযান দেখেননি। আমরা চেষ্টা করি। এরপরও অনিয়ম আটকানো অনেক সময় সম্ভব হয় না।'

২০০৮ সালে ভারতের কলকাতা ও বাংলাদেশের ঢাকার মধ্যে ট্রেন চলাচল শুরু হলে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হতো ভারতের সীমান্তে গেদে ও বাংলাদেশের দর্শনায়। যাত্রীদের সুবিধা ও চোরাচালান বন্ধ করতে ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর থেকে ট্রেনে ওঠা -নামার সময় ঢাকা রেলওয়ের ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন ও কলকাতা রেল স্টেশনে (চিৎপুর) কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয় । এতে যাত্রী হয়রানি কিছুটা কমলেও চোরাচালান বন্ধ হয়নি।

এমসি/এমএইউ/

জাতীয় এর আরও খবর