Alexa

থাইল্যান্ড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামী হানিফ

থাইল্যান্ড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামী হানিফ

বিশেষ প্রতিনিধি

বাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি হানিফ পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ হানিফ বহাল তবিয়তেই আছেন থাইল্যান্ডে।

দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির রাজধানী শহরে বিলাসবহুল আপার্টমেন্টে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বেশ ‘রাজকীয়’ জীবনযাপন করছেন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা প্রচেষ্টাসহ ২২ হত্যা মামলার এই আসামী।

মোহাম্মদ হানিফের থাইল্যান্ডে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দূতাবাসের একাধিক কর্মকর্তা। তবে এ বিষয়ে নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে চাননি কেউ।

২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ বর্বরোচিত ও নৃশংস গ্রেনেড হামলায় মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পত্নী আইভী রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩’শ নেতাকর্মী। সেই হামলায় শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাঁর শ্রবণশক্তি।

২০০৮ সালের ১১ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে পৃথক দুটি মামলায় প্রথম চার্জশিট দাখিল করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু এবং ২১ হুজি নেতাকর্মীসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়।

তবে নতুন করে তদন্তের পর ২০১২ সালের ৩ জুলাই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ৩০ জনকে অভিযুক্ত করে পৃথক দুটি সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করে। দুটি মামলায় মোট অভিযুক্তের সংখ্যা ৫২ জন।

তাদের মধ্যে অন্যতম আসামী হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা কফিল উদ্দিনের ভাই মোহাম্মদ হানিফ।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে, পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে বিচার কাজ চলছে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির। বর্তমানে পলাতক আসামীদের পক্ষে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন অব্যাহত রয়েছে।

থাইল্যান্ডে প্রবাসীদের একটি সূত্র বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী মোহাম্মদ হানিফ থাইল্যান্ডে এসে ঘাপটি মেরে থাকেননি। শুরু থেকেই তিনি চলে ফেরা করেন প্রকাশ্যেই। সেখানেই কিনেছেন দামী গাড়ি। সন্ধ্যা না গড়াতেই রাজধানী ব্যাংককের বিলাসবহুল হোটেলে প্রকাশ্যেই দেখা যায় তাকে।

স্ত্রী ও সন্তানরা প্রতি মাসেই নিয়মিত তাকে দেখতে যান। তাদের বাইরে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও অন্যান্য স্বজনরা গিয়ে দেখা করে আসেন এই আসামীর সাথে। সেখানেই হাত বদল হয় দেশ থেকে নেয়া বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা।

হানিফের স্ত্রী সন্তান ও স্বজনরা নিয়মিত দেখা সাক্ষাত করতে থাইল্যান্ড গেলেও তাদের গমনাগমন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোন প্রশ্ন তোলেনি ইমিগ্রেশন বিভাগ। যে কারণে দেশ ছাড়লেও ব্যক্তিজীবনেও কোন প্রভাব পড়েনি হানিফের।

এদিকে দেশ থেকে যাওয়া বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগের নেতাদের অভ্যর্থনা জানাতে প্রায়ই নিজের বিলাসবহুল গাড়িটি সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেন হানিফ। ‘পরম অতিথিকে’ সাদর অভ্যর্থনা জানাতে পরে সুবিধে মতো অতিথির হোটেল কক্ষের সুইটে দেখা সাক্ষাত করেও আসেন তিনি।

তাদের আপ্যায়ণ, দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়ানো থেকে সফর শেষে দামী উপহার সামগ্রী তুলে দেয়া, এসবই হানিফের এখন রুটিন ওয়ার্ক বলে জানিয়েছে প্রবাসী সূত্রগুলো।

গ্রেনেড হামলা মামলায় আসামী হবার পরপরই সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা বিএনপি জামায়াত পন্থী কর্মকর্তাদের সহায়তায় ইমিগ্রেশন চ্যানেল পাড়ি দেন প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা চেষ্টাসহ ২২ হত্যা মামলার এই আসামী।

পর্যটক ভিসায় প্রবেশ করেন থাইল্যান্ডে। সেখানে তাকে প্রাথমিকভাবে আশ্রয় প্রশ্রয় দেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ী নেতারা।

পরে রাজধানী ব্যস্ততম ব্যাংককের অদূরে চাও ফ্রায়া নদীর তীরে বেশ নিরিবিলি বিলাসবহুল বহুতল এপার্টমেন্ট কিনে সেখানেই নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার থাকছেন এই আসামী।

/uploads/files/hFU9HptDALy2frQN3cyiX4xRh62LwwdNnBzuQcti.jpeg

প্রবাসে বসেই তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে বিশেষ সফটওয়ারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করছেন পরিবহন জগতে নিজের ব্যবসা বাণিজ্য। থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী দেশ থেকে গাড়ির যন্ত্রাংশের আমদানী-রপ্তানীও ব্যবসাতেও বিনিয়োগ করেছেন বিপুল অংকের অর্থ। সেখান থেকে হানিফ কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে পাড়ি দেবার চেষ্টাও করছেন বলেও জানিয়েছে সূত্র।

সূত্র মতে, মোহাম্মদ হানিফ দেশ থেকে বিপুল অংকের অর্থ পাচার করে বেশ কয়েকটি কোম্পানী গড়ে তুলেছেন থাইল্যান্ডে। যে কারণে ‘বিশাল বিনিয়োগকারী’ হিসেবেই ব্যবসায়ী পরিচয়ে থাইল্যান্ডে অভিবাসী হয়েছেন তিনি।

এ ব্যাপারে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে থাইল্যান্ড প্রবাসী আওয়ামী লীগের এক নেতা বার্তা২৪.কমকে জানান, হানিফ ভাইকে নিয়ে দলীয়ভাবে আমাদের কোন বক্তব্য বা অবস্থান নেই। দেশে তার বিরুদ্ধে গ্রেনেড হামলা মামলা থাকতে পারে, তবে এখানে আমরা সবাই মিলেমিশেই থাকি।

আমাদের জিজ্ঞেস না করে বরং বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন বিভাগকে জিজ্ঞেস করেন, এত বড় মামলার আসামী গ্রেপ্তার ও বিচার এড়াতে দেশ ছাড়লো কিভাবে? উল্টো প্রশ্ন ছুড়েঁ দেন ওই প্রবাসী।

হানিফ বিএনপির প্রভাবশালী নেতা কফিল উদ্দিনের ভাই। হানিফ থাইল্যান্ডে বসেই দেশে পরিচালনা করছেন বিলাসবহুল রপ্তানীর ব্যবসা। দেশে অবশ্য সেই ব্যবসার দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে হানিফের স্ত্রী ছাড়াও কফিলের দুই ছেলে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা প্রচেষ্টাসহ ২২ খুনের মামলার মতো স্পর্শকাতর মামলার আসামীর থাইল্যান্ডে দাপিয়ে বেড়ানোর বিপরীতে দূতাবাসের নিরব অবস্থান নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠেছে। নেপথ্যে রহস্য হিসেবে বিপুল অর্থের লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন প্রবাসীদের অনেকে।

তাদের মতে, দেশের প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টাসহ ২২ খুনের মামলার আসামী মোহাম্মাদ হানিফ থাইল্যান্ড দাপিয়ে বেড়ানোর বিষয়টি দূতাবাসের নিশ্চয়ই অজানা নয়।

তাহলে চাঞ্চল্যকর এই আসামীকে দেশে ফেরাতে কি দায়িত্ব পালন করছে দূতাবাস? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন প্রশ্নও তুলেছেন প্রবাসীদের অনেকে।

একাধিকসূত্র বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা কিংবা তার কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা প্রচেষ্টার আসামীদের আশ্রয়ে ঘুরে-ফিরেই আসে থাইল্যান্ডের নাম।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর প্রথমে ঢাকা থেকে থাইল্যান্ডের ব্যাংককেই যায় খুনিরা।

ঢাকার কুটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জন আসামির মধ্যে ছয়জন প্রায় এক যুগ ধরে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অবশিষ্ট পাঁচ আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি।

সে সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের মহাপরিচালক ছিলেন সাঈদা মুনা তাসনীম। তখন তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন,‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও লিবিয়ার কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও দেশগুলোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত এক বছরে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক করে খুনিদের ফেরত আনার বিষয়ে সহায়তাও চাওয়া হয়েছে।’

ঘটনাক্রমে সেই সাঈদা মুনা তাসনীম এখন থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের কর্মকর্তা সাঈদা মুনা তাসনীম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে কিভাবে প্রধানমন্ত্রী হত্যা প্রচেষ্টাসহ ২২ মামলার এই পলাতক আসামী দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছে সে প্রশ্নও উঠেছে জোরেসোরে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বার্তা২৪.কমকে বলেছে, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা প্রচেষ্টাসহ ২২ হত্যা মামলার আসামীর বিষয়ে দূতাবাসের এই নিষ্কৃয়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয় অবহিত। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাও বিষয়টি মনিটরিং করছে। যে কারণে দূতাবাসের কার্যক্রম নিয়েও সন্তুষ্ট নয় মন্ত্রণালয়, বলছে সূত্রটি।

জাতীয় এর আরও খবর