‘প্রভু ওদের সহ্য করার শক্তিটুকু বাড়িয়ে দাও’

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
এভাবেই ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে-বসে দীর্ঘ পথ যাত্রা করছেন অনেকে, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

এভাবেই ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে-বসে দীর্ঘ পথ যাত্রা করছেন অনেকে, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease
ঢাকা রংপুর মহাসড়ক থেকে: বাস যাত্রা ১৬ ঘণ্টা, আর বাসের অপেক্ষায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা, সব মিলিয়ে ২৬ ঘণ্টা।
 
তিন'শ কিলোমিটারের গন্তব্যে মাত্র ৯৫ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছি এখন পর্যন্ত। দূরত্বের অংকে অর্জন এক-তৃতীয়াংশ। দুই-তৃতীয়াংশ পথ এখনও পড়ে রয়েছে। মানুষ আশা নিয়ে বাঁচে, এখানেও অনেকে আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন। এপারে নাকি তেমন জট হয় না। জট হলেও ছেড়ে যায় দ্রুতই। অবশ্য তেমনটাই লক্ষ্যনীয়, থেমে থেমে চলছে যানবাহন।
 
আমার পাশে বসা অনেকেই সিটে বসে থেকেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। কারো কারো নাকি পিঠ ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। পায়ের ব্যথা সারাতে মাঝে মাঝে উঠে পায়চারি করছেন। অনেকে আবার ক্ষুধায় ছটফট করছেন। প্রত্যুষে খাবার খাওয়ার অভ্যাস নেই, তাই খাওয়া হয় নি। সারাদিন গেছে পথে। সময় ও জটের সঙ্গে তাল মেলেনি। আবার তাললয় মিলে গেলে হোটেলে গিয়েও কেউ কেউ খাবার পান নি। ভরসা পথের ধারে ফেরিওয়ালার বিস্কুট, কেক, রুটি।
 
কিন্তু তাই দিয়ে কি ভাত পাগল বাঙালীর হয়! কখনই না। আবার চলন্ত গাড়ি থামিয়ে উদরপূর্তি করার মতো সাহসও কেউ দেখাতে চান না। তাই চলছে অনেকটা উপোস যাত্রা।
 
এ কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে বসেও স্বস্তি পাচ্ছেন না যাত্রীরা। কর্তাদের গালমন্দ করে মনের আক্ষেপ মেটাচ্ছেন। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর সরস মন্তব্যে অনেকেই বেজায় ক্ষুব্ধ।
 
কিন্তু কলিজাটায় গরম তেলের ছ্যাঁক লাগার মতো করে ছ্যাঁত করে ওঠে, যখন ঠিক পাশে নিজের বাসের ঠিক পাশেই ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের দেখি। সারাদিনের প্রখর রোদের তাপ শুষে নেতিয়ে গেছেন কেউ কেউ। ট্রাকে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এ যাত্রায় নারী শিশুও সামিল। এদের বেশিরভাগই শ্রমিক শ্রেণির, যাদের বসবার মতো জায়গাটুকু নেই। পুরে পথটুকু দু'পায়ের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা।
 
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/11/1565461860163.jpg
 
একেকজন যেনো এক একটি তালগাছ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন। অথচ আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে বসেও বিড়বিড় করছি। তখন কেবলি এটুকু বলা, প্রভু তুমি ওদের সহ্য করার শক্তিটুকু বাড়িয়ে দাও। ঘরে প্রিয়জন অপেক্ষমান তাদের কাছে পৌঁছে দাও, ফুটপাত থেকে কেনা শখের জামাটার রঙিন হাসিসহ।
 
আমরা যখন এগিয়ে চলছি তখন গাবতলী থেকে খবর আসছে, অনেকে পনের ষোল ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় আছেন, অথচ বাসের দেখা পাচ্ছেন না। আবার কেউ কেউ মাঝ পথে নেমে ফিরে যাচ্ছেন ঢাকা। কারো কারো মাত্র চারদিন ছুটি। যার মাঝে দুইটি ছুটির দিন কেটে যাচ্ছে পথিমধ্যেই। বাড়ি গেলেও ফেরাটা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
 
তাইতো পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার পরিকল্পনাকে পথের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে, মনে পাথর বেঁধে রেখে ফিরে যেতে হয়েছে যান্ত্রিক নগরীতে।
 

আপনার মতামত লিখুন :