চামড়ায় নিঃস্ব ফড়িয়ারা, লাভবান আড়তদাররা

ফরহাদুজ্জামান ফারুক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, রংপুর
চামড়ার দাম কম হওয়ায় বিমর্ষ খুচরো ব্যবসায়ীরা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

চামড়ার দাম কম হওয়ায় বিমর্ষ খুচরো ব্যবসায়ীরা, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে চামড়া কিনেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী মনোয়ার হোসেন। তার সঙ্গী ছিলেন আরও চারজন। বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) থেকে স্ত্রীর নামে পঞ্চাশ হাজার টাকা লোন করেছেন। সেই টাকা দিয়ে ৩৯টি গরুর ও ২৭টি ছাগলের চামড়া ক্রয় করেছেন তিনি। সারাদিনে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করে ক্রয় করা চামড়া বিক্রি করতে এসে হতাশ মনোয়ার। লাভতো দূরের কথা পুঁজির অর্ধেক টাকাই নেই। এমন লোকসানে দিশেহারা মনোয়ারের চোখে তখন জল। বাকি চার বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলেন আড়তদারদের চামড়া ক্রয়ের সিস্টেম।

মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মহানগরীর চামড়া কেনাবেচার প্রসিদ্ধ এলাকা হাজীপাড়া চামড়া পট্টিতে মনোয়ার হোসেনের মতো চামড়া বেচতে এসে অনেকই কেঁদেছেন। কেউ কেউ সারাদিনের গাড়ি ও শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের টাকা দেয়াতো দূরের কথা, নিজের মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

গেল এক দশকে চামড়া শিল্পে এমন বিপর্যয় কখনো দেখা যায়নি বলে মনে করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। তবে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা বলছেন, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে কারণে চামড়ার দাম পাচ্ছেন না সাধারণ বিক্রেতারা।

চামড়ায় নিঃস্ব ফড়িয়ারা, লাভবান আড়তদাররা

নগরীর মডার্ন পার্কের মোড় এলাকা থেকে দুইটি ছাগলের ও একটি গরুর চামড়া বিক্রি করে রিকশা করে শাপলা চত্বরে এসেছিলেন মিশু রহমান। ছাগলের চামড়ার কদর না থাকায় রাস্তায় ফেলে দেন তিনি। আর পঞ্চান্ন হাজার টাকায় কেনা কোরবানির গরুর চামড়াটি বিক্রি করেছেন মাত্র ৫০ টাকায়।

বাজারের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ মিশু বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, 'আড়তদারকে কাছে চামড়ার কোনো দামই নেই। এটা কী ধরনের সিন্ডিকেট। ৭০ টাকা রিকশা ভাড়া করে তিনটি চামড়া বিক্রি আসে কী লাভ হলো? এখন নিজের পকেটে থেকে লোকসান গুণতে হচ্ছে।'

প্রতিবারের মতো এবারও লাভের আশায় চামড়া কিনেছিলেন রতন, শরীফুল, আপেল ও মুসা মিয়া। এই ফড়িয়ারা জানান, নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে চামড়া সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদেরকে ট্যানারি মালিকদের নির্ধারণ করা দামের চেয়ে বেশি মূল্যে চামড়া কিনতে হয়েছে। কিন্তু চামড়া পট্টিতে বিক্রি করতে এসে তারা লোকসানের মুখে পড়েন। কেউ চামড়া কিনতে চাচ্ছেন না। নিলেও দাম কম। স্থানীয় কয়েকজনের সিন্ডিকেটে পুরো বাজারে চামড়া যেন পানির চেয়েও সস্তা।'

চামড়ায় নিঃস্ব ফড়িয়ারা, লাভবান আড়তদাররা

স্থানীয় আড়তদাররা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, সরকার ও ট্যানারি মালিকদের বেঁধে দেয়া দামে তারা চামড়া কেনার চেষ্টা করেছেন। তবে গতবারের তুলনায় এবার চামড়ার সরবরাহ কম হওয়ায় এ উন্নতমানের আড়িয়ার চামড়া ৮০০-৯০০ টাকায়ও কিনেছেন। আর অনুন্নত চামড়া ৩০০-৫০০ টাকা মূল্যে ক্রয় করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্যানারি মালিকদের দু’একজন প্রতিনিধি ছাড়া চামড়া কেনার জন্য বড় বড় ট্যানারির কোনো প্রতিনিধি রংপুরের চামড়া পট্টিতে আসেননি। স্থানীয় যে তিন-চার জন আড়তদার রয়েছেন তারা চামড়ায় লবণ দিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। ঈদের সুবিধা মতো চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে নতুবা বড় বড় চামড়ার হাটে এসব চামড়া বিক্রি করবেন তারা।

এবার চামড়া পট্টিতে ১৫ হাজারের ঊর্ধ্বে গরুর চামড়ার কেনাবেচার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও ঈদের দিন ও আজ মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত ৮ হাজারের মতো চামড়া সরবরাহ হয়েছে। এখানে ছাগল ও বকরির চামড়া ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছেন বিক্রেতারা।

রংপুর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ খাঁন বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে জানান, এবার ঈদে চামড়ার সরবরাহ কম হওয়ার অন্যতম কারণ ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট। তারা এমন দাম বেঁধে দিয়েছেন যাতে, ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা থেকে বিমুখ হন। এ অবস্থা চলতে থাকলে পাচারের পথ প্রসারিত হবে। এতে আগামীতে চামড়া শিল্প আরও বড় সংকটের মুখে পড়বে।

আরও পড়ুন: সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন লবণের দাম, বিক্রি হয়নি অর্ধেকও

আরও পড়ুন: চিরচেনা রূপ হারিয়েছে পোস্তা!

আরও পড়ুন: রাস্তায় চামড়া, দেখতেও আসছে না ব্যাপারীরা