রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের দোষারোপ, বাংলাদেশের প্রতিবাদ

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা, পুরনো ছবি

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় রোহিঙ্গারা, পুরনো ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারকে দোষারোপ করছে দেশটির সরকার। এর তীব্র প্রতিবাদ করেছে বাংলাদেশ।

রোববার (২৫ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।

আরও পড়ুন: মিয়ানমারের উপর আস্থা রাখা বোকামি, সমাবেশে রোহিঙ্গারা

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দু’দেশের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী, ২২ আগস্ট (বৃহস্পতিবার) প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানোর কথা থাকলেও কেউ ফেরত যায়নি।

মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশটির কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের দেশে গ্রহণ করার অপেক্ষায় ছিল। আর এসব রোহিঙ্গাকে ফেরতের মাধ্যমে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে না পারায় বাংলাদেশ সরকারকে দুষছে তারা। এ খবর জানিয়েছে দেশটির স্থানীয় মিডিয়া।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সংকটের ২ বছর আজ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শরণার্থী ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিষদের পক্ষ থেকে জানিয়েছে, পুনর্বাসন বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কেননা শরণার্থীরা ফেরত যেতে চায় না। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের দেশে ফেরত যেতে উৎসাহিত করা হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তারা দেশে ফিরে সুরক্ষিত থাকবে। শরণার্থী শিবিরে এমন কেউ নেই যারা দেশে ফিরে যেতে চায় না।

আরও পড়ুন: ৫ দফা দাবিতে রোহিঙ্গাদের সমাবেশ

মূলত, রোহিঙ্গাদের দাবি অনুযায়ী তাদের সুরক্ষা ও জীবিকা সংক্রান্ত নিশ্চয়তা মিয়ানমার সরকার দিলেই এ সমস্যার সহজ সমাধান হবে।

মিয়ানমার দাবি করছে, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে তাদের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল ২২ থেকে ২৮ জুলাই কক্সবাজারের শিবিরে কথোপকথন চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছে ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসন শুরু করা যেতে পারে।

স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবর্তনের নীতিমালার প্রতিশ্রুতি অনুসারে, বাংলাদেশ সরকার ইউএনএইচসিআর’র কাছে এখনো পর্যন্ত ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার তালিকাটি জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কের মাধ্যমে হস্তান্তর করেছে। এই লোকেরা বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তর রাখাইনে স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে প্রস্তুত কিনা তা নির্ধারণ করেছে তারা। বাংলাদেশ সরকার উত্তর রাখাইনে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য সুরক্ষা এবং রসদসহ সকল প্রকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল।

এই ৩ হাজার ৪৫০ রোহিঙ্গার তালিকার মধ্যে, ইউএনএইচসিআর ৩৩৯টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মিয়ানমার সরকার প্রদত্ত সমস্ত তথ্য এবং ফ্যাক্ট-শিটগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে বিতরণ করা হয়। সুরক্ষা ব্যবস্থাসহ পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল যাতে তারা নির্দ্বিধায় তাদের কথা বলতে পারে। দুর্ভাগ্যক্রমে, সাক্ষাৎকার নেওয়া কোনো পরিবারই বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিরে আসতে রাজি হয়নি। কারণ, তারা রাখাইনের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক পরিবেশ তাদের প্রত্যাবর্তনের পক্ষে উপযুক্ত নয় বলে বিবেচনা করে।

সাক্ষাৎকারপ্রাপ্ত প্রায় সমস্ত পরিবার রাখাইনের সুরক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। নাগরিকত্ব, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং ভূমি-ব্যবহারের অধিকারসহ ন্যায়বিচার এবং অধিকার সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধানে অগ্রাধিকারের অভাবকে সিংহভাগ পরিবার না ফিরতে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মিয়ানমার যদি উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো সমাধান করে তবে তারা আবারও ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতিসহ পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে চীন ও মিয়ানমার দূতাবাসের কূটনীতিকরা কক্সবাজারে উপস্থিত ছিলেন।

২৭-২৮ জুলাই বিদেশ মন্ত্রকের স্থায়ী সচিবের নেতৃত্বে মিয়ানমার থেকে উচ্চ-স্তরের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার বাসিন্দাদের প্রতিনিধিরা সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য উত্তর রাখাইনে আন্তর্জাতিক বেসামরিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতির আহ্বান জানানো হয়েছিল। মিয়ানমার প্রতিনিধিও মৌলিক অধিকার এবং নাগরিকত্ব প্রদানসহ মূল বিষয়গুলোতে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিরতিতে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যেতে সম্মত হয়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা একেবারে হতাশা প্রকাশ করেছে যে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা উত্তর রাখাইনে ফিরে আসার জন্য নাগরিকত্ব, অধিকার এবং সুরক্ষা সম্পর্কিত কোনও অগ্রগতি রিপোর্ট করতে পারছে না।

প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত দ্বিপক্ষীয় কথা অনুসারে, বাস্তুচ্যুত মানুষদের স্বেচ্ছায় ফিরে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করার দায়িত্ব পুরোপুরি মিয়ানমারের ওপর বর্তায়। শুধু সঠিক তথ্যের প্রচার সহ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং রোহিঙ্গাদের আস্থা-ঘাটতি হ্রাস করা মিয়ানমারের দায়িত্ব। তাই সংশ্লিষ্ট লোকদের অনিচ্ছার কারণে প্রত্যাবাসন না শুরু করাকে মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা যেতে পারে।

যে কোনো সময় মিয়ানমারে ফিরে যেতে ইচ্ছুক, যে কারও জাতিগত এবং ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে বাংলাদেশ সরকার কাউকে প্রতিরোধ না করার জন্য তার নীতিগত অবস্থান বজায় রেখেছে।

আপনার মতামত লিখুন :