নকশা আনাতেই তোড়জোড়, নেই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া

শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
জাতীয় সংসদ ভবন, ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদ ভবন, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কথা ছিল বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কান এর নকশা অনুযায়ী সাজানো হবে সংসদ এলাকা। সেই পরিকল্পনা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পেন্সিলভেনিয়া ইউনির্ভাসিটি থেকে নকশা সংগ্রহে শুরু হয় তোড়জোড়। নানা কাঠখড় পুড়িয়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করে সেই নকশা সংগ্রহ করে সংসদ সচিবালয়। ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর নকশা দেশে আসে। এরপর আস্তে আস্তে ফিকে হতে থাকে নকশার বাস্তবায়ন। আনাতে যতটা তোড়জোড় দেখানো হয়েছিল বাস্তবায়নে তার ধারের কাছেও নেই। প্রায় তিন বছর পার হতে চলল আর্কাইভে রাখা ছাড়া আর কোন অগ্রগতি নেই নকশার।

লুই আই কানের নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে সময়ে সময়ে বিভিন্ন স্থাপনা করা হয়েছে। এরমধ্যে সংসদের উত্তর প্লাজা বরাবর লেক পারে গড়ে তোলা বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিসৌধ। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় পাঁচ বিঘারও বেশি জায়গাজুড়ে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে আরো অন্তত সাতজনকে সমাধিস্থ করা হয়।

সংসদ চত্বরের ভেতরে অবৈধ এসকল স্থাপনা ও কবর সরিয়ে পূর্বের অবয়ব ফিরে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশেই ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে পেন্সিলভেনিয়া ইউনির্ভাসিটি থেকে ৮৫৩টি নকশার অনুলিপি ও ৬০ টি ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে সংসদ সচিবালয়। ওই নকশাগুলোর মধ্যে ১১৫টি আনবিল্ড নকশা (এখনও কোনো ভবন হয়নি)। নকশা আনতে প্রায়  ৫০ লাখ টাকার মত খরচ হয়। নকশা সংগ্রহ করতে প্রতি কপিতে খরচ হয় ১৯ ডলার করে। এর সঙ্গে কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়া ও থাকা খাওয়ার খরচ রয়েছে।

নকশার অনুলিপি দেশের আসার আগে বেশ কয়েকবার সংসদে প্রশ্নোত্তর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, “মূল নকশা হাতে পেলে নকশার আদলে সব সাজানো হবে। নকশার বাইরে সকল স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হবে। সেখানে কারো কবর থাকলে সেটাও সরিয়ে নেওয়া হবে।”

নকশা দেশে আসার প্রায় ৩৪ মাস অর্থাৎ প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হতে চলছে এখন পর্যন্ত আর কোন অগ্রগতি নেই। নকশা দেশে আনার আগে যতটা তোড়জোড় ছিল আনার পর আর সেই তোড়জোড় নেই।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে নকশা আনা থেকে শুরু করে দেশে আনার পর সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে দেখানো পর্যন্ত কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন  স্থাপত্য অধিদফতরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির।

নকশার অগ্রগতি সম্পর্কে স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম-কে বলেন, নকশা একদিন শুধু প্রধানমন্ত্রী দেখেছেন এরপর আর কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। যেভাবে সেট করে সংসদ সচিবালয়, জাতীয় আর্কাইভ, স্থাপত্য অধিদফতরের রাখার কথা সেভাবেই রাখা হয়েছে। এছাড়া আর কোন কাজ হয়নি বা কোন সিদ্ধান্তও আসেনি।

সংসদ ভবনের নকশা সংগ্রহের বিষয়টি অনুধাবন করে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি লুই আই কান এর মূল নকশা সংগ্রহের নির্দেশ দেন সংসদ সচিবালয়কে।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে লুই আই কান যখন মূল নকশাটি করেন, তখন ২৭টি মন্ত্রণালয়ের জন্য এ পরিকল্পনা করেন। তখন সেখানে মসজিদ ছিল, মাঝে বাগান ছিল, চন্দ্রিমা উদ্যানের ওখানে একটি বড় সড়ক ছিল, এর সামনে লেক ছিল, এরপর সংসদ ভবন ছিল। তাই অনুলিপি ধরে নয়, ১৯৭৪ সালের মূল নকশা ধরে সচিবালয়সহ সব কিছু করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৪ সালে শেরেবাংলা নগরে ৪২ একর জায়গায় জাতীয় সচিবালয় নির্মাণের জন্য সরকার ও মার্কিন কোম্পানি ডেভিড উইসডম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে চুক্তি হয়। পরে এর কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওই এলাকায় এরই মধ্যে ১০ একর জমিতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। জমি কমে যাওয়া এবং বর্তমানের চাহিদা বিবেচনায় লুই আই কানের নকশা স্থাপত্য অধিদফতর কিছুটা সংশোধন করেছে।

নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ সংসদ ভবন এলাকার ভেতরেই গড়ে তোলেন মাজার ও কবরস্থান। এর মধ্যে সংসদ ভবনের উত্তরে ৭৪ একর জায়গা জুড়ে নির্মিত চন্দ্রিমা উদ্যানের মধ্যিখানে  বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হয় জিয়ার মাজার কমপ্লেক্স। আর জিয়া ও এরশাদের শাসনামল মিলিয়ে সংসদ ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে মানিক মিয়া এভিনিউ এর পশ্চিম প্রান্ত লাগোয়া স্থানে পাঁচ বিঘারও বেশি জায়গাজুড়ে ‘জাতীয় কবরস্থান’ নাম দিয়ে আরো অন্তত সাতজনকে সমাধিস্থ করা হয়।

জিয়ার মাজার কমপ্লেক্স

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, লুই আই কানের মূল নকশার প্রথম ধাপ ছিল ২০৮ একর জায়গার ওপর জাতীয় সংসদ ভবন নির্মাণ। যার সামনে ও পেছনেও বিস্তীর্ণ সবুজ খোলা মাঠ থাকবে। চারদিকে আট লেনের সড়ক, মাঝখানেও লেক। দ্বিতীয় ধাপে লেকের পর বিস্তীর্ণ সবুজ। এছাড়া বাকি জায়গায় গড়ে তোলা হবে সচিবালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর, হাসপাতালসহ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বলয়।

লুই আই কানের নকশা ক্ষত-বিক্ষত করার প্রক্রিয়া এখানেই থেমে থাকেনি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। ওই সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী হন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। লুই আই কানের নকশা উপেক্ষা করে আসাদগেটের উল্টো দিকে অবস্থিত সংসদ ভবনের জায়গায় একটি পেট্রোলপাম্প স্থাপনের জন্য তিনি তার ছোট ভাই মির্জা খোকনকে জায়গা বরাদ্দ দেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মাঝামাঝি সময়ে আরও এক দফা ক্ষত-বিক্ষত করা হয় লুই আই কানের মূল নকশা। ওই সময় সংসদ ভবনের মূল ভবনের পাশেই খোলা সবুজ চত্বরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবন নির্মাণ করা হয়।

জাতীয় সংসদের ইতিকথা:

১৯৬১ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে বর্তমান সংসদ ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়। সে সময় স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এই ভবনের স্থপতি নিয়োগ করা হয়। তার প্রস্তাবেই লুই আই কান এই প্রকল্পের প্রধান স্থপতি হিসেবে নিয়োগ পান। দীর্ঘ সাধনার পর ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি এ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়।

আপনার মতামত লিখুন :