টর্চের আলোয় ময়নাতদন্ত, ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও হয় আত্মহত্যা!

শাহরিয়ার হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

২০১৬ সালে রাজশাহী শহরের নাইস ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের একটি কক্ষ থেকে দুই তরুণ-তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলেটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমান। মেয়েটি পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুমাইয়া নাসরীন।

এ ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার সেই সময়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) সেলিমকে। সুরতহাল রিপোর্ট, আলামত আর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুমাইয়া নাসরীন ও মিজানুর রহমান খুব কাছাকাছি সময়ে আত্মহত্যা করেছেন।

এমন প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি আদালত। পরে ঘটনাটি আবার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় রাজশাহীর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবিআই শুরুতেই ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজ ও ভিকটিমদের ফোন কল পর্যালোচনা করে। প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হয় আহসান হাবীব (২০) নামের এক যুবককে। তাকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। হাবিব জানান যে ওই দু’জন আত্মহত্যা করেননি। বরং তাদের হত্যা করা হয়েছে।

হত্যার বিবরণ দিয়ে হাবীব পিবিআইকে জানান, রাহাত, আল-আমিন ও উৎস নামে তিন যুবক মিলে মিজান-সুমাইয়াকে খুন করেছেন। পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে নাইস হোটেলের ৩০৩ নম্বর কক্ষে ঢুকে তারা প্রথমে সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে গলা পেঁচিয়ে মিজানকে হত্যা করেন। পরে মেঝেতে মিজানের মরদেহ রেখে প্রথমে রাহাত ও পরে আল-আমিন সুমাইয়াকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের পর তারা বালিশ চাপা দিয়ে খুন করেন সুমাইয়াকে। আর মিজানের মরদেহ পরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন।

হত্যার কারণ সম্পর্কে তিনি জানান, মিজানের আগে রাহাতের সঙ্গে সুমাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। প্রেমিকার অন্যের সঙ্গে হোটেলে থাকার কথা জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে বন্ধুদের নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটান রাহাত।

খুনের এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়ে পুলিশ সদর দফতরকে একটি প্রতিবেদন দেয় তদন্ত সংস্থা পিবিআই। যার সবগুলোতেই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের সত্যতা নিয়ে ওঠে নানা প্রশ্ন।

তবে এসব অসংগতির ক্ষেত্রে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বা সুরতহাল প্রতিবেদন দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ আনা বা তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা নেই বললেই চলে।

মিজান-সুমাইয়ার প্রতিবেদনটি ধরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অসংগতির ব্যাপারে বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম অনুসন্ধানে নামে।

অনুসন্ধানের শুরুতেই ২০১৬ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ড. এনামুল হকের সঙ্গে কথা হয়। চলতি বছরের শুরুতে অবসরে গেছেন তিনি।

২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল শহরের নাইস হোটেল থেকে উদ্ধার হওয়া দুই শিক্ষার্থীর মরদেহ ময়নাতদন্তের ঘটনা মনে আছে তার।

সুমাইয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়, কিন্তু ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে গলায় ফাঁস দিয়ে মৃত্যু বলা হলো। এমন ভুলের কারণ জানতে চাইলে তিনি বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। আমি যখন অবসরে যাই, তখনও প্রায় ৩০০টির মতো ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা ছিল। যেগুলো দিয়ে আসতে পারিনি। এমন অনেক ঘটনা আছে, ময়নাতদন্তের সময় বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি বা টর্চ লাইটের আলোতে মরদেহ কাটা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে, প্রতিবেদন অন্য রকম আসতে পারে, এটা অস্বাভাবিক না।’

এমন পরিবেশে ময়নাতদন্ত করা কতটা কঠিন জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘একটা আদর্শ মর্গের প্রধান ও প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো পর্যাপ্ত আলো থাকা। শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নয়, এমন অনেক হাসপাতালই আছে, যেখানে নিয়মিত মোমবাতির আলোয় মরদেহ কাটা হয়।’

২৫ হাজার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা এ চিকিৎসক বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে প্রতিবেদন ভুল আসবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। আমাদের ফরেনসিক বিভাগের অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।’

অন্যদিকে পিবিআইয়ের পক্ষে এসব ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করা বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামাল বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘খুন হয়েছে, অথচ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আত্মহত্যা, এমন অনেক ঘটনা আছে। এতে যে শুধু ফরেনসিক চিকিৎসকের দোষ, তা নয়। অনেক সময় সুরতহাল রিপোর্ট, মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও ভুলভাবে দাখিল করা হচ্ছে।’

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বার্তাটোয়েন্টিফোর.কমকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট করে কোথাও কিছু বলা নেই। আমাদের ফরেনসিক অ্যাক্ট প্রয়োজন। তা না হলে এভাবে ভুল ময়নাতদন্তে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মানুষের মধ্যে ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :