চাহিদা বেশি, শেষ মুহূর্তেও ব্যস্ত সেমাই কারিগররা



কান্ট্রি ডেস্ক, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease
লক্ষ্মীপুর: ময়দা আর পানির মিশ্রণে তৈরি করা হয় খামির। খামির থেকে ছোট ছোট চাকা। সেই খামিরের চাকাকে আবার ডালডা এবং তেল দিয়ে প্রক্রিয়া করা হয়। এক পর্যায়ে খামিরগুলোকে হাতের সাহায্যে দু’তিন ঘণ্টা টেনে টেনে পেঁচিয়ে কাঁচা সেমাইতে পরিণত করা হয়। এই কাঁচা সেমাইকে রোদে শুকিয়ে আবার গরম তেলে ভেজে তৈরি করা হয় সেমাই।
 
ঈদুল ফিতরের আর কয়েকদিন বাকি। বাজারের চাহিদা পূরণে শেষ মুহূর্তেও সেমাই তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে লক্ষ্মীপুরের বিসিক শিল্পনগরীর সেমাই তৈরির কারিগর ও শ্রমিকরা। বছরের দু’ ঈদেই সেমাই তৈরিতে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ঈদের দিনের শুরুতেই তাদের উৎপাদিত সেমাই খেয়ে মুসলমানরা নামাজ আদায় করতে যাবে একথা ভাবতেই তারা অনেক আনন্দ পায়। বর্তমানে কারখানায় উৎপাদনের কাজ চলছে সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত। 
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিসিক শিল্পনগরীর সুলতানিয়া বিস্কুট বেকারি, টপ চয়েস বেকারিসহ কয়েকটিতেই উৎপাদন করা হয় জুরী ও লাচ্ছা সেমাই। এসব কারখানায় কাজ করছে নারী-পুরুষসহ প্রায় শত শ্রমিক। এসব কারিগর ও শ্রমিকদের আগেই অগ্রিম টাকা দিতে হয়। এখানকার খোলা ও প্যাকেটজাতকৃত সেমাই জেলার রায়পুর, রাখালিয়া, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগরসহ বিভিন্ন স্থানের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে পরিবেশকের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।
 
গুণগতমান ভালো হওয়ায় পরিবেশকদের কাছে খোলা কেজিতে ৬৫ টাকা ও প্যাকেটজাত ৭৫ থেকে ৮০ টাকা ধরে বিক্রি করা হয়। পরিবেশকরাও সীমিত লাভে বাজারের দোকানগুলোতে সরবরাহ করে থাকে। খুচরা ব্যবসায়ীরা সেমাই ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। জেলায় উৎপাদিত সেমাই খুবই সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতারাও কিনছেন চাহিদা মতো।
    
কারখানার মালিক ও কারিগরদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, কোনো রকম রঙ কিংবা কেমিক্যাল ছাড়াই সুন্দর পরিবেশে সেমাই তৈরি করে বাজারজাত করছেন তারা। অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এ সময় বাজারে চাহিদাও থাকে বেশি। কিন্তু বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সহ নানা সংকটের কারণে চাহিদামতো সেমাইর যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তাছাড়া  কাঁচামালের দাম ও শ্রমিকদের মজুরি বেশি হলেও গুণগত মান বজায় রেখেই সেমাই ব্যবসা করছে মালিক পক্ষ।
 
সেমাই তৈরির শ্রমিক হাসান বলেন, ‘বছরের অন্যান্য সময় বেকারিতে কেক, বিস্কুটসহ অন্য খাদ্য উৎপাদন করে থাকি। রমজান ও ঈদের সময় সেমাইর চাহিদা বেশি থাকে। তাই সেমাই তৈরির কাজে এখন ব্যস্ত রয়েছি।’
 
ভোলা জেলার লালমোহন এলাকায় বাড়ি আবুল কালামের। তিনি ২৫ বছর ধরে এ শিল্পের সাথে জড়িত। কাজ করছেন সুলতানিয়া বেকারির সেমাই কারখানায়। আলাপকালে তিনি জানান, এ জেলায় সেমাইর খুব চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বিসিক এলাকায় নানা সমস্যার কারণে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তার পরও (প্রতি বস্তায় ৭৫ কেজি করে) দৈনিক ১৫/১৮ বস্তা খোলা ও প্যাকেট জাত সেমাই বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
 
কারখানার ম্যানেজার মীর হোসেন জানান, এখানকার সেমাই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে উৎপাদন হয়ে থাকে। পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি এ কারখানায় স্বামী পরিত্যক্তাসহ ২০ জন নারী শ্রমিক প্যাকেটজাত করণের কাজ করে থাকে। এতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। কিন্তু বিসিক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ,গ্যাস,পানি সরবরাহ না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
 
বিসিক শিল্পনগরীরর মালিক সমিতির সভাপতি ও সুলতানিয়া সেমাইয়ের মালিক আবুল কাশেম জানান, জেলায় সেমাইয়ের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পুঁজি ও শ্রমিকের অভাবে মাল সরবরাহ দিতে পারছেন না। এছাড়াও সেমাই তৈরির কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, মজুরি ও ঘর ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ মিটিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তারপরেও গুণগত মান বজায় রেখেই সেমাই বাজারজাত করছেন। তাছাড়া বিসিক শিল্প এলাকায় গ্যাস,বিদ্যুৎ,রাস্তাঘাট ও ড্রেনের অব্যবস্থাপনার কারণে উৎপাদন চরম ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। 
 
বিসিক শিল্প নগরীর প্রমোশন অফিসার ফাতেমা আক্তার জানান, এখানকার উৎপাদিত সেমাই খুবই সুস্বাদু। জেলার বিভিন্ন স্থানে অধিক পরিমাণে সেমাই সরবরাহ করে থাকে কারখানাগুলো। বিসিক এলাকায় নানা সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে প্রয়োজন দুই কোটি টাকা, কিন্তু দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। যা দিয়ে সমস্যা সমাধান হবে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।