Alexa

তাহলে কি এমাদ কনে পাবে না!

তাহলে কি এমাদ কনে পাবে না!

সৌদি আরব (জেদ্দা) থেকে: এমাদের বাহারী নামটি শুনলে বেশ বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হয়! মুচকি হাসি দিয়ে নিজের জাতীয়তা নিয়ে অন্যের সংশয়ে থাকাটাকে তিনি বেশ উপভোগ করেন।

বাংলাদেশিদের সঙ্গে ওঠাবসা করেই হয়তো কিছুটা বাংলা রপ্ত হয়েছে। জন্ম সৌদি আরবে হলেও তিনি আরব নন, বাংলাদেশি মা-বাবার সন্তান। শৈশব, কৈশর আর যৌবন- সবই কেটেছে এই মরুর দেশে। বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি কখনও।

পুরো নাম এমাদ আবদুস সাত্তার আবু বকর সরদার (৩৯)। একটু পর পর মনের অজান্তেই হাত চলে যায় মাথায়। বেখেয়ালি বাবরি চুলগুলোকে শাসন করার সময়টা বেশ অনুভব করেন তিনি। পোশাকের সঙ্গে বাহারী নাম, সেই সঙ্গে আধো বাংলা কথা শুনে মনে হয়- এমাদ বুঝি পুরোদস্তুর সৌদি নাগরিক! তবে বাবরি চুলটাতেই যেন বিপত্তি। যা এমাদকে নিয়ে যায় জন্মের শিকড়ে।

পিতৃভূমি বাংলাদেশের ঠিক কোথায়, তা অবশ্য জানেন না ভালো করে। তবুও এমাদ কাগজে-কলমে বাংলাদেশি!
-বাপ দাদার বাড়ি কোথায়?
-ফরিদপুরের ডামুড্যায়।
এটুকু ছাড়া পরিচয় বলার মতো আর কিছু নেই এমাদের। তবে ডামুড্যা যে এখন আর ফরিদপুরের সঙ্গে নেই, সেটা এখন শরিয়তপুরের অংশ- সেটাই বা এমাদ জানবে কি করে!

এমাদের জন্মের বহু আগে বাবা আবদুল আজিজ মা নুরজাহানকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে। এখানেই জন্ম এমাদ আর তার তিন বোনের। চার ক্লাস পর্যন্ত পড়ে এমাদ কাজ নেন মোটর গ্যারেজে। সেখানে ১৫ বছর কাজ করে এমাদ বর্তমানে কাজ নিয়েছেন জেদ্দার বাংলাদেশ হজ মিশনে গাড়ি চালকের পদে।

আরবে জন্ম, স্থানীয় সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা এমাদের চলাফেরাটা এখন বাংলাদেশিদের সঙ্গে। পাসপোর্ট বাংলাদেশের। বোনদের বিয়ের সূত্রে তারা সৌদি নাগরিক। তাই বোনদের কফিল (নিয়োগকর্তা) দেখিয়ে বছর বছর আকামা (নিয়োগপত্র) নবায়ন করতে হয় তাকে। পাঁচ বছর অন্তর নিতে হয় বাংলাদেশি সবুজ পাসপোর্ট।

/uploads/files/QtCR9dDLhlFkXzfnqaJZIOzLzYB9QLEDe9re32mU.jpeg

এমনই বৈচিত্রপূর্ণ এমাদের জীবন। সবই ঠিকঠাক চলছিলো। সমস্যা দেখা দিয়েছে জীবনসঙ্গী নির্বাচন নিয়ে। বিয়ে করবেন- সেই কবে থেকে ভাবছেন; কিন্তু কনে খুঁজে পাচ্ছেন না এমাদ। সৌদি আরবে জন্ম নিলেও এমাদ আজনবি, মানে ভিনদেশি। তাই স্বাভাবিক নিয়মে কোনো সৌদি নারীকে বিয়ে করার বিষয়ে কঠোর নিয়ম-কানুন অনুসরণ করতে হবে এমাদকে।

সেটা কেমন?

স্থানীয় রীতি অনুযায়ী সৌদি নারীদের বিয়ের বয়স শুরু হয় ১৫ বছর বয়স থেকে। ধর্মীয় বিধান, স্থানীয় আইন ও সৌদির ঐতিহ্য অনুযায়ী কনেকে বেশ মোটা অংকের দেনমোহর নগদে দিয়ে ঘরে বউ করে আনতে হয় বরকে।

সেটা এখানকার আর্থসামাজিক অবস্থায় কঠিন কিছু নয়। বরং অর্থবিত্ত থাকলে একাধিক বিয়েও কোনো সমস্যা না। সমস্যাটা অবশ্য এমাদের ক্ষেত্রে। এমাদের তিন বোনের মধ্যে দুই বোনের বিয়ে হয়েছে সৌদি নাগরিকের সঙ্গে। কিন্তু এমাদের বিয়ে করতেই যতো বিপত্তি!

এখানকার রীতি অনুযায়ী প্রবাসীদের অর্থ থাকলে কঠোর কিছু বিধি-নিষেধ মেনে সৌদি কনেকে ঘরে তোলা যাবে। তবে বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত বা বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে- এমন নারীদের বিষয়ে নিয়ম-কানুন কিছুটা শিথিল থাকলেও দেনমোহরের বিষয়ে রীতিটা বেশ কঠোর।

ঝক্কি-ঝামেলাটা ঠিক সেখানেই। নিয়ম অনুযায়ী সৌদি নারীকে ভিনদেশি কেউ বিয়ে করতে চাইলে তাকে অবিবাহিত হতে হবে একইসঙ্গে নারীর বয়স হতে হবে ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। বয়সের ব্যবধান ১৫ বছরের বেশি হওয়া যাবে না। বরকে কম করে হলেও মাসে পাঁচ হাজার সৌদি রিয়াল আয় করতে হবে এবং একটি বৈধ বাসস্থানের অনুমতি থাকতে হবে। আবার তিনি সংক্রামক বা জেনেটিক কোনো রোগে ভুগছেন না- মর্মে প্রমাণপত্র দিতে হবে।

এর বাইরে বিয়ের খরচ ও কম আয়ের বিষয় সৌদি আরবে বিয়ের ক্ষেত্রে বেশ বড় প্রতিবন্ধক। বিয়ে করতে হলে কম করে হলেও ১ লাখ রিয়াল লাগবে। মানে প্রায় সাড়ে ২২ লাখ টাকা। এত টাকা একসঙ্গে জমছেও না, বিয়েও হচ্ছে না এমাদের। অন্য শর্তগুলোপূরণ করেই বা কি হবে!

তাতে অবশ্য দু:খ নেই এমাদের। পরিস্থিতি মেনে নিয়ে নিজের মন-মানসিকতায় এনেছেন পরিবর্তন। বলছেন, বিয়েটা আসলেই বেশ ঝামেলার; ওসব ঝামেলায় না জড়ানোই উত্তম!

বলি- সাধে কী আর লোকে বলে, ‘চুন খেয়ে মুখ পুড়লে, দই দেখলেও ভয় লাগে।’

আপনার মতামত লিখুন :