মনে রঙিন স্বপ্ন, তবে আলো নেই তাদের চোখে

কান্ট্রি ডেস্ক, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease
রংপুর: ছোটবেলা থেকেই দুঃখ কষ্টের মধ্যে বেড়ে ওঠেন আনিছুল হক। তবে স্বপ্ন ছিল অভাব অনটনের সংসারে হাল ধরবেন নিজেই। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই অন্ধকার নেমে আসে তার পরিবারে। অন্ধত্ব নামের কালো মেঘে ঢাকা পড়েছে আনিছুলের রঙিন স্বপ্নগুলো। এখন রাত-দিন সব সময়ই তার জীবন কাটছে অন্ধকারে। ভালো নেই আনিছুলের পরিবারও। অন্ধত্বের অভিশাপে দিশেহারা পরিবারের অন্য সদস্যরাও।
 
রংপুর মহানগরীর উত্তর হাজিরহাট এলাকার রণচন্ডি গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে আনিছুল। একটা সময় তার দুই চোখেই আলো ছিল। তবে পরিবারে অভাব ছিল সব সময়ই। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পার হতে পারেননি তিনি। 
 
ত্রিশ বছর বয়সী আনিছুল ২০০৯ সালে পরিবারের কষ্ট দূর করতে বাবা-মাকে ছেড়ে পাড়ি দেন ঢাকায়। সেখানে একটি প্যাকেজিং কোম্পানিতে সামান্য কিছু বেতনে চাকরি শুরু করেছিলেন। এরপর বেশ ভালোই ছিল তার পরিবার। কিন্তু  দুই বছর পার না হতেই চোখের পর্দায় নেমে আসে কালো মেঘ। নিভে যেতে বসে আনিছুলের দু’চোখের স্বপ্ন। 
 
২০১১ সালে দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ঢাকা থেকে শূন্য হাতে গ্রামে ফিরে আসেন আনিছুল। বংশগত দৃষ্টিহীনতার অভিশাপে হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। কষ্টের জীবনে একজন সঙ্গী পেতে ২০১৩ সালে বিয়ের পিড়িতে বসেছিলেন। কিন্তু বিয়ের এক বছরের মাথায় ভেঙে যায় তার সংসার।
 
এখন মায়ের আঁচলই আনিছুলের নিরাপদ ঠিকানা। এই আনিছুল একটা সময় গ্রামের মেঠোপথ ধরে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা আনিছুল সকাল বিকেল ছুটে যেতেন খেলার মাঠে। সবকিছুই সাজানো ছিল তার। কিন্তু এখন সেই সাজানো জীবনে কিছুই নেই। দৃষ্টিহীনতার মতো বংশগত রোগে এলোমেলো হয়ে গেছে আনিছুলের পুরো পরিবার। বর্তমানে চোখের আলো হারানো কর্মহীন আনিছুলের সারাদিন কাটে বাড়িতে। 
 
এদিকে আনিছুলের বড়ভাই আবদুল আহাদেরও চোখে কোনো আলো নেই। আহাদ ডিগ্রি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। অনেক স্বপ্ন নিয়ে নিজ এলাকার ছেলে-মেয়েদেরকে শিক্ষার আলো দিতে গড়েছিলেন মন্থনা বেসরকারি রেজি. প্রাথমিক বিদ্যালয়। বেশ কয়েক বছর সেটি চালিয়েছেন তিনি। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন পূর্ব পুরুষদের মতো তারও দৃষ্টিশক্তি কমে আসতে থাকে তখন বন্ধ হয়ে যায় তার হাতে গড়া বিদ্যালয়টি। আহাদ এক সময় গ্রামের ছেলে-মেয়েদেরকে প্রাইভেট পড়াতেন। এখন চোখের আলো হারিয়ে সবকিছুই থমকে গেছে তার। তবে ছোট ভাইয়ের মতো নিঃসঙ্গ জীবন নয় তার। আহাদের রয়েছে স্ত্রী-সন্তান। বর্তমানে সেলাইয়ের কাজ করে পুরো পরিবারকে ভালো রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন আহাদের স্ত্রী।
 
আনিছুল ও আহাদের মতো অন্ধত্ব তাড়া করেছে তার বোন শাহানাজ পারভীনকে। এই তিন ভাই-বোন এখন আলো থেকে বহু দূরে। শিক্ষা-দীক্ষায় নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল শাহানাজেরও। এ বছর স্থানীয় জাফরগঞ্জ ফাজিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেবার কথা ছিল তার। কিন্তু হঠাৎ করেই পরিবারের অন্যদের মতো তারও জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। সেই অন্ধকারে থমকে যায় পরীক্ষা দেয়া। শাহানাজের একটা চোখের আলো নিভে গেছে, আর এক চোখে ঝাপসা দেখে সে। বর্তমানে দিনের আলোতে নিজে নিজে চলাফেরা করতে পারলেও বিকেলের পর সবই অন্ধকার দেখে শাহানাজ। 
 
স্থানীয় এলাকাবাসী মাহবুবুল ও আবদুল হক জানান, বর্তমানে এই পরিবারের ৫ জন সদস্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে খুব কষ্টে জীবনযাপন করছেন। তাদের ভিটে বাড়ি ছাড়া আর কোনো কিছু নেই। এলাকার বিভিন্ন লোকজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এই পরিবারকে মাঝে মধ্যে কিছু আর্থিক সহযোগিতা দেয়। সেটা দিয়েই কোনো মতে তাদের সংসার চলছে।
 
অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষক হাসান আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আহাদ, আনিছুল ও শাহানাজের দাদি মরজিনা বেগম এবং ফুফু হোসনে আরা একই রোগে আক্রান্ত। তারা সবাই দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এই পরিবারের এখন উপার্জন করার মতো কেউ নেই।
 
এদিকে আহাদ ও আনিছুলের প্রত্যাশা, সমাজের বিত্তমান মানুষরা এগিয়ে আসলে তারা চিকিৎসার মাধ্যমে হয়তো আবারো দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। ফের স্বাভাবিক জীবনে হয়তো হাসি খুশিতে থাকবে তারা। 

আপনার মতামত লিখুন :