ভেড়াগুলোই এখন রেহানার সন্তান!

কান্ট্রি ডেস্ক, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ঠাকুরগাঁও: সকল প্রাণীর মাঝে প্রেম-ভালোবাসা বিরাজমান থাকে। মানুষ যেমন মানুষকে ভালোবাসে তেমনি প্রাণীরাও প্রাণীদের ভালোবাসে। আবার কিছু কিছু ভালোবাসা হয় মানুষ ও প্রাণীর মাঝে। প্রাণীদের প্রতি ঠিক এমনি এক ভালোবাসা দেখা যায় ঠাকুরগাঁও রোডের সুগারমিল কলোনি এলাকায়।

বুধবার (২৫ জুলাই) সকালে ওই এলাকার উত্তর হরি-হরপুর গ্রামে গেলে চোখে পড়ে এমনি একটি দৃশ্য। ফাঁকা একটি মাঠে কিছু ভেড়াকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে পরম আনন্দে খেলা করছেন মৃত হবিবর রহমানের স্ত্রী রেহানা বেগম (৫৫)।

কাছে যেতেই মুচকি একটি হাসি দিয়ে রেহানা বেগম বলেন,‘আমি আমার সন্তানের মতো এই ভেড়াগুলোকে ভালোবাসি। বিক্রি করার প্রশ্নই ওঠে না।’

মুহূর্তের মধ্যে রেহানা বেগমের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেল। এবার শোনা গেল তার জীবনের কিছু দুঃখ ভরা কাহিনীর কথা।

জানা যায়, দীর্ঘদিন আগেই মারা যায় রেহানা বেগমের স্বামী হবিবর রহমান। জীবিত থাকা অবস্থায় তার স্বামী কলা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। মাঝে মাঝে চালাতেন রিকশা। এভাবেই কোনো রকমে কেটে যেত তাদের দিন। এরপর স্বামীর হঠাৎ মৃত্যুতে তাদের সংসারে নেমে আসে কালো মেঘ। তিন সন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পরেন রেহানা। ওই সময় থাকার জায়গাতো দূরের কথা খাওয়াই তাদের জুটত না।

তখন এলাকাবাসীর সহযোগিতায় উত্তর হরি-হরপুর গ্রামে একটি জায়গায় তাদের থাকতে দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয়দের সাহায্যে কষ্টের মধ্যে কোনো রকমে কেটে যায় তার সংসার। এক পর্যায়ে বড় ছেলে বাহাদুরের বিয়ে দেন। তিন সন্তানদের মধ্যে বর্তমানে কেউ কাজ করেন হোটেলে, কেউবা রিকশা চালায়, কেউবা বেকার।

তবে অভাবের সংসারে এক সময় রেহানাকে ছেড়ে তিন সন্তানই চলে যায়। নিঃস্ব জীবনে তার সঙ্গী হয় বড় ছেলের কিনে দেয়া ২টি ভেড়া। এরপর আস্তে আস্তে এই ভেড়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন ৩০টি ভেড়া আছে রেহানার।

অভাবের সংসারে কীভাবে ভেড়াগুলোর দেখাশুনা করেন এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘যেখানে মানুষের দেয়া খাবারের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছি সেখানে সঠিক ভাবে ভেড়াগুলোর যত্ন নিব কীভাবে? বাসার সামনে মাঠ আছে। সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ভেড়াগুলো। সারাদিন ওই মাঠ আর আশপাশের সড়কে ঘুরে ফিরেই ভেড়াগুলোর বেলা কেটে যায়। সন্ধ্যা হলেই বাড়ি ফিরে আসে ওরা। এরপর আর কী খেতে দেবো? আমি নিজেইতো পেট ভরে একবেলা ভাত খেতে পারি না।’

/uploads/files/pzyHUWYE39HfZ0aWygXHBusRij2EHXumM2gZypQ9.jpeg

স্থানীয় বাসিন্দা জাহানা জুই বলেন, ‘অনেকদিন ধরেই দেখে আসছি এই রেহানা বেগমকে। সারাদিন যার তার বাসায় কাজ করেন তিনি। কিন্তু কাজ করতে করতে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান তিনি। পরে খবর নিয়ে জানা যায় তিনি তার ভেড়া নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বেশি সময় অন্যের বাসায় কাজ করতে পারেন না। তার ভয়ের কারণ কাছে না থাকলে ভেড়ার বাচ্চাগুলোকে যদি কুকুরে খেয়ে ফেলে বা অন্য কোনো বিপদ হয়। এ কারণে ভেড়াগুলোকে তিনি চোখের আড়াল করতে চান না।’

জুই আরও বলেন,‘রেহানা যেভাবে ভেড়াগুলোকে সময় দেয় তাতে প্রাণীদের প্রতি তার ভালোবাসাটি স্পষ্ট। তিনি আসলেই অনেক মহৎ মনের মানুষ। প্রাণীদের সঙ্গে এমন ভালোবাসা দেখে এলাকাবাসী তার প্রতি মুগ্ধ।’

রেহানা বেগম জানান, ভেড়া পালন করতে কষ্ট অনেক কম। তাদের খুব বেশি অসুখ হয় না। বছরে একটি স্ত্রী ভেড়া দুইবার এক থেকে দুটি বাচ্চা প্রসব করে থাকে।

মনের কষ্ট নিয়ে রেহানা বলেন, ‘মানুষই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে। কিন্তু প্রাণীরা করে না। এই ভেড়াগুলো আমার কাছে সন্তানের মতো। এগুলো বিক্রির প্রশ্নই ওঠে না। তবে কষ্ট হয় যখন ভেড়াগুলো সঠিক পরিচর্যার অভাবে মারা যায়। আমার কাছে তো টাকা নেই, তাই চিকিৎসা করাতে পারি না। ৫৫ বছর হলেও এখনো আমি বিধবা বা বয়স্ক ভাতা পাই না। শুনেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমার মতো অনেক গরীব মানুষদের সাহায্য করছেন। তাহলে আমি কী গরীব না? আমার কী এসব ভাতা পাবার অধিকার নেই?’

এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, ভেড়া পালনের সুবিধা অনেক। তাদের জন্য বাড়তি কোনো খাবার লাগে না। একটু খেয়াল রাখলেই চলে। তেমন কোনো শ্রমও দিতে হয় না। তবে রেহানা বেগম যদি প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা চান তাহলে তা করার চেষ্টা করা হবে।

এ ব্যাপারে জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু বক্কর সিদ্দীক জানান, রেহানা বেগম বয়স্ক ভাতার জন্য প্রাপ্ত নন। বয়স্ক ভাতা দেয়ার একটি নিয়ম আছে। মেয়েদের জন্য বয়স কমপক্ষে ৬০ এর মধ্যে হতে হবে। তাই বয়স্ক ভাতাটি তিনি পাচ্ছেন না। তবে বিধবা ভাতার জন্য তাকে একটি দরখাস্ত করতে হবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন :