ভাইজানের অপেক্ষায় শোকাহত খুলনাবাসী

কান্ট্রি ডেস্ক, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

খুলনা: উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিপ্রস্তর, নাট্যানুষ্ঠান বা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন, বিচার-সালিশ, দলীয় বা জাতীয় কর্মসূচিতে এসএম মোস্তফা রশিদী সুজার জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা নেতাকর্মীরা আজ শোকাহত। শেষবারের মতো প্রিয় নেতার নিথর মুখ দেখার অপেক্ষায় আবেগাপ্লুত খুলনাবাসী। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে গত দুইদিন খুলনা ছাপিয়ে আলোচনায় এ নক্ষত্রের শূন্যতা।

গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ৫ মিনিটে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া এলাকার সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, খুলনাবাসীর ভাইজান খ্যাত জননেতা এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা মারা যান।

রোববার (২৯ জুলাই) বিকেলে ঢাকা থেকে বিমানযোগে খুলনায় এসে পৌঁছাবে এই নেতার মরদেহ। এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর থেকে বিমানযোগে তার মরদেহ ঢাকা এসে পৌঁছায়। পরিবারের সদস্যরা এ খবর নিশ্চিত করেছেন।

পারিবারিক সূত্র জানায়, মোস্তফা রশিদী সুজার মরদেহ খুলনা আনার পর রোববার বিকেল ৩টায় লোয়ার যশোর রোডে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের নিচে রাখা হবে নেতাকর্মীদের শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্যের জন্যে। সাড়ে ৩টায় শহীদ হাদিস পার্কে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বাদ আছর মরহুমের সর্বশেষ নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

তারা আরও জানায়, ঢাকাতে সংসদ সদস্য সুজার মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়েছে। রোববার সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলের নেতা প্রয়াত মোস্তফা রশিদী সুজার কফিনে পুস্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানাবেন। জানাজা শেষে হেলিকপ্টার যোগে খুলনায় নেয়া হবে। শহীদ হাদিস পার্কে জানাজা শেষে নগরীর টুটপাড়া কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরে শায়িত করা হবে তাকে।

এদিকে গত ৭ এপ্রিল নগরীর শহীদ হাদিস পার্কে অনুষ্ঠিত গণসংবর্ধনাই ছিল মোস্তফা রশিদী সুজার জীবনের সর্বশেষ জনাকীর্ণ জমায়েত। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘খুলনাবাসী ও দেশ-বিদেশের মানুষের দোয়া ও ভালোবাসায় আল্লাহর রহমতে আমি আপনাদের মাঝে ফিরে এসেছি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনলাইনে খুলনার পত্র-পত্রিকা পড়ে খুব আনন্দ পেতাম। আলম হাওলাদার স্বেচ্ছায় আমাকে কিডনি দান করেছেন। বাকিটা জীবন আমি খুলনাবাসীর ভালোবাসা নিয়ে পথ চলতে চাই।’

ভুল-ত্রুটি হলে ধরিয়ে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমি নতুন জীবন পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং শেখ হেলাল উদ্দিন এমপি, শেখ জুয়েল, তন্ময় বারবার সিঙ্গাপুরে গিয়ে আমাকে সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এ জন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

/uploads/files/rVGHXKgqeTRdDDCS7xtD6IzrTAD5RKZwZ1Gsx11W.jpeg

স্বল্প পরিসরের এ বক্তব্য সেদিন অশ্রুসিক্ত করেছিল উপস্থিত সকলকেই। তবে সে নতুন জীবনের স্থায়িত্ব বড় কম সময় পেলেন ভাইজান। খুলনাবাসীর ভালোবাসায় পথ চলার সুযোগ না পেলেও সর্বস্তরের মানুষের অশ্রুসিক্ত দোয়ায় পরকালে যাত্রা করলেন তিনি। মৃত্যু খবর প্রচারের পাশাপাশি তার মাগফিরাত কামনায় গেল শুক্রবার খুলনার মসজিদে মসজিদে বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। শহরের অলি-গলিতে ও গ্রামে-গঞ্জের সর্বত্র আলোচনার বিষয়বস্তু এ বর্ণাঢ্য রাজনীতিকের শূন্যতাকে ঘিরে।

১৯৫৩ সালের ২ মার্চ বাগেরহাটের ফকিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন এসএম মোস্তফা রশিদী সুজা। বাবা শেখ মোকবুল আহমেদ ও মা রাশিদা খানমের বড় সন্তান তিনি। পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় ছোট ভাই-বোনদের ভাইজান সম্বোধনটা পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে এক সময় নেতাকর্মীদের কাছে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। এরপর নেতাকর্মীদের ছাপিয়ে খুলনার মানুষের কাছে ভাইজান সম্বোধনেই পরিচিত লাভ করেন এ প্রিয় নেতা। খুলনা তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়নে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল সব সময়।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে ১৯৭৭ সালে খুলনা পৌরসভা কমিশনার নির্বাচিত হন। সেই থেকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন ও আমরণ খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য পদ অলংকৃত করেন বর্ষীয়ান এই জননেতা। ১৯৮৬ সালে খুলনা-২ আসনে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেন মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি থাকাকালে। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে তিন দফায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন খুলনা-৪ আসন থেকেই। এরমধ্যে ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের হুইপের দায়িত্ব পালন করেন। সেই দুঃসময়ে ১৯৯১ সাল থেকে খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন তিনি। শত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে হাজারো দুঃসময়ে আর্দশে অনড়-অবিচল ছিলেন ত্যাগী এ রাজনীতিক।

খুলনার সহস্র মানুষকে নিজের সারা জীবন উজাড় করে দিয়েছেন মোস্তফা রশিদী সুজা। আজ তার ফিরে যাওয়ার পালা। তাই শেষবারের মতো কৃতজ্ঞচিত্তে এ কৃতি সন্তানকে অশ্রুসিক্ত নয়নে ব্যাথা ভরা হৃদয়ে শেষ বিদায় জানাবার অপেক্ষায় খুলনাবাসী।