হাত হারানো শাহাকুলের হার না মানার গল্প

হাত হারানো শাহাকুলের হার না মানার গল্প। ছবি: বার্তা২৪.কম

মাজেদুল হক মানিক, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, মেহেরপুর, বার্তা২৪.কম

প্রতিবন্ধী মানেই অন্যের গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকা নয়, পরিবার কিংবা সমাজের বোঝাও নয়। আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দিয়ে দান-দক্ষিণার জন্য অন্যের দুয়ারে দুয়ারে ছুটে চলা স্বাভাবিক পন্থা। কিন্তু এর ব্যতিক্রম কিছু দৃষ্টান্ত স্থাপন করে অনেকেই এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন। তাদেরই একজন মেহেরপুর সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের শাহাকুল ইসলাম।

আত্মমর্যাদা বোধ থেকেই ভিক্ষাবৃত্তি ও পরনির্ভরশীলতার বিপরীতে স্রোতের যাত্রী তিনি। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দুটি হাত হারালেও আত্মশক্তিতে বলীয়ান। একটি ছাগলের খামার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রোজগারের রাস্তা তৈরি করেছেন। এ যেন দরিদ্রতার বিরুদ্ধে যুদ্ধের এক আলোক মশাল।

জীবনের চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও হার মানেননি শাহাকুল। একমাত্র মানসিক শক্তি দিয়েই প্রতিকূলতা জয় করার চেষ্টা করছেন। শোনালেন জীবনের চরম বাস্তব দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার কথা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/11/1549886376690.jpg

শাহাকুল ইসলাম জানান, তার বয়স যখন ১১ বছর, তখন মাঠে ছাগল চরাতে গিয়ে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির স্পর্শে বিদ্যুতায়িত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাতের বিভিন্ন অংশে পচন ধরে। এ সময় তার দুই হাতই কেটে ফেলতে হয়। চিকিৎসার জন্য পরিবারকে গুনতে হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। অভাবের সংসারে আদরের শিশু ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকে বাবা জামাত আলী আর মা বুলুজান খাতুন। তাদের কষ্টের কথা ভেবে অনেকেই শাহাকুলকে ভিক্ষাবৃত্তির পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাঁধ সাধে আত্মমর্যাদাবোধ। না, ভিক্ষাবৃত্তি ভালো নয়, কারো অনুগ্রহ নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। বলছিলেন শাহাকুল।

তিনি আরও জানান, নদীর বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতোই একের পর এক সমস্যা সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল। ধারদেনা পরিশোধ তো দূরের কথা, সংসারের নিত্যকার খরচই জোগানের মতো অবস্থা ছিল না বাবা-মায়ের। আর দুই হাত হারানো শাহাকুলতো কাজ করতে পারবে না। তাকে কেউ কাজও দেবে না। তাই বলে কী আর থেমে থাকা যায়?

দরিদ্রতা ঘোচানোর চরম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রতিবন্ধী শাহাকুল। পরিবারের শেষ সম্বল দিয়ে ৫টি ছাগল কেনেন। এখান থেকেই পরিবর্তনের যাত্রা শুরু। গ্রামের পার্শ্ববর্তী মাঠে ছাগল চরানোর পাশাপাশি তার সার্বক্ষণিক দেখভালের কাজ করেন তিনি। লালন-পালনের মধ্য দিয়ে বাড়তে থাকে ছাগলের সংখ্যা। কয়েক বছরের মধ্যেই ওই ছাগলের সংখ্যা বেড়ে একটি খামারে পরিণত হয়। ধরা দিতে থাকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ছাগল বিক্রির আয় দিয়েই চলতে থাকে সংসারের খরচ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/11/1549886402437.jpg

শাহাকুল জানান, কয়েক বছর আগে বিয়ে করেছেন তিনি। দাম্পত্য জীবনে এক সন্তানের জনক। বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনো মতে সংসার চলে। তারপরেও শারীরিক এ অবস্থা নিয়ে আয়-রোজগার করতে পারা গর্বের ও প্রশান্তির।

হার না মানা এই প্রতিবন্ধীর স্ত্রী তারিফা খাতুন জানান, স্বামী অক্ষম হলেও তার কর্মে তিনি গর্বিত। বুঝে-শুনেই তার সঙ্গে সংসার পেতেছেন। ব্যক্তিগত ও সংসারের আবদার তেমন মেটাতে না পারলেও তাদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন এটাই বড় পাওয়া।

শাহাকুলের বাবা জামাত আলী জানান, ছাগল বিক্রির টাকা দিয়ে সংসার চলে তাদের। তাই সরকারি ভাবে ঋণ পেলে খামারটি বাড়াতে পারবেন।

গ্রামের দুলাল মিয়া জানান, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়, এটি প্রমাণ করেছেন শাহাকুল। তার এ সাফল্যে গর্ববোধ করে এলাকাবাসী। এ ধরনের প্রতিবন্ধীদের সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতার দাবি করেন তিনি।

সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আশরাফুর জানান, প্রতিবন্ধীরা যাতে পরনির্ভরশীল না থাকে সেই লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় তাদের ঋণ সহযোগিতার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

জেলা এর আরও খবর