Alexa

নরসুন্দর যখন গান ও সুরের কারিগর

নরসুন্দর যখন গান ও সুরের কারিগর

নরসুন্দর লিটন ভিখারি, ছবি: বার্তা২৪.কম

নরসুন্দরের কাজ নরকে (মানুষ) সুন্দর করা। হাতের নিপুন কৌশলে খুর-কাঁচি দিয়ে একজন নরসুন্দর সেই কাজ সম্পন্ন করেন নিঁখুতভাবে। তবে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর ইউনিয়নের বর্ধনপাড়া গ্রামের লিটন ভিখারি (৪১) শুধু নরকে সুন্দরই করেন না, সুন্দর সুন্দর গান ও কবিতাও লিখতে পারেন। আবার নিজের গানে নিজেই সুর তোলেন। কিন্তু সাধ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে অ্যালবাম ও কবিতার বই বের করা হচ্ছে না লিটনের।

জানা গেছে, লিটন ভিখারি ওই গ্রামের আব্দুল খালেকের ছেলে। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। অভাবের তাড়নায় পৈত্রিক সূত্রে এই পেশায় এসেছেন তিনি। বুধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বর্ধনপাড়া গ্রামের সেলুনে বসে কথা হয় লিটন ভিখারির সাথে। এ সময় তিনি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘অভাবের কারণে ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে নরসুন্দরের কাজ করি। বাবার সাথে কাজ করতে যাওয়ার সময় মনের ভেতর থেকেই দুই-একটি গানের কথা বেরিয়ে আসতো। কিন্তু লেখাপড়া না জানায় গানগুলো আমি লিখে রাখতে পারতাম না। ১৯৯৩ সালে ঢাকার একটি সেলুনে কাজ করার সময় সহকর্মী শাহজাহান আমাকে সামান্য লেখাপড়া শিখিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে ‘দম যে বাঁবুই পাখির বাসা’ শিরোনামে একটি গান লিখে নিজেই সুর করেছিলাম।’

জানা গেছে, লিটন ভিখারি বর্তমানে বর্ধনপাড়া গ্রামের ছোট্ট একটি দোকান ভাড়া নিয়ে নরসুন্দরের কাজ করেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি গান ও কবিতা লেখেন। কিন্তু নিজের কাজ চুরি হতে পারে এই ভয়ে তিনি এসব কাউকে দেখাতে চান না। তবে সেলুনে বসে প্রতিদিন গানের রেওয়াজ করায় তার প্রতিভার বিষয়টিও প্রকাশ হয়ে যায়।

আরো জানা গেছে, লিটন ভিখারি গত ২০ বছরে প্রায় ৮০টির মতো গান লিখে নিজেই সুর করেছেন। তার বেশিরভাগ গান-বিচ্ছেদ, বাউল ও ফোক ঘরানার। গান লেখার পাশাপাশি এই শিল্পী কবিতাও লিখেছেন বেশ কয়েকটি। ভবিষ্যতে নিজের বাছাই করা কবিতা নিয়ে একটি বই বের করার ইচ্ছা আছে তার।
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Feb/22/1550795597357.jpg

লিটন ভিখারি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আমি শুধু আমার গানগুলো লিখে সুর করেছি। এসব গান কখনো বাদ্যযন্ত্র কিংবা মিউজিকের তালে গাওয়া হয়নি। তাই গানগুলো নিয়ে ভালোভাবে কাজ করলে প্রত্যেকটি গান জনপ্রিয়তা পাবে।’

দাম্পত্য জীবনে লিটন ভিখারির স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে। বড় ছেলে সামীউল হাসান নবম শ্রেণিতে, ছোট ছেলে মেহেদি হাসান মাদ্রাসায় হেফজ ও ছোট মেয়ে ফাতেমা শিশু শ্রেণিতে পড়ে। প্রতিদিন নরসুন্দরের কাজ করে লিটনের আয় হয় ৪-৫শ’ টাকা। এই টাকা দিয়েই চলে তার সংসার ও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ।

সেলুনে বসেই কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. শহীদুল্লাহর সাথে। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি সেলুনে আসলেই লিটন আমাকে নিজের লেখা গান ও কবিতা শোনান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই স্বশিক্ষিত একটা মানুষ কিভাবে গান ও কবিতা সৃষ্টির কারিগর হয়ে উঠলেন, লিটন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

কথার রেশ টেনে লিটন বলেন, ‘ভাবলেই লাভ কি শহীদ ভাই, গান-কবিতা কেনোটাই তো কাজে লাগাতে পারলাম না। তবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটা কবিতা লিখছি। যদি কোনোদিন তার কন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামনে এই কবিতা উপস্থাপন করতে পারি তাহলে আমার জীবনটা ধন্য হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :