Alexa

আদালতপাড়া যেন চিড়িয়াখানা!

আদালতপাড়া যেন চিড়িয়াখানা!

প্রকাশ্যেই চলছে পুলিশের ঘুষ বাণিজ্য, ছবি: বার্তা২৪

কক্সবাজার কোর্ট পুলিশের চাঁদাবাজি নতুন কোনো ঘটনা নয়। যারা কোর্ট সেলে আসামি দেখতে গিয়েছেন তারা নিয়মিত চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। আর যারা আসামি দেখতে যাননি তারাও জানেন আসামির স্বজন থেকে কোর্ট পুলিশ কিভাবে টাকা আদায় করেন। দিনের মতো পরিষ্কার কোর্ট সেলে আসামি দেখতে গেলে টাকা ছাড়া আসামির সাথে দেখা করতে দেয় না পুলিশ। স্ব-ঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে কোর্ট পুলিশের এ চাঁদাবাজি। এ যেন চিড়িয়াখানায় বাঘ-ভাল্লুক দেখতে যাওয়ার মত। টিকেট (টাকা) নেই তো আসামির সঙ্গে স্বজনদের দেখা নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শত শত মানুষ কোর্টের পাশে টাকার অভাবে স্বজনদের সাথে দেখা করতে পারেননা।

তবে ইয়াবা ও মানবপাচারকারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা। তাদের আত্মীয়স্বজনরা আসলে জামাই আদরে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সেখানে বসেই আসামির সাথে আড্ডা দিতে পারেন। প্রয়োজনে ঘুমিয়ে নিতে পারেন।

চকরিয়া থেকে আসা নুর হোসেন জানান, মঙ্গলবার সকাল দশটা থেকে কোর্টে এসে অপেক্ষা করছেন তিনি। ভাইয়ের জন্য বাড়ির থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে এসেছেন। খাবার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে গেলে লাগবে ৫০০ টাকা। পরে পুলিশের সাথে ৩০০ টাকায় রফাদফা হয়। যদিও ভাইয়ের হাতে নয় সেলঘরে খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্যই ৩০০ টাকা নিয়েছেন সেই পুলিশ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Apr/10/1554894661330.gif

তিনি আরও জানান, ২০০ টাকা আরও দিয়ে ভাইয়ের সাথে ১০ মিনিট একান্তে কথা বলতে পেরেছেন।

এভাবেই শত শত মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সেখানকার পুলিশ। অনেকটা বাধ্য হয়েই স্বজনরা চুপ করে আছেন।

এর মধ্যে টেকনাফের সাজু মিয়া ও  মনিরা বেগম বলেন, ‘ছেলের সাথে দেখা করে ভাত দিতে এসেছিলাম। প্রথমে ৭০০ টাকা পরে ভাত দিতে আরো ৩০০ টাকা দিয়েছি। এভাবে অসংখ্য ভুক্তভোগীদের তীব্র ক্ষোভ কোর্ট পুলিশের বিরুদ্ধে।’

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, জিআর মামলার ফটোকপি ১০০ টাকা, মামলা ফাইলিংয়ের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ টাকা, সিআর মামলার ফটোকপি নিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, বেলবন্ড প্রতি ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, জামিনপ্রাপ্ত আসামি কোর্ট থেকে ছাড়াতে ১০০ টাকা, ১৬৪ ধারার ফটোকপি তুলতে ২০০ টাকা, ৩৪ ধারার মামলার আসামির জামিনের ক্ষেত্রে সুযোগ বুঝে অর্থ আদায়, রিকল সাক্ষর করতে ১০০ টাকা, কোর্ট হাজত খানায় আসামির সাথে দেখা করতে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ করতে হয় স্বজনদের।

এছাড়া একটু বিশেষভাবে দেখা করা কিংবা কথা বলার সুযোগ পেতে হাজতের দায়িত্বরত পুলিশের হাবিলদারের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে হয়।

আর খাবার দিতে ১০০/২০০ টাকা, ওকালতনামায় আসামির সাক্ষর করাতে হলে ২০ টাকা করে প্রকাশ্য ঘুষ নেয়া হচ্ছে। এই টাকা আদায় ও বণ্টনের দায়িত্বে রয়েছেন কোর্ট পুলিশের হুমায়ন নামে কোর্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা। 

দীর্ঘদিন ধরে কোর্ট পুলিশের ওসির কক্ষের আশপাশেই প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য চলছে। তবে কেউ এর প্রতিবাদ না করে ‘ম্যানেজ ফর্মুলা’য় তুষ্ট থাকেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আইনজীবীর সহকারী বলেন, ‘কোর্ট পুলিশের বেপরোয়া ঘুষ দুর্নীতিতে ভুক্তভোগীরা সকলেই চরম ক্ষুব্ধ কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছেন না। কোর্টে জিআরও ও কনস্টেবলদের সাথে মাঝে মধ্যে ঘুষ আদায় নিয়ে আইনজীবী সহকারীদের বাকবিতণ্ডা হয়ে থাকে। কারণ আগে কোনো নথি বা চার্জশিট তুলতে যা দিতাম এখন তারও রেট বাড়িয়েছে। এমনকি আদালত চলাকালীন সময়ে হাজিরা দিতে আসা আসামি কিংবা রিমান্ড শুনানি হলেও কোর্ট পুলিশদের টাকা দিতে হয়। তাদের মতে গোটা আদালত অঙ্গণে এক ধরণের নৈরাজ্য কায়েম করেছে চলছে পুলিশ প্রশাসন।’ 

তবে কোর্ট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র মতে, ‘যেসব বড় বড় ক্যাডার, ইয়াবা ব্যবসায়ী-মানবপাচারকারী ও আসামিরা জেলে রয়েছেন তাদের কোর্টের দিন হাজতখানায় আনা হলে বাহিরের নেতা ও পরিবারের সাথে খোলামেলা পরিবেশে দেখা ও গোপন কথা বলার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য মোটা অংকের লেনদেন হয়ে থাকে। 

বিষয়টি অবগত নয় বলে জানিয়ে কক্সবাজার কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক মোর্শেদ পারভেজ বার্তা ২৪.কমকে বলেন, ‘আমি নতুন জয়েন করেছি। বিষয়টি এখনো নজরে পড়েনি। তবে সবাইকে বলে দেয়া হয়েছে কেউ যাতে এখানে হয়রানির শিকার না করে। টাকা পয়সার বিষয়ে আপনাকে কিছু বলতে পারছি না। আপনি অফিসে আইসেন বলে তিনি ফোন কেটে দেন।’

আপনার মতামত লিখুন :

জেলা এর আরও খবর