Alexa

মংলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প: টয়লেটের ৭৭ লাখ টাকা হরিলুট

মংলায় আশ্রয়ণ প্রকল্প: টয়লেটের ৭৭ লাখ টাকা হরিলুট

আশ্রয়ণ প্রকল্প/ছবি: সংগৃহীত

বাগেরহাটের মংলায় সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক আশ্রয়ণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

‘জমি আছে ঘর নেই, নিজ জমিতে গৃহ নির্মাণ’ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প-০২ এর অধীনস্থ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে মানা হয়নি যথাযথ নিয়ম। এ প্রকল্প নিয়ে জনপ্রতিনিধি ও উপকারভোগীদের মধ্যে রয়েছে নানামুখী ক্ষোভ। গৃহ নির্মাণের অনিয়মের বিষয়টি গত মাসে অনুষ্ঠিত বাগেরহাট জেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন (স্থানীয় সংসদ সদস্য) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার।

এদিকে এ অনিয়মের বিষয়ে তদন্তে নেমেছেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো: শাহিন হোসেন।

তিনি বলেন, দুই এক জায়গায় টয়লেট হয়েছে। তবে বেশির ভাগ জায়গাতেই টয়লেট নির্মাণ হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে তারাই পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতাধীন এ ঘর শুধুমাত্র অসহায় ও দুস্থ্য যাদের জমি আছে, গৃহ নির্মাণের সামর্থ্য নেই তাদের পাওয়ার কথা। গত ২০১৬-২০১৭ ও ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে মংলা উপজেলায় ৪৮৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এ প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণকারী ও উপকারভোগীদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়ও রয়েছে অস্বচ্ছতা। এছাড়া প্রকল্পের যে নিদের্শনা রয়েছে তাও দেখভাল করার দায়িত্বে নিয়োজিতরা হরিলুট করেছেন এ প্রকল্পের লাখ লাখ টাকা। যারা ঘর পেয়েছেন তাদের অনেকেরই ঘরের অবস্থা নাজুক ও নিম্নমানের, বসবাসের উপযোগী হিসেবে নির্মাণ করা হয়নি অধিকাংশ ঘর। এ প্রকল্পে ঘরের সাথে টয়লেট নির্মাণের কথা থাকলেও সেখানেও হয়েছে পুকুর চুরি।

প্রতিটি ঘরের অনুকূলে টয়লেটসহ বরাদ্দ ১ লাখ টাকা। এরমধ্যে ঘর সংযুক্ত টয়লেটের জন্য বরাদ্দ প্রায় ১৯ হাজার টাকা।

এ প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বলে ও সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বজনপ্রীতি ও নগদ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেই এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মংলা উপজেলা পর্যায়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিক এ প্রকল্পের সভাপতি সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গৃহ নির্মাণে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার ছাড়াও শুধু ৪৮৫টি ঘরের অনুকূলে সমপরিমাণ টয়লেটের প্রায় ৭৭ লাখ টাকা লুট হয়েছে। এ নিয়ে ঘর পাওয়া দুস্থ পরিবার ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। আর এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে।

সাবেক মংলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: রবিউল ইসলাম বলেন, যাতে কোন ধরণের অনিয়ম না হয় সেজন্য তৃতীয়পক্ষ ঢুকতে না দিয়ে ঘর মালিকদেরকেই তিনটি চেকের মাধ্যমে টাকা দেয়া হয়েছে। মালিকদের দিয়ে ঘর তৈরি করে দিয়েছি। এছাড়া টাকা পয়সা নিয়ে কোন অনিয়ম হয়নি বলে দাবী করেন তিনি।

এ প্রকল্প প্রসঙ্গে উপজেলার মিঠাখালী ইউপি চেয়ারম্যান ইস্রাফিল হাওলাদার বলেন, তার ইউনিয়নে ১৫০টি ঘর বরাদ্দ হয়েছে। কিন্তু কিভাবে উপকারভোগীদের যাচাই-বাছাই করা হয়েছে তা তিনি জানেন না। এছাড়া ঘর নির্মাণের বরাদ্দ ও কোন প্রক্রিয়ায় ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে তাও অবগত করা হয়নি কেউকে।

তিনি আরো বলেন, টয়লেটসহ স্বাস্থ্য সম্মত এ ঘর নির্মাণের কথা থাকলেও তার ইউনিয়নে যে সকল ঘর বরাদ্দ ও নির্মাণ করা হয়েছে তার একটিতেও টয়লেট নেই।

এ প্রকল্পের অধীনে ঘর পেয়েছেন মংলার চিলা ইউনিয়নের কলাতলা গ্রামের বিপুল মন্ডল।

তিনি বলেন, তার ঘরের সঙ্গে টয়লেট সংযুক্ত তো দূরের কথা ঘরের বেড়ার প্রয়োজনীয় টিনও নিজে যোগান দিয়েছেন। নিজের পকেটের প্রায় ১৬ হাজার টাকা খরচ করেছেন ঘরের পিছনে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ নাহিদুজ্জামান বলেন, সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী এ প্রকল্প বাস্তবায়নে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সভাপতি ও তিনি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা রয়েছে। কিন্ত সদস্য সচিব হিসেবে তার দায়িত্ব নামেই কাগজ কলমে ছিল। কিভাবে দুস্থদের তালিকা তৈরি ও গৃহ র্নিমাণ হয়েছে তার কিছুই জানা নেই বলে দাবী করেন তিনি।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে মংলা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের হাওলাদার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জমি আছে ঘর নেই, প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ হরিলুট হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ প্রকল্পের বিদ্যমান অনিয়ম কখনও কাম্য নয়।

তিনি আরো বলেন, এ সকল ঘর নির্মাণের কাজে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া একটি ঘরও স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশ উপযোগী হিসেবে নির্মিত হয়নি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, উপজেলা পরিষদের জনৈক এক নৈশ্য প্রহরীর মাধ্যমে ঘর প্রাপ্য উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করা হয়। আর এ তালিকা তৈরিতেও অনিয়ম হয়েছে বলে তার অভিযোগ।

উপজেলা চেয়ারম্যান আবু তাহের আরো বলেন, উপকারভোগী ও ঘর পাওয়া ব্যক্তিদের মাধ্যমে এ প্রকল্পের নানা অনিয়ম নজরে আসে। পরিবর্তীতে খোঁজ খবর নিয়ে অনিয়মের সত্যতা পান।

গত ২১ এপ্রিল বাগেরহাট জেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় সভায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ প্রকল্পের অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে অসন্তোষ প্রকাশ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার। একই সঙ্গে এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করবেন বলেও ওই সভায় জানান উপমন্ত্রী।

আপনার মতামত লিখুন :