Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

৪৫ বছর ধরে সেহরি খেতে ডেকে তোলেন আকবর

৪৫ বছর ধরে সেহরি খেতে ডেকে তোলেন আকবর
মাইক ব্যবসায়ী আকবর আলী। ছবি: বার্তা২৪.কম
রাকিবুল ইসলাম রাকিব
উপজেলা করেসপন্ডেন্ট
বার্তা২৪.কম
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ)


  • Font increase
  • Font Decrease

‘প্রায় ৪২ বছর আগের কথা। পবিত্র রমজান মাসের রাত। রাস্তা-ঘাট সব জনশূন্য। সেহরির সময় রোজাদারদের ডেকে তুলতে রিকশা নিয়ে মাইকিং করতে বের হই। শহরের অলি-গলি ঘুরে নতুন বাজার আসতেই দেখি সড়কে অনেকগুলো শিয়াল শুয়ে আছে। রিকশায় বসে অনবরত বেল বাজানোর পরও শিয়ালগুলো যাচ্ছিল না। উল্টো হিংস্র দৃষ্টিতে বারবার তাকাচ্ছিল।

রিকশা চালক সড়ক থেকে একটি লাঠি নিয়ে তাড়া করতেই শিয়ালগুলো উল্টো আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। ভয় পেয়ে চালক দৌড় দিল। আমিও ভয় পেয়ে মাইকে ডাক শুরু করলাম, ‘আমাদের শিয়াল তাড়া করেছে। আমাদের বাঁচান।’ পরে এলাকাবাসী এগিয়ে আসলে আল্লাহর রহমতে প্রাণে বেঁচে যাই।’

দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে সেহরির মাইকিং করার সময় একটি ভয়ার্ত অভিজ্ঞতার কথা বার্তা২৪.কমের কাছে বলছিলেন মাইক ব্যবসায়ী আকবর আলী (৫৯)। তার বাড়ি গৌরীপুর পৌর শহরের পূর্ব দাপুনিয়া গ্রামে। বাবা মৃত আব্দুল আজিজ।

বুধবার (১৫ মে) রাত ১টার পর আকবর আলীর দেখা মিলে পৌর শহরের ধানমহাল এলাকায়। সেহরির সময় মাইকিং করতে হবে তাই রিকশা চালকের খোঁজ করছিলেন তিনি। চালকের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বার্তা২৪.কমের সঙ্গে কথা হয় আকবর আলীর।

তিনি বলেন, ‘১৯৭৪ সালে রোজার মাসে কোনো এক রাতে দোকানে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো সেহরির সময় রোজাদারদের ডেকে তুলব। এরপর রিকশায় চড়ে শহরের অলি-গলিতে মাইকিং করে রোজাদারদের ডেকে তুলি। কাজটি প্রশংসিত হওয়ায় এরপর থেকে প্রতি রমজানে স্বেচ্ছাশ্রমে সেহরির সময় মাইকিং করতাম। তবে আশির দশকে তৎকালীন কমিশনার আবু সাইদ ভাই দুই বছরের জন্য পারিশ্রমিক দেন। পরবর্তীতে তৎকালীন পৌর প্রশাসক কামাল উদ্দিনের সময় থেকে নিয়মিত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রতিদিন রাতে সেহরির শুরু থেকে শেষ সময় পর্যন্ত রোজাদারদের ডেকে তোলার জন্য রিকশায় করে মাইকিং করতে বের হন আকবর। শহরের নির্জন অলি-গলির ভেতর দিয়ে ভয়হীন ছুটে চলেন মাইক নিয়ে। ঝড়-বৃষ্টি, শীত-কুয়াশা ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে ৪৫ বছর ধরে তিনি এই কাজ করে যাচ্ছেন।

আশির দশকে প্রথম দিকে সেহরির সময় মাইকিং করার জন্য আকবর পৌর পরিষদ থেকে ৪ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেলেও এখন সেটা সাড়ে ১০ হাজারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে আকবরের দাবি, পারিশ্রমিক হিসাবে নয়, এলাকার মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই এই কাজ করেন তিনি। তবে পৌর পরিষদ তাকে সম্মানী দেয়, তাতে তিনি কৃতজ্ঞ।

জানা গেছে, এক সময় নিঃস্ব থাকলেও মাইকের ব্যবসা করে আকবর জমি-বাড়ি করেছেন। দাম্পত্য জীবনে তার রনি, জনি নামে দুই ছেলে ও জহুরা নামে এক মেয়ে রয়েছে। কয়েক বছর আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

আকবর ছোট-খাটো মাইকিংয়ের জন্য ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা পারিশ্রমিক নেন। এতে প্রতি মাসে তার আয় হয় ৩০ হাজার টাকার মতো। তবে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ধর্মীয় সভায় মাইক ভাড়া কিংবা প্রচারণার জন্য ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা নেন তিনি। তবে দোকানের মালামাল চুরি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাইক ভাঙচুর ও ভাড়া না পাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে।

আকবরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘড়ির কাঁটায় রাত দেড়টা বেজেছে। এমন সময় আগমন ঘটে রিকশা চালকের। এরপর দ্রুত রিকশায় মাইক ও ব্যাটারি বসিয়ে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সিটে বসেন আকবর। নির্জন শহরের পথ ধরে ছুটে চলছে রিকশা। মাইক থেকে আকবরের ভরাট কণ্ঠের আওয়াজ ভেসে আসছে, ‘অত্র এলাকার মুসলমান ভাই ও বোনেরা পবিত্র মাহে রমজানে সেহরি খাওয়ার সময় হয়েছে। উঠুন সেহরি খান, রোজা রাখুন।’ রিকশা ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে তার আওয়াজটাও অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে থাকে।

আপনার মতামত লিখুন :

নবীগঞ্জে ট্রাক চাপায় রিকশা চালক নিহত

নবীগঞ্জে ট্রাক চাপায় রিকশা চালক নিহত
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ট্রাক চাপায় জাহাঙ্গীর মিয়া (১৫) নামে এক কিশোর রিকশা চালক নিহত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) মহাসড়কের আউশকান্দি হীরাগঞ্জ বাজারের কাছে রাত ৮টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে।

নিহত রিকশা চালক আউশকান্দি ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের নুর উদ্দিনের ছেলে।

প্রতক্ষ্যদর্শী সূত্রে জানা যায়, রাত ৮টার দিকে বাড়ি থেকে রিকশা চালিয়ে আউশকান্দি বাজারে আসছিল জাহাঙ্গীর। এ সময় মুনিম ফিলিং স্টেশনের সামনে পৌঁছা মাত্রই সিলেট থেকে ঢাকাগামী দ্রুতগতির একটি ট্রাক জাহাঙ্গীরের রিকশাকে চাপা দেয়। এতে রিকশাটি দুমড়ে মুছড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই সে নিহত হয়।

মহাসড়কের প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল। খবর পেয়ে শেরপুর হাইওয়ে থানা ও নবীগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করলে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়।

শেরপুর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘খবর পেয়ে হাইওয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। বর্তমানে মরদেহ হাইওয়ে থানায় রয়েছে।’

‘নাব্যতা সংকট আর দুর্বল বাঁধের কারণেই বন্যা’

‘নাব্যতা সংকট আর দুর্বল বাঁধের কারণেই বন্যা’
ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

পানি খুব বেশি আসছে না, তারপরও বন্যা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এর কারণ মূলত নদীগুলোর নাব্যতা সংকট ও দুর্বল বাঁধ। এমনটাই মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

তাদের মতে, ১০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে নদী ও হাওরে পানি অনেক কম হয়। কিন্তু এরপরও বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। সহজেই ভেঙে যায় নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। এর একমাত্র কারণ নদীগুলোর নাব্যতা সংকট ও দুর্বল প্রতিরক্ষা বাঁধ। এর থেকে মুক্তি পেতে নদীগুলো খনন ও প্রতিরক্ষা বাঁধ সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সাথে পরিকল্পিতভাবে হাওর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ তাদের।

সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট শিব্বির আহমেদ আরজু বলেন, ‘আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে যে পরিমাণ পানি হতো এখন তার অর্ধেক পানিও হয় না। কিন্তু এরপরও বন্যা দেখা দেয়। এর একমাত্র কারণ হলো নদীর নাব্যতা কমে গেছে। আগে নদীগুলোর যে পরিমাণ পানি ধারণ ক্ষমতা ছিল, এখন এর অর্ধেকও নেই। যার ফলে অল্প পানিতেই নদী তীরবর্তী এলাকায় বন্যা দেখা দেয়।’

Flood

তিনি বলেন, ‘শুধু নদীর নাব্যতা সংকটই নয়, প্রতিটি নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের করুণ অবস্থা। অল্প বৃষ্টিতেই নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। এই দুর্বল বাঁধগুলোকে সংস্কার করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘অল্প পানিতে বন্যার কবল থেকে বাঁচতে নদীগুলো খনন করতে হবে। একই সাথে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ করতে হবে, যা কমপক্ষে ১০০ বছর টেকে। সেইসাথে বাঁধগুলোকে যেন স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষতি না করতে পারে সেদিকে তদারকি থাকতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিবশে আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘হাওর ও হাওরের মানুষ আমাদের অমূল্য সম্পদ। কিন্তু হাওর উন্নয়ন হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে। যার ফলে প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে হাওরের মানুষদের। একই সাথে কমে যাচ্ছে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলজ প্রাণী।’

তিনি বলেন, ‘হাওরের বুক দিয়ে যত্রতত্র রাস্তা করা হয়েছে। ফলে হাওর সম্পূর্ণভাবে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় পানি আন্দোলিত হতে পারছে না। অথচ এখানে রাস্তাগুলো পরিকল্পতিভাবে করা হলে একদিকে যেমন হাওরের সম্পদ রক্ষা পেত, অন্যদিকে দর্শনীয় স্থান হিসেবেও পরিচিত পেত আমাদের হবিগঞ্জ।’

তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করতে হবে, যেন আমাদের প্রাণী ও সম্পদের ক্ষতি না হয়। একই সাথে নদীগুলো খনন করতে হবে। তাহলেই বিভিন্ন প্রাকৃতি দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।’

Flood

দীর্ঘদিন ধরে নদী রক্ষার আন্দোলনের সাথে জড়িত কবি ও সাহিত্যিক তাহমিনা বেগম গিনি। তাঁর মতে- বন্যাসহ সব ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য দায়ী সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তারা। নদীগুলো প্রতিনিয়ত ভরাট হচ্ছে, কিন্তু খনন করা হচ্ছে না। এছাড়া দখল ও দুষণ করে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ। বিভিন্ন স্থানে দখল করা হয়েছে নদী ও প্রতিরক্ষা বাঁধ। এর ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যার দেখা দেয়।

তিনি বলেন, ‘এর থেকে বাঁচতে সাধারণ জনগণকে সচেতন হতে হবে। এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ (পাউবো) সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তাদের নদী বাঁচাতে আরও সচেষ্ট হতে হবে। নদীগুলো খননের পাশাপশি বাঁধগুলো শক্তিশালী করতে হবে।’

জেলা পাউবো’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, ‘ইতোমধ্যে হবিগঞ্জের অনেকগুলো নদী খনন করা হয়েছে। আমাগী বছর আরও নদী খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া নদীর বাঁধগুলো সংস্কারের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের।’

তিনি বলেন, ‘এক হাজার ৮৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ সংস্কারের প্রস্তাবনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ে। আশা করা যাচ্ছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ প্রকল্পটি পাস হবে। আর এই কাজটি হলে আগামী একশ’ বছরের জন্য খোয়াই নদীর বাঁধ নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে হবে না।’

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র