আজ শেরপুরের কাটাখালি যুদ্ধ দিবস

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, শেরপুর
ঐতিহাসিক কাটাখালি সেতু/ ছবি: বার্তা২৪.কম

ঐতিহাসিক কাটাখালি সেতু/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার কাটাখালি যুদ্ধ দিবস আজ (৬ জুলাই)। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধে তিন মুক্তিযোদ্ধাসহ ১২ জন শহীদ হন। শহীদ হন একই পরিবারের তিন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাজমূল আহসান, মোফাজ্জল হোসেন ও আলী হোসেন।

স্বাধীনতা অর্জনের পর শহীদ নাজমুলের নামে ময়মনসিংহ কৃষি বিদ্যালয়ে একটি হল, নালিতাবাড়ীতে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গত বছর শহীদ নাজমুলকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ‘অপারেশন কাটাখালি’ ও রাঙ্গামাটিয়া যুদ্ধের সরকারি স্বীকৃতি মিলেছে।

স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও চেতনা ভাস্বর করে রাখতে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর হলেও পুরোনো সেই সেতুটি সংরক্ষণে ইতোমধ্যে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। সেইসাথে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি কাটাখালি ব্রিজ অঙ্গনে স্বাধীনতা উদ্যান প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই রাতে পরিকল্পনা অনুযায়ী কোম্পানি কমান্ডার নাজমূলের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ডিনামাইট ফিট করে ঝিনাইগাতী-শেরপুর সড়কের কাটাখালি ব্রিজ উড়িয়ে দেন। সফল অপারেশন শেষ করতে ভোর হয়ে যাওয়ায় পাশ্ববর্তী রাঙ্গামাটি গ্রামে আশ্রয় নেন মুক্তিযোদ্ধারা।

দিনের আলো ফুটে উঠায় কোথাও বের হওয়া নিরাপদ মনে না করে পরিশ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। কিন্তু ঐ গ্রামের জালাল মিস্ত্রী পাক বাহিনীর স্থানীয় হেড কোয়ার্টার আহাম্মদনগর ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবরটি পৌঁছে দেন।

সংবাদ পেয়ে পাক হানাদার বাহিনী ৬ জুলাই সকালে রাজাকার, আল-বদরদের সাথে নিয়ে রাঙ্গামাটি গ্রাম তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। কমান্ডার নাজমুল আহসানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি ছুড়ে। শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ।

পাকি বাহিনী অবিরাম গুলি বর্ষণ শুরু করে। ঐ গ্রামের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের যাওয়ার একমাত্র পথ খোলা ছিল রাঙ্গামাটি বিল। সেটিও পানিতে তখন টইটুম্বুর। এমন অবস্থায় ঐ বিলের পানিতে নেমে কভারিং ফায়ার করতে করতে কমান্ডার নাজমুল আহসান মুক্তিযোদ্ধাদের রাঙ্গামাটি বিল সাঁতরিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন।

সবাই চলে যাওয়ার পর হঠাৎ পাক সেনাদের ব্রাশ ফায়ারে কমান্ডার নাজমুলের বুক ঝাঁঝড়া হয়ে যায়। কমান্ডার নাজমুলের লাশ আনতে গিয়ে তার চাচাতো ভাই মোফাজ্জল হোসেন ও আলী হোসেনও শহীদ হন পাকিদের গুলিতে। ঐদিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে রাঙ্গামাটি বিলের পানি রাঙ্গা হয়ে উঠেছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে পাক বাহিনী রাঙ্গামাটি গ্রামে হানা দেয়। খুঁজে খুজেঁ বের করে ৬০ থেকে ৭০ জন গ্রামবাসীকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে ঘটনাস্থলেই ৯ জন শহীদ হন। এদের মধ্যে একজন গুলি খেয়েও মৃতের মতো পড়ে থাকেন। মৃত ভেবে পাক বাহিনী তাকে ফেলে চলে যায়। পায়ে বিদ্ধ গুলি নিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেদিনের বিভীষিকা নিয়ে আজও বেঁচে আছেন রাঙ্গামাটি গ্রামের ইউনুছ আলী।

এছাড়া গ্রামের বেশ কয়েকজন নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায় হানাদার বাহিনী। ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের তিন নারীকে সরকার বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু শহীদ পরিবারগুলোর কোনো স্বীকৃতি মেলেনি। গ্রামবাসীদের প্রত্যাশা, তাদের স্বীকৃতি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন :