বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী সুলতানের ৯৫ তম জন্মদিন

শরিফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম, নড়াইল
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

নড়াইলের বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯৫তম জন্মবার্ষিকী আজ (১০ আগস্ট) শনিবার। ১৯২৪ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

শিল্পী সুলতানের জন্মদিন উপলক্ষে কোরআনখানি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং পুরস্কার বিতরণের আয়োজন
করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা।

বাঙালি জাতিসতত্ত্বার গভীরতম অন্তরভূমিতে যে অমিত শক্তি সুপ্ত ছিল, সহস্র বছর ধরে তারই নান্দনিক শৈল্পিক প্রকাশের অন্যতম সূর্যসারথি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565397011272.jpg
ছবি আঁকছেন বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান

 

তার পিতা মো. মেছের আনে এবং মাতা মোছা. মাজু বিবি। চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে পিতা মাতা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া।

এই গুণী শিল্পী তাঁর ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন ‘পাট কাটা, ধানকাটা, ধান ঝাড়া, জলকে চলা, চর দখল, গ্রামের খাল, মৎস শিকার, গ্রামের দুপুর, নদী পারাপার, ধান মাড়াই, জমি কর্ষণে যাত্রা, মাছ ধরা, নদীর ঘাটে, ধান ভানা, গুন টানা, ফসল কাটার ক্ষনে , শরতের গ্রামীণ জীবন এবং শাপলা তোলার মতো বিখ্যাত সব ছবি।

১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তাঁর ছবি সমকালনী বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি, সালভেদর দালি, পলক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565397105135.jpg
এসএম সুলতানের একটি চিত্রকর্ম

 

লাল মিয়ার শিক্ষাজীবন শুরু হয় ১৯২৮ সালে রুপগঞ্জ আশ্রম স্কুলে ভর্তির মাধ্যমে। ১৯৩৩ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যয়ের পুত্র শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। এ সময় লাল মিয়া তার একটি সুন্দর ছবি আঁকলে তৎকালীন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়সহ সকলে মুগ্ধ হন। শুরু হয় শিল্পী লালের রং তুলি হাতে নতুন জীবন। শিল্পী হওয়ার মনোবাসনায় লাল মিয়া পাড়ি জমান কোলকাতার উদ্দেশে। কোলকাতার কাশিপুরে নড়াইলের জমিদার বাড়িতে থেকে জমিদার পুত্র অরুন রায়ের সহযোগিতায় কোলকাতার আর্ট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন।

পরীক্ষায় প্রথম স্থান লাভ করলেও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি না থাকায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হস্তক্ষেপে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান তিনি। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তার অমায়িক আচরণে মুগ্ধ হয়ে লাল মিয়াকে তার বাসায় থাকার সুযোগ করে দেন। এ সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মাতা তার নাম রাখেন শেখ মো. সুলতান।

১৯৪৩ সালে সুলতান খাকসার আন্দোলন নামে একটি সেবামূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। শিক্ষাজীবন অসমাপ্ত রেখেই ১৯৪৪ সালে তিনি ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। কাশ্মীরের পাহাড়ে কিছুদিন একদল উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস করেন। ১৯৪৬ সালে কাশ্মীর থেকে চলে যান শিমলায়, সেখানে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এই প্রদশর্নী তার শিল্পী জীবনের প্রথম স্বীকৃতি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের লাহোরে ও পরে করাচিতে অবস্থান করেন। এ সময় নাগী, চুগতাই, শাকে আলী, শেখ আহম্মেদসহ অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে।

ইউরোপ ও আমেরিকা জয় করে মহান এই শিল্পী ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে আসেন। কিছুদিন ঢাকা আর্ট কলেজের ছাত্রাবাসে অবস্থান করে ফিরে আসেন মাতৃভূমি নড়াইলে। ১৯৫৫ সালে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার চাচুড়ি পুরুলিয়ায় নন্দন কানন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

এই গুণী শিল্পী ১৯৫৬ সালে পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কয়েকদিন আবস্থান করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত যশোরের নীলগঞ্জ শশ্মানে মাঝে মাঝে ধ্যান করতেন। ১৯৬০ সালে যশোরের চাঁচড়ার জমিদার বাড়িতে কিছুকাল অবস্থান করেন।

১৯৬৫ সালে সবার অগচরে পুনরায় পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন। হারিয়ে যাওয়া লাল মিয়াকে ১৯৬৭ সালে নড়াইলের অদূরে এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়। যশোরের তৎকলীন জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরী তাকে যশোর নিয়ে আসেন। ১৯৬৮ সালে যশোর ও খুলনা ক্লাবে তার একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565397142755.jpg
এসএম সুলতানের একটি চিত্রকর্ম

 

জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধূরীর উদ্যোগে ১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই সুলতানের মাছিমদিয়ার বাড়িতে দি ইনস্টিটিউট অব ফাইন আটর্স উদ্বোধন করেন। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিল্পী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে যুদ্ধের ছবি আঁকেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিল্পী নিজ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সে সময় প্রতিদিন রাতে একটি ঝোলা কাঁধে তিনি কাটিয়েছেন শহরের বিভিন্ন বাড়িতে। এ সময় তার সঙ্গে থাকতো আড়বাঁশি, আর কয়েকটি পোষা বেজী।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সুলতান কাছ থেকে দেখেছেন এদেশের মানুষ, প্রকৃতি, মানুষের জীবনাচার। আর নিজের বোধ ও মেধাকে শানিত করেছেন আবেগ, অনুভূতি ও উপলব্ধির প্রয়াসে। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার একক চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। মূলত- এই প্রদশর্নীর মাধ্যমে এ দেশের সুশীল সমাজের তার নতুনভাবে পরিচয় ঘটে।

কালোত্তীর্ণ এই চিত্রশিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আর্টিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পদক পেয়েছিলেন।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন।

আপনার মতামত লিখুন :