শেষ মুহূর্তের টানাপোড়েন

ছবি: বার্তা২৪

গত ১৯ নভেম্বর এই বিভাগে 'বিএনপির ভারসাম্যের রাজনীতি' এবং পরদিন ২০ নভেম্বর 'ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই; ছোট সে নৌকা...' নামে দুটি কলাম লিখেছিলাম। পত্রিকায় যেমন ধারাবাহিক রিপোর্ট ছাপা হয়, এও তেমনি ধারাবাহিক কলাম। কলাম দুটি ছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন জটিলতা নিয়ে। দুই দলেরই নিজেদের দলের বাইরে জোট, মহাজোট, ফ্রন্টের সাথে আসন বন্টন নিয়ে ঝামেলা ছিল এবং আছে। পত্রিকায় যেমন ফলোআপ রিপোর্ট ছাপা হয়। কলামেরও তেমনি ফলোআপ কলাম। ধারাবাহিক কলামের ফলোআপ আজ।

সপ্তাহখানেক ধরেই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলে আসছেন, দুয়েকদিনের মধ্যে বা শিগগিরই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করা হবে। কিন্তু আমরা জানি দুই দলই শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। চেষ্টা করবে প্রতিপক্ষের তালিকা দেখে নিজেদের তালিকা চূড়ান্ত করার। তবে আওয়ামী লীগ নিজেদের তালিকা চূড়ান্ত করে রেখেছে। শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। তবে কবে যে আনুষ্ঠানিকভাকে ঘোষণা করবে, কে জানে। কারণ প্রাথমিক তালিকাও ঘোষণা করেনি। প্রার্থীদের ডেকে চিঠি ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে গণমাধ্যম কর্মীদের কষ্ট করতে হয়েছে। বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। শোনা যাচ্ছে, চূড়ান্ত মনোনয়নও ঘোষণা না করে রিটার্নিং অফিসারকে জানিয়ে দেয়া হবে। যেখানে একাধিক প্রার্থী, সেখানে একজনকে কনফার্ম করা হবে। অন্যজনকে প্রত্যাহার করতে বলা হবে।

জোটের বিষয়টিও চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের জোট-মহাজোট ভালোই সামলাতে পেরেছে। যতটা আসন ছাড়ার প্রস্তুতি ছিল, তারচেয়ে অনেক কমেই বোঝানো গেছে শরিকদের। ক্ষমতা হারানোর বিপদটাও শরিকদের বোঝাতে পেরেছে। তাই আসন বন্টনের চেয়ে জয়ের সম্ভাব্যতাই গুরুত্ব পেয়েছে। ওবায়দুল কাদের বারবার বলছেন, উইনেবল ক্যান্ডিডেট হতে হবে। ক্ষমতায় আসতে পারলে শরিকদের সন্তুষ্ট করার অনেক উপায় পাওয়া যাবে।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শরিক জাতীয় পার্টি। দলটি ৩০০ আসনের জন্যই মনোনয়ন ফরম বিক্রি করেছে, ২০০ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের পর রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়ে নিজে বাঁচতে চেয়েছেন।

জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছ থেকে ১০০ আসন চেয়েছিল। কমতে কমতে সেটা ৬০ আসনে নেমেছিল। শোনা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টিকে ৩৫টি আসন দেয়া হতে পারে এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তাদের। এরশাদ আসলে অসন্তুষ্ট হওয়ারও সুযোগ পাচ্ছেন না। এরশাদ নিজের দাম বাড়াতে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, এ আশঙ্কায় তাকে বারবার সিএমএইচে ভর্তি হতে হয়েছে। এবারের নির্বাচনটাও মনে হয় এরশাদকে সিএমএচেই কাটাতে হবে।

তবে আমার সবচেয়ে মজা লেগেছে, যুক্তফ্রন্টের প্রাপ্তি দেখে। বিএনপির সাথে জোটের আলোচনায় মাহি বি চৌধুরী মির্জা ফখরুলের কাছে ১৫০ আসন চেয়েছিলেন। সেখানে সুবিধা করতে না পেরে ভিড়েছেন সরকারি দলের সাথে। তাদের ১৫০ আসনের খোয়াব ৩ আসনের কঠোর বাস্তবতায় ল্যান্ড করতে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে পুরোনো জোট ১৪ দল। তারা পাচ্ছে ১২ আসন। গতবারের চেয়ে এবার কমেছে। ১৪ দলের অনেক সিটিং এমপিও বাদ পড়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টি পাচ্ছে ৪টি, জাসদ ইনু ৩টি, জাসদ আম্বিয়া ২টি, জেপি ১টি এবং ত্বরিকত ফেডারেশন ২টি আসন পাচ্ছে। ১৪ দলের শরিকদের আসলে সন্তুষ্ট হওয়া না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ দয়া করে যা দেবে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।

জোট-মহাজোট সামাল দিতে পারলেও আওয়ামী লীগের আসল সমস্যা ঘরে। টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকায় প্রত্যেক আসনে ৫ জন করে মনে মনে এমপি হবার স্বপ্ন দেখা লোক গজিয়েছে। তাদের নিবৃত করতে নানা রকম হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে। মানলাম তাদের অনেকের বিদ্রোহী হওয়ার ইচ্ছা ধমকে দমন করা যাবে। কিন্তু তারা দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন বা অন্তত বিপক্ষে কাজ করবেন না; তার নিশ্চয়তা কি। আওয়ামী লীগের অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী গত কয়েক বছর ধরে এলাকায় নানা কাজ করছিলেন। তারা অনেক কর্মীও তৈরি করেছেন। কিন্তু না পেয়ে সাথে সাথে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। জনসেবামূলক নানা উদ্যোগ থেমে গেছে। তার কর্মীরাও নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। সকল জনসেবা যেন নির্বাচনের জন্য। মনোনয়ন নেই, তাই সেবাও নেই। এমন নেতা বানিয়ে লাভ কি, যারা দলের জন্য কর্মী বানাবেন না, বানাবেন নিজের জন্য। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ঘরের শত্রু সামাল দেয়া।

এই দিক দিয়ে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অনেক সুবিধাজনক স্থানে আছে। তাদেরও কোন্দল আছে, তবে সেটা অনেক কম। আর ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়েছে। তাই তাদের অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ দেখাচ্ছে। ৩০০ আসনে ৮০০ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলেও এটা কোন্দল নয় কৌশল। তবে বিএনপির আসল সমস্যাটা এখনও সমাধান হয়নি। মির্জা ফখরুল দারুণভাবে ভারসাম্যের খেলাটা খেলে যাচ্ছেন। ফিনিশিং পয়েন্টের খুব কাছে পৌছে গেছেন তিনি। এখন কতটা নিখূঁতভাবে শেষ করতে পারবেন ভারসাম্যের খেলাটা, তার ওপরই নির্ভর করছে ফাইনাল খেলার ফল।

বিএনপির সমস্যা এবং সম্ভাবনার নাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্ট সাফল্যের সাথে আইসিইউতে থাকা বিএনপিকে নতুন জীবন দিয়েছে। তাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সামিল করেছে। কিন্তু এখন ঐক্যফ্রন্টকে আসন দিতে গিয়েই বেধেছে গোল। একে তো ঐক্যফ্রন্টকে আসন দিতে গিয়ে বঞ্চিত করতে হয়েছে ২০ দলের পুরোনো অনেক বন্ধুকে। ২০ দলের এলডিপি পাচ্ছে ৫টি, জমিয়তে ওলামায়ে ২টি, কল্যাণ পার্টি ১টি, বিজেপি ১টি, জাগপা ১টি, এনপিপি ১টি। তবু তারা ঘরের মানুষ। তাই তাদেরকে বোঝানো গেছে। মন খারাপ হলেও সামনে সুদিন, এই ভরসায় মেনেও নিয়েছেন তারা।

নিবন্ধনহীন জামাত গত নির্বাচনে ৪০টি আসন পেলেও এবার পাচ্ছে ২৫টি। তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের। কিন্তু জামাতকে ২৫টি আসন দিতে গিয়েই বিপাকে পড়েছে বিএনপি। জামাতকে একাই ২৫টি আসন দিলেও ঐক্যফ্রন্টের সব দলকে মিলে দিতে চাইছে ১৭টি। এর মধ্যে গণফোরাম ৯টি, জেএসডি ৩টি, নাগরিক ঐক্য ২টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ৩টি। অথচ জামাতের সাথে জোটের কারণে অনেক বদনাম সইতে হয়েছে তাদের। ঐক্যফ্রন্ট তাদের সেই কোনঠাসা অবস্থা থেকে টেনে তুলেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঐক্যফ্রন্টের ভাবমূর্তি আছে, ভোট নেই। আর জামাতের ভাবমূর্তি নেই, ভোট আছে। এখন জামাতের সাথে পাল্লা দিয়ে ঐক্যফ্রন্টকে আসন দিতে গেলে তাদের পরাজয়ের আশঙ্কাই বাড়বে শুধু।

ঐক্যফ্রন্টের কারণেই ২০০৮ সালে স্রোতের বিপরীতেও জিতে আসা আশরাফউদ্দিন নিজামকে বাদ দিয়ে আ স ম আব্দুর রবকে দিতে হবে। সুব্রত চৌধুরী বা আব্দুল মালেক রতনকে মনোনয়ন দেয়া মানেই পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যত আসন, তত পরাজয়। আবার তাদের এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন।

এখন চলছে শেষ মুহুর্তের টানাপোড়েন। এবার সত্যি সময় নেই হাতে। শিগগিরই জানা যাবে, দুই জোটের চূড়ান্ত  প্রার্থী তালিকা। তারপর চূড়ান্ত লড়াই।

প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

নির্বাচনের অর্থনীতি

দীর্ঘ বিরতির পর আবার নির্বাচনী আমেজে সরগরম হয়েছে সারাদেশ। কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল বর্জন করায় ভোট...

//election count down //sticky sidebar