Alexa

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

ড. মাহফুজ পারভেজ, ছবি: বার্তা২৪

'সংস্কৃতি’ শব্দটি উচ্চারণমাত্র সচরাচর উঠে আসে উচ্চমার্গীয় সাহিত্য, দর্শন, সঙ্গীত, অভিনয়, নৃত্য ও চারুকলার প্রসঙ্গ। কিন্তু এতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আংশিক পরিচয় মাত্র পাওয়া যায়। এই অস্পষ্টতা ও খণ্ডিত ভাবনা নিয়েই অনেক মানুষ 'সংস্কৃতি'কে বুঝে থাকেন অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো।

একই খণ্ডিত ধারণা লক্ষ্য করা যায় ঐতিহ্য সম্পর্কে। ‘ঐতিহ্য’ এই তৎসম শব্দটি ‘ইতি হ’ থেকে নিষ্পন্ন; ওই ‘ইতি হ’ থেকেই আবার ‘ইতিহাস’ কথাটিরও জন্ম। অতএব ঐতিহ্য প্রত্যয়টিকে ইতিহাসের আলোকে অনুধাবণ করাই কর্তব্য।

মনে রাখতে হবে, ঐতিহ্য এই মুহূর্তের সৃষ্টি নয়, তার শিকড় গভীরে এবং বিস্তার সুদূরপ্রসারী। ঐতিহ্যের ভিত অতীতে প্রোথিত; কিন্তু আগামী প্রজন্মগুলোর কাছে তা গ্রহণযোগ্য হলে তবেই তা ঐতিহ্যের শিরোপা পাওয়ার যোগ্য।

ঐতিহ্যের উন্মেষ ও উত্তরাধিকারের ভিতরে থাকে পরম্পরা ও পরিবর্তনের টানাপড়েন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুসন্ধানে তাই ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং প্রক্রিয়া দুই-ই প্রাসঙ্গিক।

নানা কারণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্বন্ধে গভীর অভিনিবেশ ও অনুসন্ধান পাঠককে সচেতন ও প্রশ্নশীল করে তোলে। কোনও কালানুক্রমিক বয়ান নয়, বরং পাঠক জানতে আগ্রহী অতীত থেকে আজকে পর্যন্ত প্রসারিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরম্পরা সম্পর্কে।

উপমহাদেশ প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী হলেও এখানে দখলদার ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে অধ্যয়নের সূচনা উনিশ শতকে, তার বিকাশ বিংশ শতাব্দীতে। স্বদেশের লুপ্ত গৌরব পুনরুদ্ধারের তাগিদও এই অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যে সব নমুনা সরকারি অগ্রাধিকার পেল, সেগুলি প্রায়শই উচ্চকোটির জীবনাদর্শের সঙ্গে জড়িত এবং মানানসই। তার অন্যতম সেরা উদাহরণ সাহিত্য, ধর্ম, দার্শনিক ধ্যানধারণা এবং ললিতকলা।

নৃতত্ত্ববিদরা যেভাবে সংস্কৃতিকে দেখেন বা বর্তমানে সংস্কৃতি-বিদ্যায় যা চর্চিত হয় তার প্রেক্ষিত অনেক বৃহত্তর; সামাজিক প্রশ্ন, পৃষ্ঠপোষকতার পটভূমি, ক্ষমতার বিন্যাসও সংস্কৃতির আলোচনায় একান্ত জরুরি বিবেচিত হচ্ছে। কারণ সংস্কৃতি বিজড়িত থাকে দৈনন্দিন যাপিত জীবনের ক্ষেত্রেও। অতএব নিতান্ত আটপৌরে চর্চায় আবদ্ধ থেকে সাধারণ মানুষের জীবন বাদ দিয়ে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকে।

ফলে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিষয়ক আলোচনায় অতীত কাঠামোর সমস্যাপটের উন্মোচন শুরু হয়েছে আজকাল। সংস্কৃতিকে দেখা হচ্ছে বহুমাত্রিক বিন্যাসে। প্রতিদিনই সামনে চলে আসছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য পাঠের ভিন্নতর পদ্ধতি ও স্বল্পালোচিত তথ্যসূত্রের নব নব বিশ্লেষণ।

বর্তমানে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উপজীব্য কী তা নতুন করে ভাবা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে, এসব উপজীব্য কীভাবে সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তোলে। কালের ধারণায় সংস্কৃতির রূপান্তরও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাংস্কৃতিক দিক, নারীর মাধ্যমে সংস্কৃতির উন্মোচন, বৈষম্যের সংস্কৃতি, জ্ঞানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইত্যাদি নানা দিক থেকে আলো ফেলা হচ্ছে সংস্কৃতির নানা অভিমুখে।

বাংলা নববর্ষে বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নবায়ন করে। ফিরে দেখে জাতিসত্তার চিরায়ত ধারা। আবাহন করে সেই ধারাস্রোতে।

বাংলাদেশ নামক সবুজ ভূখণ্ডের হাজার বছরের সময়কালে লালিত জীবনাচার, বিশ্বাস, অভিব্যক্তিগুলোর সমন্বয়ে পুষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বৈশাখের প্রথম দিনে বাংলা নববর্ষের সূচনা লগ্নে নতুনভাবে স্পর্শ করে মানুষ। সমগ্র জাতি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকধারায় স্নাত হয়।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের পথচলাকে আরও ঋদ্ধ ও শাণিত করে বৈশাখের এইসব আয়োজন, উৎসব ও আনুষ্ঠানিকতা। শাশ্বত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নদীতে পুঞ্জিভূত আবিলতাকে দূর করে। কুসংস্কৃতি ও অপসংস্কৃতির বেনোজলকে হটিয়ে। বিশ্বায়নের তুমুল পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও আগ্রাসন রূপে যা আরোপিত হতে চায়, সেইসব পঙ্ককেও বিদায় করা হয় সমগ্র জাতির ঐতিহ্য লালিত সাংস্কৃতিক শক্তিতে।

বৈশাখের প্রথম প্রহরে নববর্ষের নবতর আলোকে ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, শ্রেণি, পেশার বিভেদ ঘুচিয়ে অনাদিকালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে মুখরিত হয় বাংলাদেশ, বাঙালি জাতি। সম্মিলিত কণ্ঠে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জয়গান গেয়ে বাঙালি অবগাহন করে জাতিসত্তার সমৃদ্ধ সমুদ্রে।

নতুন কেতন উড়িয়ে জাগে মানুষ, জাগে প্রাণ, জাগে দেশ ও মানবমণ্ডলী। পুরনো জীর্ণতা ছেড়ে আগামী পথে চলার দিশা পায় বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকমালায়।

ড. মাহফুজ পারভেজ: কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম

আপনার মতামত লিখুন :