Alexa

শরবতের চেয়েও মধুর ইদ্রিস আলীর আচরণ

শরবতের চেয়েও মধুর ইদ্রিস আলীর আচরণ

টঙ দোকানে শরবত তৈরিতে ব্যস্ত ইদ্রিস আলী, ছবি: বার্তা২৪.কম

রাজশাহী মহানগরীর গণকপাড়া মোড়ে গেলেই চোখে পড়বে ৭২ বছর বয়সী ইদ্রিস আলীর ছোট্ট টঙ দোকান। যেখানে প্রায় ৩০ বছর ধরে শরবত বিক্রি করছেন তিনি। বেল, কলা, পেঁপে, ইউসুফগুলের ভুষি, টক দইয়ের সঙ্গে হরেক রকম দ্রব্য মিশিয়ে বানানো সেই শরবতের বেশ পরিচিতিও রয়েছে নগরী জুড়ে।

প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত একটানা দোকানে বসে শরবত বিক্রি করেন ইদ্রিস। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তার ভদ্র ও মার্জিত কথাবার্তায় মুগ্ধ হয় ক্রেতারা। ক্রেতারা জানালেন- তীব্র গরমে ইদ্রিস আলীর হাতে বানানো শরবত খেয়ে যেমন শান্তি মেলে, তারচেয়েও বেশি মধুর তার আচরণ।

মঙ্গলবার (১৪ মে) দুপুরে সড়কের পাশে দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট দোকানে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ প্লাস্টিকয়ের কৌটায় সাজানো। ওপরে টিনের ছাউনি। তাতে পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি ‘শিকেয়’ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বেল ও পেঁপে।

শরবতের চেয়েও মধুর ইদ্রিস আলীর আচরণ

সেখানে কথা হয় শরবত বিক্রেতা ইদ্রিস আলীর সঙ্গে। কেমন চলছে বেচাকেনা? প্রশ্নে চোখ তুলে তাকান তিনি। একগাল হাসি দিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমতে ডাল-ভাতের জোগাড় হয়ে যাচ্ছে মামা।’

পরিবারে কে কে আছেন, এমন প্রশ্নে সেই হাসিতে কিছুটা ভাটা পড়ল! জানালেন, শুধু অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়েই নগরীর কাদিরগঞ্জ মহিলা কলেজ এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।

ছেলে-মেয়েরা কী করেন…? হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে ইদ্রিস আলী বলতে থাকেন, ‘ওদের কথা তুল না বাপ। ওদের লেখাপড়া শিখিয়েছি, নিজেদের মতো করে খাচ্ছে।’

জানান, দুই ছেলে ৫/৬ বছর আগে বিয়ে করে পৃথক সংসার করছে। একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। আরেকজনের ভালো ব্যবসা রয়েছে। তারা কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। বছরে ঈদের সময়ে দু-একবার মন চাইলে ঘুরতে আসে, আবার কোনো বছর আসেও না।

ইদ্রিস আলী পরক্ষণে বলতে শুরু করেন, তাদের (সন্তান) টাকায় আমাকে চলতে হবেই বা কেন? আমার কী হাত-পা নেই। আমি কাজ-কর্ম করে খেতে জানি। তারা তাদের মতো ভালো থাকুক। আল্লাহ’র কাছে সেই দোয়া করি।

শরবতের চেয়েও মধুর ইদ্রিস আলীর আচরণ

স্মৃতি রোমন্থন করে শরবত বিক্রেতা ইদ্রিস বলেন, 'ছোট বেলায় বিয়ে করেছিলাম। স্বামী-স্ত্রী দু-জনে মিলে সংসার গড়েছি। ও (স্ত্রী) এখন প্রচণ্ড অসুস্থ। রোজা রাখতেও পারেনি এবার। বাড়িতে চুলাও জ্বলে না। দুপুরে খাবার কিনে বাড়িতে দিয়ে এখানে এসেছি। রাতে আবার হোটেল থেকে খাবার কিনে নিয়ে গিয়ে দু’জনে একসাথে খাব।

ইদ্রিস জানান, তার বাড়ি ফরিদপুর জেলার ভাঙা উপজেলায়। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে রাজশাহীতে চলে আসেন। সেটা প্রায় ৩০ বছর আগের কথা। পরে রাজশাহীতে থেকে গেছেন। প্রথমে ডিমের ব্যবসা করতেন। তবে বেশিদিন সেটা চলেনি। তারপর থেকে শরবতের বিক্রি করে চলছে তার জীবন।

শরবতের চেয়েও মধুর ইদ্রিস আলীর আচরণ

তিনি আরও বলেন, 'কাঠ দিয়ে বানানো টঙ দোকান নিয়ে আমার ব্যবসার যাত্রা শুরু। শুরুতে এক/দুই আনাতে শরবত বেচতাম। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় এখন গ্লাস প্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা বিক্রি করতে হয়। বেল ও পেঁপের শরবত ছাড়াও আমি বিভিন্ন ঔষধি গাছ-গাছড়ার শরবত বানিয়ে বিক্রি করি। ৫০/৬০ জন মানুষ আছেন, যারা নিয়মিত তার কাছ থেকে এসব শরবত খান। এছাড়া পথচারীরাও তার কাছ থেকে শরবত খান।'

বয়স বাড়ছে, কতদিন এভাবে কাজ করতে পারবেন তা নিয়ে একদম চিন্তিত নন ইদ্রিস আলী। সৃষ্টিকর্তার ওপর অগাধ বিশ্বাস রাখা ইদ্রিস মনে করেন, সম্মানের সঙ্গেই তাকে জীবনে শেষ সময় পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবে আল্লাহ। সৃষ্টিকর্তার কাছে তার প্রার্থনা, কারও কাছে হাত পেতে নয়, কাজ করতে করতেই যেন হঠাৎ ওপারে পাড়ি জমাতে পারেন ইদ্রিস আলী।

আপনার মতামত লিখুন :