Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-২

মাওলিননংয়ের পথে....

মাওলিননংয়ের পথে....
মেঘপাহাড়ের ডাক/ ছবি: বার্তা২৪.কম
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তা২৪.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

উমগট বিধৌত ডাউকি সীমান্ত অতিক্রম করতেই ‘খুবলেই’ ‘খুবলেই’ সমস্বরধ্বণি। প্রথমপ্রহর থেকে এতোক্ষণ ভ্রমণঘোরের মধ্যে ছিলাম। সম্বিত ফিরতে বুঝতে পারি পৌঁছে গেছি খাসি গারো জৈন্তাদের মেঘ-পাহাড়ের রাজ্য মেঘালয়। স্বাগত জানাতে তিনঘন্টা ড্রাইভ করে ছুটে এসেছেন খাসি মেজবান স্ট্রেমলেট ডেখার, বাখিয়া মন, ইভানিশা পাথাও। এই ট্রিপের অন্তত তিনদিন থাকবো স্ট্রিমলেটের বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসে, তাঁর সরাসরি আতিথ্যে।

এর আগে সাতসকালে বিমানের ফ্লাইট বিজি জিরো সিক্স ফাইভ আমাদের ঠিকঠাক মতোই নামিয়ে দিয়েছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানবন্দর থেকে আমাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে সিলেটের পাকা ড্রাইভার দীপক দেবনাথ সাতসকালে পৌঁছে দিয়েছে তামাবিল। নানা ঝক্কি করে দু’পারের ইমিগ্রেশন-কাস্টমস অতিক্রম করেই পেয়ে গেছি মেজবান গ্রুপ ডেখার গংকে। খয়েরি রঙের টাটা সুমো ও দক্ষ গারো গাড়ি চালক দামরেন সাংমাকে নিয়ে তারা সময়মতো হাজির। জীবনে প্রথম ভ্রমণযাত্রা শুরু বিমানে, সীমান্ত অতিক্রম হেঁটে, গন্তব্য গাড়িতে। শানে নুযুল হচ্ছে, ভ্রমণ রুট ঢাকা-সিলেট-তামাবিল-ডাউকি-শিলং। মোড অব ট্রান্সপোর্ট উড়োজাহাজ, মাইক্রোবাস, টাটা সুমো।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062721306.jpg

মেঘের বাড়ি মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের পথে আমাদের প্রথম যাওয়ার কথা এশিয়ার সবচে’ পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মাওলিননংয়ে’। ডাউকিতনয়া উমগট পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি পথে যেতে হবে মাউলিননং। যাওয়ার পথে দ্রষ্টব্যটি স্পর্শ করে গেলে ভ্রমণের হাফ পয়সা উসুল। কারণ বাংলাদেশ-ভারতে সোস্যাল মিডিয়াভিত্তিক যতোগুলো ভ্রমণ গ্রুপ আছে ডাউকিতে তাঁদের অন্যতম গন্তব্য এই গ্রাম। গুগলের ভ্রমণ রিভিউয়ে ক্লিক করলেই মাউলিননং আর মাউলিননং। সে মতে, শিলংয়ের পথে এখন ছুটে চলেছি গ্রামটি এক্সপ্লোরে। ভ্রমণসঙ্গীরা রাতের প্রথমপ্রহর থেকে যাত্রার ধকলে এখন অনেকটা ক্লান্ত। পাহাড়ি রাস্তার ঝাঁকুনিতে তাদের চোখ ঘুম ঢুলুঢুলু। গুরুবাক্য শিরোধার্য করে জোর করে হলেও নির্নিমেষ তাকিয়ে আছি। আমার ভ্রমণ ও ভ্রমণগদ্য আইডল সৈয়দ মুজতবা আলী বা হালের বুদ্ধদেব গুহ বলেছেন, ক্যামেরার লেন্সে দুনিয়া না দেখে চোখের ক্যামেরায় দেখতে। চোখের থ্রি পয়েন্ট ফাইভ লেন্সে সব জায়গার ছবি তুলে মস্তিষ্কের ডার্করুমে রেখে দাও। যখন খুশি সেই ছবি ডেভেলপ করে নাও। পাহাড়-মেঘ-ঝর্ণার সৌন্দর্য দু’চোখের ক্যামেরায় ধরে রাখতে আমি আর কবি কামরুল হাসান তাকিয়ে আছি। এটা, ওটা দেখে ওই ওই বলে চেঁচিয়ে উঠছি। হাতের মোবাইল ক্যামেরাও সচল হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

মাউলিননং ভিলেজ এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম হিসাবে তকমা পেয়েছে। এ ধরণের তকমার মাপকাঠি বা তকমাদাতা নিয়ে খুব বেশি জানা না গেলেও গ্রামের এই পরিচিতিতে পর্যটকরা ছুটে আসছে, গ্রামের মানুষও সন্তুষ্টচিত্তে এক অভিনব গ্রাম্যসমাজের আওতায় গ্রাম পরিচালনা করছে, পরিচ্ছন্নতাই যার মূল কথা। নিজস্ব উদ্যোগেই এই গ্রামসমাজের সদস্যরা নিয়মিত গ্রাম পরিস্কার করে আবর্জনা নির্দ্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলে। এ গ্রামে কিছু ঘরবাড়ি, হোমস্টে, রিসোর্ট, কিছু দোকানপাট আছে। প্রতিমুহুর্তে পরিব্রাজক-পর্যটকের স্রোত গ্রাম পর্যটনে আসছে। পর্যটনশিল্প গ্রামবাসীর আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। এর মাঝে গ্রামের জীবনযাত্রা হারিয়ে গিয়ে মাউলিননং হয়ে উঠেছে ব্যবসাবাণিজ্যের কেন্দ্র। গ্রামের আঁকা বাঁকা প্রতিটি রাস্তার পাশে চমৎকার বাহারি ফুলগাছে। বাড়িতে বাড়িতে নানা পসার নিয়ে বসেছে স্থানীয়রা। মাউলিননং এখন গ্রাম কি গ্রাম না, এ নিয়ে ভাবার সময় পরিব্রাজকদের কারও নেই। তারা এই গ্রামটির নানা আঁকাবাঁকা পথে ছবি সেলফি তুলে, বাঁশ দিয়ে বানানো ভিউপয়েন্টে উঠে এবং নানারকম হস্তজাত সামগ্রীতে ব্যাগ পুরে পাহাড়ি দৌড়াচ্ছে আরেক গন্তব্যে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062741768.jpg

ডাউকি থেকে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা মাউলিননংয়ে পৌঁছেছি। মেজবানগণ এখানে যাতায়াতে আগে থেকেই অভ্যস্থ। সৌন্দর্যের আঁধারের মধ্যেই তাঁদের বসবাস, তাই পরিচ্ছন্ন গ্রামে পৌঁছে তাঁদের প্রতিক্রিয়া বোঝা গেল না। ভ্রমণসঙ্গী গৃহবন্ধু জলি, সদ্য কিশোরউত্তীর্ণ তুসু গাড়ি থেকে নেমেই ওয়াও, ওয়াও করতে লাগলো। গ্রামের ভেতরের কোন রেস্টুরেন্টে বসে আমরা চা-কফির বিরতি নিতে চাইলাম। লাস্যময়ী কিশোরী জেস্টারওয়েলের পৈত্রিক রেস্টুরেন্ট বসলাম। রেস্টুরেন্টের নাম কিউ শাপরাঙ। স্থানীয় ভ্রমণসঙ্গী কাম গাইড স্ট্রিমলেট ডেখার জেস্টারওয়েলের কাছে জানেত চাইলেন, এখানে বাইরের খাবার এলাউড কি না। হ্যাঁ সূচক জবাব আসতেই আমাদের অবাক করে দিয়ে তারা তাদের ব্যাকপ্যাক থেকে একের পর এক খাবার বের করতে লাগলেন। দেখলাম,তারা পুরো সকালে নাস্তার জোগারজন্তু করে নিয়ে এসেছেন। স্ট্রিমলেট ওয়ানটাইম প্লেট একেক করে সবার হাতে ধরিয়ে দিয়ে একের পর এক বের করলেন রুটি, আলু ভাজি, ডিম সেদ্ধ ও আচার। কিছুক্ষণের মধ্যে অমৃতসম একপেয়ালা করে চা এনে হাজির করলো কিশোরী জেস্টারওয়েল। আমরা খেয়ে রীতিমতো, পরিতৃপ্ত। কিশোরীর নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ হচ্ছে এই কারণে যে, সে শুধু দর্শনধারীই নয়। গরীবঘরের মেয়ে হয়েও নিজেকে সুশ্রী রাখতে নিজের প্রয়োজনীয় যত্ন যে নেয় তা তার চেহারা দেখে বোঝা যায়। এই পাহাড়ের দেশে সে কোথায় বিউটিশিয়ান পায় তা ভেবে অবাক হতে হয়।

আমরা নাস্তা করে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে চাইলাম। চারদিকে পর্যটকরা হৈ হৈ করছে। গ্রামের পার্কিংয়ে লটে অনেকগুলো দোকানে বসেছে গারো খাসিদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের মেলা। সেই সম্ভার থেকে আগ্রহীরা কিনছে পছন্দের জিনিসপত্র। আমাদের কয়েকজন সেদিকে মনোযোগী। কবি কামরুল হাসান আর আমি মনযোগ দিলাম গ্রামের অন্দর-বাহিরের তত্ত্বানুসন্ধানে। ভ্রমণবিদরাই বলেছেন, ভ্রমণে সব ভ্রামণিকের আগ্রহ এক নয়। আমরা যখন নোটবুকে তথ্য লিখতে ব্যস্ত, আমাদের অন্যসঙ্গীরা তখন ব্যস্ত কেনাকাটায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/09/1560062759057.jpg

মাওলিননং থেকে শিলং যাওয়ার আগে আরও বেশ কয়েকটি পর্যটনস্পট দেখে যাওয়া যায়। অনেকে ট্যাক্সি নিয়ে এগুলো দেখে সন্ধ্যা বা রাতের দিকে শিলংয়ে গিয়ে হোটেলে ওঠে। অনেক ডাউকি হয়ে চেরাপুঞ্জির হোটেল-রিসোর্টকে কেন্দ্র বানিয়ে পরে শিলংয়ে যায়। সরাসরি শিলং পৌঁছালে চেরাপুঞ্জি, ডাউকির স্পটে আসতে উল্টো আসার প্রয়োজন পড়ে। আমরা চেরাপুঞ্জি থাকছি না, আবার ভোররাতে পথে বের হওয়ার ধকলে আগেভাগেই শিলং পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছিলাম। সে পরিকল্পনা কেড়ে নিল মাউলিননংয়ের অদূরেই লিভিং রুট সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত নজরকাড়া জলঝর্ণা। হাজার ফুট ওপর থেকে যে ঝর্ণার অবিরাম কলধ্বণি, কাছেই টানে, দূরে যেতে দেয় না।

আপনার মতামত লিখুন :

নেটফ্লিক্সের আদ্যোপান্ত

নেটফ্লিক্সের আদ্যোপান্ত
সারা বিশ্বে নেটফ্লিক্স এখন পরিচিত নাম

Today we are witnessing the birth of new global internet TV network.
-Reed Hastings
Chairman and CEO, Netflix

বিমানবন্দরে এলিজাবেথ চলে যাচ্ছে হয়তো কোনো কারণে অভিমান করে। চেক পোস্ট পেরিয়ে তার পিছু পিছু ছুটে আসতে দেখা যায় স্টিফেনকে। সে যখন এলিজাবেথের সামনে এসে দাঁড়ায় তখনই এলিজাবেথ অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে চমকে ওঠে, আবার আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে ওঠে—“আমি জানতাম তুমি আসবে।”
তখনই স্টিফেন বলে, “আমি আসছি একটা প্রশ্ন করতে।”
এলিজাবেথ বলে, “তুমি আমাকে যে কোনো প্রশ্ন করতে পারো।”
স্টিফেন বলে, “নেটফ্লিক্সের পাসওয়ার্ড কী বলো।”
২০১৫ সালের দিকে এরকম একটা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে নেটফ্লিক্সের প্রয়োজনীয়তা, ক্রেইজ ও প্রায়োরিটি মুভি লাভারদের কাছে তুলে ধরে হয়—যা ধীরে ধীরে এখন মোটামুটি সবারই বোধগম্য।

নেটফ্লিক্স সম্পর্কে বলার আগে অনলাইন স্ট্রিমিং কী জিনিস সেটা একটু ক্লিয়ার থাকা ভালো। অনলাইন স্ট্রিমিং বলতে মূলত সে সার্ভিসকে বোঝায় যেটা ক্যাবল এবং স্যাটেলাইটের বদলে শুধুমাত্র অনলাইনে দেখার ব্যবস্থা আছে। যেখানে গ্রাহক কিছু অর্থের বিনিময়ে বা অর্থ ছাড়া সার্ভিসটি উপভোগ করতে পারে। পেমেন্টের ধরন একেক দেশে একেক রকমের হয়ে থাকে। অনলাইন স্ট্রিমিংয়ে যত ধরনের এন্টারটেইনমেইন্ট আছে যেমন ফিল্ম, ডকুমেন্টারি, টিভি শো, ওয়েবসিরিজ ইত্যাদি সব দেখতে পারবে গ্রাহক তার ইচ্ছে মতো যে কোনো সময় যে কোনো মুহূর্তে। এই সার্ভিস প্রভাইড করা হয় ক্লাউড বেইজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563180724379.jpg
নেকফ্লিক্সের প্রতিষ্ঠাতা রিড হ্যাসটিংস ◢

 

নেটফ্লিক্সের নাম কিন্তু শুরুতে নেটফ্লিক্স ছিল না। এর নাম ছিল “কিবল”, শুরুতে তারা ডিভিডি ভাড়া দিত। কোম্পানিটি ভিডিও স্ট্রিমিং সার্ভিস শুরু করে নেটফ্লিক্স নাম জনপ্রিয় হয়ে ওঠার পর থেকে।

১৯৯৭ সালের ২৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা শুরু করে নেটফ্লিক্স। ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লোশ গ্যাটস শহরে নেটফ্লিক্সের সদর দপ্তর। তারা তাদের ডিভিডি রেন্টালের কাজ শুরু করে ১৪ এপ্রিল, ১৯৯৮ সালে। মাত্র ৩০ জন কর্মচারী দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে ২০০০ সালের দিকে প্রায় ৩ লাখ গ্রাহক হয়ে যায় নেটফ্লিক্সের। ১০ বছর পরে অর্থাৎ ২০০৭ সাল থেকে নিবন্ধনকৃত গ্রাহকদের জন্য ভিডিও অন ডিম্যান্ড অনলাইন স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে কাজ শুরু করে নেটফ্লিক্স। এই সেবা পাওয়ার জন্য গ্রাহককে নেটফ্লিক্স সাইটে ক্রেডিট কার্ডের তথ্য দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। ওই ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমেই এর সেবার ফি পরিশোধ করতে হয়। নেটফ্লিক্স ছাড়া আর কারো এর থেকে আয় করার কোনো সুযোগ নেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563180921106.jpg
লোশ গ্যাটস শহরে নেটফ্লিক্সের সদর দপ্তর ◢

 

বর্তমানে বাংলাদেশসহ মোট ১৯০টি দেশে জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও স্ট্রিমিং সেবা চালু করেছে নেটফ্লিক্স। এই দেশগুলোতে নিবন্ধিত গ্রাহকেরা যে কোনো স্থান থেকে খুব সহজে টিভি শো, মুভি অথবা সিরিজ উপভোগ করতে পারছেন। মাসিক ৮ থেকে ১২ ডলার সাবস্ক্রিপশন চার্জ হলেও বাংলাদেশে এটি কম জনপ্রিয় নয় বরং বিনোদনের যে বিশাল সাম্রাজ্য আপনার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে সেই তুলনায় অনেকের বিবেচনায় এ খরচ কমই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনুষ্ঠান দেখার মাঝখানে অযথা বিজ্ঞাপন হজম করতে হবে না কাউকে। চীন, উত্তর কোরিয়া, ক্রিমিয়া, সিরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে নেটফ্লিক্সের সেবা নিষিদ্ধ থাকলেও নিষেধাজ্ঞা যে কেউ ভাঙছে না ব্যাপারটা এরকম নয়। এগুলো ডিজিটাল দুনিয়ার দৈনন্দিন ঘটনা।

২০১৬ সালে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেটফ্লিক্স বাংলাদেশসহ আরো বিভিন্ন দেশে তাদের বিজনেস ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশে বিগত দুই বছরের অধিক সময় ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছে নেটফ্লিক্স যার গ্রাহক সংখ্যা ইতোমধ্যে দুই লক্ষাধিক। এই দুই লক্ষ গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ১৮ কোটি টাকা যা এক বছরের হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা, দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং আটকানোর কোনো উপায়ও নেই।

সারা বিশ্বে তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১৫৮ মিলিয়ন। যার মধ্যে ৬১.৯৭ মিলিয়ন গ্রাহকের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রে। ২১টি দেশে অনুষ্ঠান নির্মাণের সাথে জড়িত নেটফ্লিক্স। সারা বিশ্বে নেটফ্লিক্সের গ্রাহকরা প্রতি সেকেন্ডে বিশ্বের ১৫ ভাগ ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নেটফ্লিক্সের জন্য ব্যবহার করে থাকে।

অনেকে মনে করেন নেটফ্লিক্সের প্রযোজিত প্রথম প্রোগ্রাম “হাউজ অব কার্ডস”, আসলে কিন্তু তা নয়, এটি তাদের প্রথম বাণিজ্যিক প্রোগ্রাম হলেও তাদের অরিজিনিয়াল প্রথম প্রোগ্রাম ছিল “এক্সাম্পল শো”। ২০১০ সালে নেটফ্লিক্স “এক্সাম্পল শো” নামে একটা প্রোগ্রাম করে। এটি তাদের প্রথম প্রযোজিত প্রোগ্রাম। এগার মিনিটের এই প্রোগ্রাম ছিল অনেকটা কমেডি ঘরানার।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563181227656.jpg
নেটফ্লিক্স নির্মিত প্রথম বাণিজ্যিক প্রোগ্রাম হাউজ অব কার্ডস ◢

 

নেটফ্লিক্স কিভাবে সিনেমা হল বা টেলিভিশন বিজনেস কেড়ে নিচ্ছে? একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে নেটফ্লিক্স গ্রাহকেরা প্রতি বছরে গড়ে ৮২টি করে ফিচার ফিল্ম দেখতে পান। আর হলিওডের ওয়ারনার ব্রাদারস একই সময়সীমার মধ্যে মুক্তি দিতে পারে মোট ২৩টি সিনেমা। সবচেয়ে ব্যবসাসফল স্টুডিও হিসেবে পরিচিত ডিজনি সিনেমা হলে দেয় আরো কমসংখ্যক সিনেমা, মাত্র ১০টি।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে নেটফ্লিক্সের বিশ্বব্যাপী গ্রাহক বেড়েছে ৭৪ লক্ষ। নতুন গ্রাহকরা এই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে দিচ্ছে ১২ কোটি ডলার। বিখ্যাত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর ভাষ্যমতে, ২০২২ সালের মধ্যে নেটফ্লিক্স অনুষ্ঠান বাবদ খরচ করতে পারে বছরে ২ হাজার ২৫০ কোটি ডলার। তবে দিনে দিনে তাদের প্রোগ্রামের সংখ্যা বেশ বেড়ে যাচ্ছে তাছাড়া বাড়ছে গ্রাহক, তাতে করে চাহিদার ওপর ভিত্তি করে তৈরি করতে হচ্ছে নতুন নতুন সব প্রোগ্রাম।

তবে নেটফ্লিক্সের সুদিনের জোয়ারে দিন দিন ভাটার টানও দেখা দিচ্ছে। কারণ এতদিন ধরে খালি মাঠে গোল দিয়ে আসছিল নেটফ্লিক্স, ছিল না কোনো জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বী। এবার মাঠে আসছে অ্যামাজন, অ্যাপল, ফেসবুক, ইউটিউব, ডিজনিসহ সব বড় বড় রথী-মহারথী ও টেক জায়ান্টরা। এরই মধ্যে নেটফ্লিক্সের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা করার মতো সক্ষমতায় পৌঁছে গিয়েছে অ্যামাজন। অন্তত যেসব জায়গায় নেটফ্লিক্স দেখা যায় সেসব জায়গায় অ্যামাজনও তার উপস্থিতি মোটামুটি নিশ্চিত করছে। অনুষ্ঠান নির্মাণের পেছনে গত বছর ৪০০ কোটি ডলার খরচ করেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। হুট করে প্রতিদ্বন্দ্বী পাওয়ায় কিছুটা বিপাকে পড়ে যায় নেটফ্লিক্স। যেসব সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্সের জন্য ভিডিও নির্মাণ করত, তারাই এখন প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে দেখা দিয়েছে। হলিউডের কিছু স্টুডিও গ্রুপ নেটফ্লিক্স থেকে তাদের সিরিজ বা সিনেমা সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। এরা যদি আরো আক্রমণাত্মক আচরণ করে তবে তা সামাল দেওয়া নেটফ্লিক্সের জন্য কঠিন হয়ে যেতে পারে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563181776622.png
নেটফ্লিক্সের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো সক্ষমতায় পৌঁছে গিয়েছে অ্যামাজন ◢

 

স্বাভাবিকভাবেই এই বাজার-প্রতিযোগিতায় খুশি অনুষ্ঠান নির্মাতারা কারণ আগে যেখানে একটি মাত্র প্ল্যাটফর্ম ছিল এখন সেখানে দর কষাকষির সুযোগ রয়েছে। নেটফ্লিক্সের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দাঁড়িয়েছে অ্যামাজন কারণ এই প্রতিষ্ঠানের বাজার মূল্য নেটফ্লিক্সের তুলনায় ৬ গুণ বেশি। ধারণা করা হচ্ছে ২০১৯ সালের মধ্যেই বাজারে নামবে টেক জায়ান্ট অ্যাপল, যা চলতি প্রতিযোগিতায় যোগ করবে অন্য মাত্রা।

এমন অবস্থায় মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতে গ্রাহকদের ধরে রাখতে চাইছে নেটফ্লিক্স। একই সঙ্গে নতুন নতুন গ্রাহক টেনে আনতে এসব পুরস্কারকে ব্যবহার করতে চাইছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৮ সালে কান উৎসবে নেটফ্লিক্সের ফিল্ম নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়। কান কর্তৃপক্ষ মনে করছে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি ছাড়া কোনো সিনেমা তারা গ্রহণ করবে না। ফলে ওই উৎসবে নেটফ্লিক্সের কোনো সিনেমা কানে যেতে পারেনি। অথচ বড় বড় পরিচালকেরা এখন নেটফ্লিক্সের অর্থায়নে ফিল্ম বানাচ্ছে। পরবর্তীতে কান কর্তৃপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। ফলে আলফানসো কোয়ারনের মতো ডিরেক্টদের নেটফ্লিক্সের মুক্তি দেওয়া সিনেমা “রোমা” কানে পুরস্কৃত হয় এবং অস্কারও পায়। শুধু তাই নয় মার্টিন স্করসিসের মতো ডিরেক্টররা পর্যন্ত এখন নেটফ্লিক্সে তাদের সিনেমা মুক্তি দিচ্ছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563182075208.jpg
নেটফ্লিক্সের মুক্তি দেওয়া সিনেমা “রোমা” কানে পুরস্কৃত হয় এবং অস্কারও পায় ◢

 

২০১৭ সালের এপ্রিলে নেটফ্লিক্স মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর “পিঁপড়াবিদ্যা” ও “টেলিভিশন” সিনেমা দুটি কিনে নেয়। ২০১৭ সালের ১৫ মে সিনেমা দুটি প্রকাশ করে নেটফ্লিক্স। সিনেমা দুটি কিনে নেওয়ার সময় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার মতামত দেন এইভাবে—“শুধু প্রদর্শনই নয়, চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করছে নেটফ্লিক্স। দুনিয়াজোড়া এন্টারটেইনমেন্ট ওয়ার্ল্ডের মোঘল হয়ে উঠছে তারা। তাদের সর্বশেষ বিগ বাজেট প্রোডাকশন হচ্ছে মার্টিন স্করসেসি’র পরবর্তী ছবি এবং এবারের কান উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত বং জুন হো’র ‘ওকজা’! তো এই নেটফ্লিক্স ভারতের ছবি কিনছে বেশ কিছুদিন ধরে। ভারতে প্রযোজনাও করছে। আমি ভাবতাম, তারা বাংলাদেশের কনটেন্ট নেবে কবে। অবশেষে বলতে পারছি, নেটফ্লিক্স বাংলাদেশের দুইটা ছবি নিয়েছে। ছবি দুটি এই অধমের বানানো ‘টেলিভিশন’ এবং ‘পিঁপড়াবিদ্যা’।”

এই বছর নেটফ্লিক্স কিনে নেয় নূর ইমরান মিঠুর “কমলার রকেট”।

একটা মজার ঘটনা দিয়ে শেষ করতে পারি। ডিভিডি ও ভিডিও রেন্টাল সার্ভিস ব্লকবাস্টারকে ৫০ মিলিয়ন ডলারে নেটফ্লিক্স কিনে নেওয়ার অনুরোধ করেছিল কো-ফাউন্ডার রিড হ্যাসটিংস। কিন্তু ব্লকবাস্টারের কাছে এটাকে তেমন সম্ভাবনাময় মনে হয়নি। তখন আসলে সম্ভাবনাময় মনে না হওয়ারই কথা কিন্তু পরবর্তীতে এই নেটফ্লিক্স যখন ব্লকবাস্টার থেকে অনেকগুণ এগিয়ে আছে তখন ব্লকবাস্টার অনেকটাই ডুবন্ত অবস্থায়।

অক্ষয়কুমার দত্ত : বাংলায় নবজাগরণের আরেক দিকপাল

অক্ষয়কুমার দত্ত : বাংলায় নবজাগরণের আরেক দিকপাল
অক্ষয়কুমার দত্ত, ছবি. উইকিপিডিয়া

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সমাজ সংস্কারের জন্য কৃতী মনীষীদের আবির্ভাবকে বাংলার নবজাগরণ বলা হয়। রাজা রামমোহন রায়ের সময় থেকে এই নবজাগরণ শুরু হয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল পর্যন্ত এর সময়সীমা ধরা হয়। বাঙালির মধ্যযুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ের অবসান ঘটিয়ে আধুনিক যুগে পদার্পণ হয় নবজাগরণের ফলে। তখনকার কৃতী মনীষীদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন অন্যতম। ১৫ জুলাই ১৮২০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন, অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায়। তিনি বাঙালি লেখক, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনুবাদক হিসেবেও ছিলেন দক্ষ।

সংবাদপত্রে লেখালেখি দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার অন্যতম সভ্য মনোনীত হন ১৮৩৯ সালে। ১৮৪২ সালে বিদ্যাদর্শন নামে একটি মাসিক পত্রিকা চালু করেন নিজস্ব উদ্যোগে। এই পত্রিকা তিনি বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। ১৮৪৩ সালে তিনি ব্রাহ্মসমাজ ও তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপত্র তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদকের পদে মনোনীত হন। এখানে তার প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো। জমিদারি প্রথা, নীলচাষ ও তৎকালীন সমস্যা সম্পর্কে এই পত্রিকায় তিনি মতামত প্রকাশ করতেন। এই প্রবন্ধগুলিই পরে বই হিসেবে বের করতেন।

বিজ্ঞান আলোচনার ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল। তাকে ভারতে বিজ্ঞান আলোচনার পথিকৃৎ বিবেচনা করা হয়।

বাংলা, সংস্কৃত, ফারসিসহ বিভিন্ন ভাষায় তিনি দক্ষ ছিলেন। বাবার মৃত্যুতে স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাকে। বাড়িতে পড়াশোনা করে তিনি গণিত, ভূগোল, পদার্থবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা প্রভৃতি সম্পর্কে বেশ ভালো জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।

অক্ষয়কুমারের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার অনুপ্রেরণাতেই মূলত তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। এ ধর্মে দীক্ষিত হিন্দু হলেও তারমধ্যে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান ও শিল্পকলার প্রাধান্য মেনে নেওয়ার মানসিকতা ছিল। তিনি হিন্দুদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ বেদ-এ বর্ণিত আত্মা এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সম্পর্কে বহু ব্রাহ্ম ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

ফরাসি দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরে একাত্মবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েন। বারবার তিনি নিজের মতামত ও অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। হিন্দু আচার-অনুষ্ঠান পালনেও অনাগ্রহী ছিলেন তিনি। ঊনিশ শতকে বাঙালি পণ্ডিত সমাজের অনিশ্চয়তা তার জীবন যাপন দেখলে কিছুটা বোঝা যায়। তবু, বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশে, উত্তরণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে গেছেন নবজাগরণের মাধ্যমে। তখনকার দিনে ইংরেজি ভাবধারাপুষ্ট বাঙালি যুবকদের ইয়াং বেঙ্গল বলা হতো। তিনি এ গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র