Barta24

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

English Version

মেঘপাহাড়ের ডাক-৯

কোহ রামহাহ ও কিনরেম ফলস

কোহ রামহাহ ও কিনরেম ফলস
ছবি: বার্তা২৪
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর


  • Font increase
  • Font Decrease

চেরাপুঞ্জিতে গাড়ি থেকে প্রথম যে জায়গাটিতে নামলাম, তাকে অফবিট স্পট বললেই বেশি মানায়। এর নাম কোহরামহাহ বা মোট্রপ। কোহ রামহাহ আসলে দুইশ ফুট উচ্চতার এক দানবীয় গোলা আকৃতির পাথর। ওপরের শীর্ষটা গম্বুজের মতো। তলদেশ থেকে দুইশ ফুট উঁচু গোলাকার পাথর। পাহাড়ের ঢালে এমন একটি জায়গায় তা প্রাকৃতিকভাবে স্থাপিত হয়ে আছে, যার পাশে একই আকৃতির আরও দুটি ছোট পাথর, মধ্য দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ঝর্ণার কলধ্বণি। জঙ্গলময় পাহাড়ি গিরি থেকে অবিরাম নেমে আসছে এই পানি। কোহ রাহমাহ বা পিলার রকের পাশ গড়িয়ে পড়ছে কয়েকহাজার ফুট নিচে। নিচে ঘনজঙ্গলময় দূর্গম প্রাকৃতিক নৈসর্গ। অদূরে চোখের সামনে বাংলাদেশের সমতলে বয়ে যাওয়া নদী।

আমাদের হোস্ট-কাম গাইডগণ বলছেন, ‘বাংলাদেশে এই উচ্চতার সমান্তরালে মেঘ জমে থাকে। এখানে বাংলাদেশ দেখার জন্য যারা আসেন, মেঘ থাকলে তারা পরিষ্কার দেখতে পান না। তোমাদের ভাগ্য ভাল, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ওপর মেঘ নেই।‘ গাড়ি চালক, এককাঠি সরেষ। আগ বাড়িয়ে বলল, ‘ওই যে বাঁয়ের দিকে একটু দূরে তাকান, সাদা সাদা বিল্ডিং, ওইটাই সিলেট।‘ দেখলাম সত্যিই তো সিলেট দিব্যি দেখা যাচ্ছে অদূরে। আর আমাদের নিচে জঙ্গলের ভিতর থেকে বাংলাদেশমুখো স্রোতস্বিনী ছুটে চলেছে সমতল বাংলাদেশের দিকে, তা জাদুকাটা নদী হয়ে ছাতক, কোম্পানিগঞ্জের ভূগোল মাড়িয়ে পৌঁছেছে সুরমায়।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864337506.jpg

কোহ রামহাহ’র ঝর্ণার ওপর তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট কংক্রিটের কালভার্ট। তা সংযুক্ত করেছে একবিঘার মতো আয়তনের একটি উঁচু টিলাকে। এর চারপাশে নিরাপত্তা বেষ্টনি। এটা ভিউপয়েন্ট। ভিউপয়েন্ট বা প্রেক্ষণবিন্দু হলেও তা কেবল বাংলাদেশের সমতল,পাশ থেকে কোহ রামহাহ রক দেখা আর জঙ্গলময় প্রকৃতি ছুঁয়ে সমতল থেকে উড়ে আসা মেঘলা বাতাস উপভোগ। আরও বাড়িয়ে বলতে গেলে ঝর্ণার উৎসের কলধ্বণি শুনে মাতোয়ারা হওয়া। নিচে গড়িয়ে যাওয়া অবিরাম জলধারার উৎসের ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে যে নয়নাভিরাম জলপ্রপাত, তা দেখতে হলে যেতে হবে অন্য ভিউ পয়েন্টে। মানুষের দেখার চোখটি এরকমই। একেকজন যেমন একেকভাবে কোনকিছু দেখে। তেমনি একেক জায়গা থেকে কোন দৃশ্য একেকভাবে দেখা যায়। আমরা কোহ রামহাহ পাথর আর বাংলাদেশ ভিউপয়েন্ট দেখতে এসেছি, জলপ্রপাত নয়। যাহোক আমাদের পর্যটক দল ছোট্ট কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে নানাভঙ্গিতে ছবি তোলে। ব্রিজের নিচ দিয়ে ছুটে চলা ঝর্ণার পানিকে যতোটা ক্যামেরার ভিউয়ের ভেতর আনা যায় তার কসরত করতে থাকে।  নানা স্পটে দাঁড়িয়ে নানা ভঙ্গিতে ছবি তোলে।  

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864406471.jpg

আমি আর ভ্রমণসঙ্গী কামরুল হাসান কবিতা লিখি। প্রকৃতির অপত্যস্নেহের মধ্যে নেমে আমরা কোথাও হারিয়ে গেছি। ছবি তোলার হৈচৈ ছেড়ে আমরা দু’জন দুদিকে মগ্ন। আমি পানির কলতান শুনে টিলার বেষ্টনি পেরিয়ে আরেকটু ঢালুতে নেমে যাই। আবিস্কার করি টিলার নিচে ও আশপাশের খাদ দিয়ে অন্তহীন পানি নেমে যাওয়ার কলকল শব্দ। এটি কোহ রাহমাহ’র কাছ দিয়ে নামা ঝর্ণার চেয়ে আলাদা। এই পানিও কোন স্পটে গিয়ে হয়তো তৈরি করেছে চমৎকার জলপ্রপাত। খ্যাত জলপ্রপাত এর উৎসে অনতিক্রম্য গিরিখাদের ভেতর দিয়ে নেমে আসে যেসব নাম না জানা জলধারা, তার প্রত্যেকটিকে তো আর আলাদা নামে ডাকা যায় না ! আসলে প্রকৃতি অন্তহীন, অধরা, অবারিত। চলছে নিজস্ব ধারায়। নামের ছকে বেঁধে মানুষকে একে করে তুলেছে বাণিজ্যিক।

কোহ রামহাহ ভিউপয়েন্টে বাংলাদেশ দেখতে দেখতে এই প্রাচীন দানবীয়  পাথরটি সম্পর্কে খাসিদের প্রচলিত বিশ্বাস সম্পর্কে বলতে থাকেন আমাদের হোস্ট স্ট্রিমলেট ডেখার। তিনি শিক্ষিত গুণী মানুষ। খাসিদের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান টনটনে। বলেন, ‘এই পাথর ছিল এক লোভী শয়তানের মালিকানাধীন। অতি লোভে সে মানুষের সমস্যা তৈরি করতো। তার থেকে মুক্তির জন্য লোকজন তাকে আয়রন ও ধারালো নখ মিশ্রিত খাবার খেতে দেয়। এই খাবার খাওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। তার ফেলে যাওয়া ঝুড়িটি পরে এই  মহাপাথরের আকৃতি ধারণ করে’। গাড়ির কাছে উঠে আসার সময়ও দেখি, ডেখারের বলা ইতিহাসটি সাক্ষ্য দিচ্ছে  রাস্তার ওপর টানানো একটি সাইনবোর্ডেও।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/18/1560864429525.jpg

জায়ান্ট রকে আমরা কোন পূজার  সামগ্রী দেখলাম না। পাহাড়ের ঢালু, দূর্গম রাস্তা পেরিয়ে এখানে খুব কম পর্যটক আসে। নৈসর্গিক শোভাময় জায়গাটি পর্যন্ত রাস্তা, নিরাপত্তা বেষ্টনি, ঝর্ণার ওপর ছোট কালভার্ট বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রের মধ্যেই সীমিত রেখেছে খ্রীষ্ট ধর্ম অনুসারী খাসিরা। তা দেখতে দেখে ভ্রমণতৃষ্ণা মেটানোর  ক্ষেত্রে ধর্মের ভেদাভেদ নেই।

কোহ রামহাহ পাহাড়-জঙ্গলের যে লোকেশনে, এর খুব কাছেই ভারতের সপ্তম বৃহত্তম জলপ্রপাত কিনরেম। পাহাড়ের ওপর থেকে একহাজার এক ফুট উচ্চতা ধারণ করে জলপ্রপাতটি ঘনঅরণ্যে  হারিয়ে যাচ্ছে।  ঢেউ খেলানো পাথুরে পাহাড়গাত্রে এটি তিনটি স্তুর তৈরি করেছে। ফলে এর সৌন্দর্য প্রলম্বিত। প্রথম স্তর থেকে চোখ সরিয়ে দ্বিতীয়টিতে সবশেষে এর তৃতীয় স্তরটির ঝলধারা গভীর অরণ্যে গিয়ে পড়ছে দেখা যায়। সোহরা-শেলা সড়ক আরও নিচে নেমে আবার ওপরে উঠে এঁকেবেঁকে এই জলপ্রপাতের তৃতীয় স্তরের ওপর দিয়ে চলে গেছে। প্রপাতের জলধারাকে অবাধ করতে রাস্তার ওপর বানানো হয়েছে সেতু। দূর্গম সড়কটি চলে গেছে বাংলাদেশের হালুয়াঘাট সীমান্ত পর্যন্ত। সারাক্ষণই এর ওপর দিয়ে গাড়ি, ট্রাক চলাচল করে। যাওয়ার আসার পথে সেতুর ওপর গাড়ি থামিয়ে বা গতি কমিয়ে যাত্রী ও চালকরা জলঝর্ণাটিকে একনজর দেখে নেয়। ব্রিজের সঙ্গে নিচে নামার সিঁড়ি ।  বড় বড় পাথরের মধ্যে এসে পড়ছে কিনরেমের পানি ফেনিলশুভ্র পানি। যারা এই স্পট ধেকে কিনরেম উপভোগ করতে চান, তারা পানিও ছুঁয়ে দেখতে পারেন। তবে এখান থেকে শেষের স্তরটিই কেবল দৃষ্টিগোচর হয়।

মনে পড়ে, ইউরোপের বৃহত্তম জলপ্রপাত সুইজারল্যান্ডের সাফাউজেনে অবস্থিত রাইনফলের কথা। রাইনফল সংলগ্ন রাজপ্রাসাদের নাম স্কলসি লাউফেন ক্যাসেল। এই নামেই ছোট্ট স্টেশনও। দ্রুতগামী ট্রেন রাইনফল দর্শনাকাঙ্খী যাত্রীদের জন্য একমিনিটের বিরতি দেয় স্কলসি লাউফেনে। প্রাসাদের নিচ দিয়ে নির্মিত সুরঙ্গপথ পার হয়ে ট্রেন রাইন নদীর সেতু অতিক্রম করে যায়। রাইন নদীর পানি পাহাড়ে বাঁক নিয়ে আকস্মিক তৈরি করেছে জলপ্রপাত। নদী অতিক্রম করে ট্রেন মূহুর্তে গিয়ে থামে নৈহাউজেন স্টেশনে। সেতু পার হওয়ার সময় জলপ্রপাতের কলধ্বণি আর ফেনায়িত শুক্র জলরাশি দেখে যাত্রীরা ঘোরের মধ্যে পড়ে। রাইনফল অবশ্য চেরাপুঞ্জির মতো প্রাকৃতিক না। একে কেন্দ্র করে খানাপিনা, রাফটিং, পাটাতনে দাঁড়িয়ে উৎক্ষিপ্ত ফেনিল শুভ্র পানি ছোঁয়া, ছবি তোলার মতো বাণিজ্যিক প্যাকেজের মধ্যে আটকে দেয়া হয়েছে।

আমরা কিনরেম দর্শনে গেল পাশ্ববর্তী থাংখারাং পার্কে। আধ কিলোমিটারের মতো সমতল রাস্তা দিয়ে পাহাড়ের দিকে গেলেই থাংখারাং। বড়সড়ো চত্ত্বরের পাশে গুটিকয়েক হস্তশিল্পের দোকান। পার্কের প্রবেশপথে টিকেট কাউন্টার। দশ টাকা করে এন্ট্রি ফি, ক্যামেরার জন্য বাড়তি টাকা। পাঁচ হেক্টরের বেশি আয়তনের থাংখারাং পার্কের শেষ মাথায় লুকআউট ডেক। বলতে পারি দৃশ্য পাটাতন। এর বেষ্টনিগুলো বাংলাদেশের পতাকা লাল-সবুজ রঙে রঞ্জিত। কিনরেম ফলসকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে যারা ছবি-সেলফি তুলতে চায়, তাদের জন্য জায়গাটি আদর্শ। এখান থেকে বাংলাদেশও দেখা যায়। আমাদের সঙ্গী কন্যা, জায়া, জননীদের আর পায় কে! তাঁরা ছবি সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমরাও তাই।

পার্কে ঢোকার মুখে জলিকে একটি ক্যাপ কিনে দিয়েছিল খাসি হোস্ট বাখিয়া মুন। ইতোমধে তাঁর সঙ্গে বেশি ভাব হয়েছে জলির। ক্যাপের রঙ তাঁর পছন্দ না হলেও দোকানেও ভিন্নরঙা ক্যাপ ছিল না।  প্রসঙ্গ উঠতেই স্ট্রিমলেট ডেখার নিজের মাথার হলুদাভ ক্যাপটি খুলে জলির মাথায় পরিয়ে দিলো। জলি মহাখুশি।

আপনার মতামত লিখুন :

নেলসন ম্যান্ডেলা : সংগ্রামই যার জীবন

নেলসন ম্যান্ডেলা : সংগ্রামই যার জীবন
নেলসন ম্যান্ডেলা

সংগ্রামী জীবন বলে যদি কোনো জীবনকে আখ্যায়িত করা যায় তবে সেখানে একজন ব্যক্তি অনায়াসেই জায়গা করে নেবেন। তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা। যিনি নিজের জীবনের ২৭টি বসন্ত কাটিয়ে দিয়েছেন চার দেওয়ালের ভেতর। অপরাধ ছিল একটাই, মানুষের ন্যায্য অধিকার নিয়ে কথা বলা। আর এই অপরাধের কারণেই তাকে বরণ করে নিতে হয়েছিল এক বন্দী জীবন। তিনি চাইলেই অবশ্য এরচেয়ে ভালো জীবন বেছে নিতে পারতেন। আপোস করে, একটু অন্যায়ের কাছে অনুগত হলে তাকে এমন জীবন কাটাতে হতো না। কিন্তু যার শরীরে ছিল ঐতিহ্যবাহী থেম্বু রাজবংশের রক্ত, সে মানুষ কেমন করে এমন সাধারণ জীবন যাপন করবেন।

দক্ষিণ আফ্রিকায় ম্যান্ডেলা পরিচিত মাদিবা নামে। সেখানকার মানুষেরা তাকে আদর করে, সম্মান করে মাদিবা বলে ডাকে। মাদিবা শব্দের বাংলা হলো জাতির জনক। শুনলে হয়তো অবাক হবেন, ম্যান্ডেলার হাতের ছাপ অবিকল আফ্রিকান মহাদেশের আকৃতির মতো! হ্যাঁ এটা একেবারে সত্যি ঘটনা কিন্তু! সুতরাং চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় এ লোকের জন্মই হয়েছিল মাদিবা হওয়ার জন্য, জাতির জনক হওয়ার জন্য।

একজন সাধারণ ম্যান্ডেলা থেকে মাদিবা হয়ে যাওয়ার এই পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। এর জন্য তাকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ পথ। যেই পথের প্রতিটা বাঁকে বাঁকেই ছিল কাঁটা বিছানো। এই পথ চলতে গিয়ে কোনো কাঁটা বিঁধেছে পায়ে, কোনোটা হাতে, আবার কোনোটা একদম হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে। কিন্তু নেতৃত্বের গুণাবলি যার রক্তে, সংগ্রাম করে নিজের জাতিকে রক্ষার ইতিহাস যার বংশে, সেই মানুষকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধা দেবে, এমন কাঁটা তখনও সৃষ্টি হয়নি। মেন্ডেলা তাই এসব কাঁটা একে একে সরিয়ে, ক্ষত বিক্ষত শরীর নিয়ে অনেক উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে পিছিয়ে পড়া একটা জাতিকে নিয়ে আসেন আলোর মশালের তলে।

জন্মগতভাবে কালো হওয়ার কারণে যাদেরকে সহ্য করতে হতো সীমাহীন অত্যাচার, মানুষ হয়েও যাদের কাটাতে হতো পশুর চেয়েও হীন জীবন, তাদের জন্য বিলিয়ে দিলিয়েছিলেন নিজের টগবগে যৌবন। এই ম্যান্ডেলাকে আদর করে, ভালোবেসে মাদিবা ডাকবে না তো কাকে ডাকবে বলুন?

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ প্রদেশের একটি সম্ভ্রান্ত গোত্র প্রধানের পরিবারে তার জন্ম। মা তার ডাক নাম রেখেছিলেন রোলিহলাহা, যার অর্থ যে ডাল ভেঙে ফেলে, অর্থাৎ দুষ্টু। এই দুষ্টু ছেলে বড় হয়ে একদিন একটা সমাজকে ভেঙে দেবে, তা হয়তো তার মাও ভাবেননি। বলতে গেলে সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্ম হয় তার। কিন্তু যার কপালে লেপা আছে সংগ্রামের তিলক, তার মুখে সোনার চামচ কি মানায়?

মাত্র নয় বছর বয়সে বাবা হারান ম্যান্ডেলা। নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করতে হয় তৎকালীন ঔপনিবেশিক সরকারের চক্ষুশূল হওয়ার কারণে। শুরু হয় সংগ্রামের জীবন। কিন্তু সেই জীবনকেও ম্যান্ডেলা জয় করতে থাকেন সাহস এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে। স্কুলে তাই এক শিক্ষিকা তার নামের আগে জুড়ে দেন নেলসন শব্দটি। সেই থেকে রোলিহলাহলা ডালিভুঙ্গা ম্যান্ডেলা হয়ে ওঠেন নেলসন ম্যান্ডেলা।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563465245164.jpg
তরুণ ম্যান্ডেলা ◢

 

পড়াশোনায় তুমুল মেধাবী ম্যান্ডেলা সারা বিশ্বের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আজন্ম প্রতিবাদী ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে আজকে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার সেই প্রতিবাদী স্বভাবের শুরুটা শেশব কৈশোর থেকেই। ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সংগ্রামী জীবনের সঙ্গী টাম্বোর সাথে পরিচয় ঘটে তার। যার সাথে ম্যান্ডেলা সারা জীবন খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীনই ম্যান্ডেলা জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। প্রথম বর্ষেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্র সংসদের ডাকা আন্দোলনে অংশ নেন। ফলস্বরূপ বেরিয়ে যেতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সেখান থেকে চলে যান জোহানসবার্গ। একটি খনিতে প্রহরীর কাজ নেন। পরবর্তীতে একটি আইনি সেবাদান প্রতিষ্ঠানের কেরানি হিসেবে চাকরি শুরু করেন। এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার সময়েই তিনি তার স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এখানে তার সাথে পরিচয় হয় জো স্লাভো, হ্যারি শোয়ার্জ এবং রুথ ফাস্টের। পরবর্তী সময়ে এদেরকে নিয়েই তিনি তার বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563465592154.jpg
যুবক বয়সে ম্যান্ডেলা ◢

 

আন্দোলনের শুরুতে ভারতের মহাত্মা গান্ধির 'অহিংস' মতকে গ্রহণ করেছিলেন ম্যান্ডেলা এবং তার সহযোগীরা। তাই তারা কাউকেই আঘাতের পক্ষপাতি ছিলেন না। এরই মাঝে ১৯৪৮ সালে ক্ষমতায় আসে আফ্রিকানদের দল ন্যাশনাল পার্টি। এই দলটি বর্ণবাদে বিশ্বাসী ছিল। আর ম্যান্ডেলাও একই সময়ে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন এগিয়ে যায়। সংলাপ, শান্তি আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে জনমত তৈরির কাজ চলে। ১৯৫২ সালে তিনি অসহযোগ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু সেই শান্তি বেশি দিন স্থায়ী হয় না। বর্ণবাদী সরকার তাদের প্রতি মারমুখী আচরণ শুরু করে। বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ সরকার ১৯৫৬ সালের ৫ ডিসেম্বর ম্যান্ডেলাসহ ১৫০ জন বর্ণবাদবিরোধী নেতাকে দেশদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু পরবর্তীতে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান।

মুক্তি পাবার পর আন্দোলন আরো বেগবান হয়। মানুষ তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হতে শুরু করে। ১৯৬০ সালে শার্পভিলে কৃষ্ণাঙ্গ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ গুলি ছুড়তে থাকে। ৬৯ জন নিহত হলে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। শান্তিপূর্ণ অহিংস আন্দোলন রূপ নেয় সহিংস আন্দোলনে।

এসময় এক বক্তৃতায় নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, সরকার যখন নিরস্ত্র এবং প্রতিরোধবিহীন মানুষের ওপর পাশবিক আক্রমণ চালাচ্ছে, তখন সরকারের সঙ্গে শান্তি এবং আলোচনার কথা বলা নিস্ফল। ফলস্বরূপ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তারা অহিংস আন্দোলনের পথ থেকে সরে এসে ‘যেমন কুকুর তেমন মুগুর’ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। ম্যান্ডেলা পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে এই আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক নিরীহ লোককে প্রাণ হারাতে হয়েছে। আর এটিকে কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ম্যান্ডেলা ও তার দল এএনসিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে তারা ম্যান্ডেলার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।

সহিংস আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৬২ সনের ৫ আগস্ট ৪০ বছর বয়সী ম্যান্ডেলাকে গ্রেফতার করা হয়। যার ফলে তার জীবন থেকে হারিয়ে যায় ২৭ টি বছর। তবে জেলে থেকেও ম্যান্ডেলা দমে যাননি। জেলে বসেই তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরশিক্ষণ কর্মসূচির আওতায় পড়াশোনা শুরু করেন এবং আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। 

জেলে থাকাকালীন তিনি প্রায় নানা সময়ে তার প্রিয়জনদের কাছে চিঠি লিখতেন। স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ অনেকের কাছেই চিঠি পাঠাতেন। জেলে থাকাকালীনই তার মা মারা যান। কিন্তু তাকে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। নির্জন কারাগারে বসে তিনি লেখেন, “তোমাকে আর কোনোদিন দেখতে পাব না! ভাবতেই পারছি না।” এই ক্ষত মুছতে না মুছতেই তার এক ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ম্যান্ডেলার একটি প্যান্ট পরেছিলেন। ম্যান্ডেলা লেখেন, “মৃত্যুর সময় আমার একটি প্যান্ট পরে ছিল সে। সেটা তার বড়ই হওয়ার কথা। তার যথেষ্ট কাপড়চোপড় থাকা সত্ত্বেও আমার কাপড় পরার কোনো কারণ ছিল না। তবু সে পরেছিল। এই যে আবেগ, এটাই আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে আমার অনুপস্থিতি, আমার কারাগারে থাকা, সন্তানদের ওপর কী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল; তা আমার মনকে উত্তাল করে দিল।” এমনি দুঃখ কষ্টে তার জীবন কাটতে থাকে নির্জন অন্ধকারে। কিন্তু তবুও তার এ নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না। তিনি বলতেন, “যদি জেলে না যেতাম, তাহলে অনেক কিছু শেখা বাকি থাকত।”

কথায় আছে, আপনি হয়তো একজনকে মেরে ফেলতে পারবেন, কিন্তু তার আদর্শকে কখনো মেরে ফেলতে পারবেন না। এই কথাই যেন প্রতিফলিত ম্যান্ডলার জীবনে। ম্যান্ডেলা জেলে থাকাকালীনই ম্যান্ডেলার পক্ষে সারা বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি হতে থাকে। দীর্ঘ জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেওয়া হয় তাকে। এরপরে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস তথা এএনসির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৯৪ সালে ক্ষমতায় আসীন হন। যা ১৯৯৯ পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল। সেই সময় তিনি সারা বিশ্বের কাছে হয়েছিলেন সমাদৃত, সিক্ত হয়েছিলেন ভালোবাসায়। 

 

 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/18/1563466238205.jpg

বাংলাদেশে ম্যান্ডেলা ◢

 

আমরা অনেকেই জানিনা নেলসন ম্যান্ডেলা একবার আমাদের বাংলাদেশেই এসেছিলেন। সময়টা ১৯৯৭ সাল। মার্চের ২৬ তারিখ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী দিবস। আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসেছেন। একই সময়ে এসেছেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধান সুলেমান ডেমিরেলের মতো বিশ্বনেতা। বাংলাদেশে এসে তিনি এদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে নিজের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকে তুলনা করে দুটি আন্দোলনকেই মানুষের মুক্তির আন্দোলন হিসেবে আখ্যা দেন। বাংলাদেশের অনেক সম্ভাবনার কথা বলছিলেন তিনি। বলেছিলেন, কিছু আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করলেই কিন্তু দেশটি পাল্টে যেতে পারে। এজন্য দরকার স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। নইলে দেশ মুখ থুবড়ে পড়বে। কারণ, স্বচ্ছতা না থাকলে দায়বদ্ধতাও থাকবে না। তখন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়বে। তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন শিক্ষা-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার কথাও।

আজকেও আমরা ম্যান্ডেলার কথাগুলোর যৌক্তিকতা গভীরভাবে উপলব্ধি করি। তার এই সামান্য কয়টি কথা থেকেই বোঝা যায় তিনি আসলে কত গভীর এবং কত বিচক্ষণ মাপের রাজনীতিবিদ ছিলেন।

বর্ণিল জীবনে তিনি দুইশ’র বেশি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার মধ্যে রয়েছেন নোবেল পুরস্কার ও ভারতরত্ন পুরস্কারের মতো বড় বড় সব অর্জন।

শেষ জীবনে এসে রোগ ব্যাধি বাসা বাঁধে শরীরে। ২০১৩ সালের ৮ জুন তিনি ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে প্রায় দুই মাস হাসপাতালে কাটান। ২১ সেপ্টেম্বর তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান সংগ্রামী।

নেলসন ম্যান্ডেলাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয় তিনি কিভাবে মানুষের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান? উত্তরে বলেন তিনি বলেন, “আমি চাই আমার সম্পর্কে লোকে এমন কথাই বলুক যে, এখানে এমন এক ব্যক্তি ঘুমিয়ে আছেন, যিনি পৃথিবীতে তার কর্তব্য সম্পাদন করেছেন।”

ম্যান্ডেলার এই ইচ্ছেটাও হয়তো পূরণ হয়েছে আজ।

বাংলার নবজাগরণে এক বিদেশি দূত

বাংলার নবজাগরণে এক বিদেশি দূত
হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর ভাস্কর্য

আঠার শতকের মাঝামাঝিতে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের কারণে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলা শাসনের একচেটিয়া সুযোগ পায়। এর ফলে তাদের মাধ্যমে ইউরোপের আধুনিকতার ছোঁয়া বাংলায় লাগে। এটাকে সেসময় হিন্দু রক্ষণশীল সমাজ গ্রহণ করতে চায়নি। কেননা তারা যুক্তিকে ভয় পায়। যুক্তি তাদের বিশ্বাসকে ভেঙে দিতে পারে। এই পশ্চাদমুখী সমাজকে নব আলোয় আলোকিত করতে ঊনিশ শতকের গোড়ায় আবির্ভূত হন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। বাংলায় নবজাগরণে অবিস্মরণীয় একটি নাম।

ডিরোজিওর জন্ম ১৮০৯ সালের ১৮ এপ্রিল কলকাতার মৌলালি অঞ্চলে ইউরেশীয় পরিবারে। তার বাবা ছিলেন পর্তুগিজ। আর মা ছিলেন ভারতীয়। সে হিসেবে তিনি ইউরেশীয়। মাত্র ছয় বছর বয়সে মা-কে হারান তিনি। ইউরোপের রক্ত গায়ে থাকলে কী হবে মনেপ্রাণে তিনি একজন খাঁটি বাঙালি। তিনি যুক্তিবাদী দার্শনিক, স্বাধীন চিন্তাভাবনার উপাসক, অসাম্প্রদায়িক ও দেশপ্রেমিক মানুষ। ইউরেশীয়রা তখনকার সময়ে অবহেলার পাত্র ছিল। তাদের জন্য নানা ধরনের নিয়মকানুন ছিল। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ ছিল না। আইন-আদালতের ক্ষেত্রেও তাদের উপেক্ষা করা হতো। তারা সকল পেশায় প্রবেশ করতে পারত না, ছিল নানা নিষেধাজ্ঞা। বলা চলে তারা ছিল নিপীড়িত শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত।

শিক্ষাজীবনে ডেভিড ড্রামন্ড ছিলেন ডিরোজিওর আদর্শ শিক্ষক। ১৮১৫-২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ড্রামন্ডের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেন। তার সান্নিধ্যে থেকে শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি বিষয়ে জ্ঞানার্জনের ফলে তার মধ্যে পরিবর্তনের জোয়ার আসে। এজন্য তিনি ধর্মের সমস্ত গোঁড়ামিকে উপড়ে ফেলায় ছিলেন বদ্ধপরিকর। সেসময় পাশ্চাত্য ভাবধারার সাথে হিন্দু রক্ষণশীলতার বিরোধ বাঁধে। কিন্তু তিনি পাশ্চাত্যের আধুনিকতা সমাজে ছড়ানোর হাল ধরেন। ফলে তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দুরা ডিরোজিওর প্রতি রুষ্ট হন। তার বিরুদ্ধে হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছিল। কিন্তু পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকে এদেশের মানুষদের আমূল চিন্তাধারা পাল্টে দেওয়ার পক্ষে তার নৈতিকতা কাজ করছিল। এই প্রক্রিয়াকে তিনি সফল করেছিলেন তার ছাত্র ও ভাবশিষ্যদের মাধ্যমে। তার সম্প্রদায়ের ওপর হীন দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাবের প্রতিবাদও তিনি হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন শিক্ষকতাকালীন। তার অনুগামীদের ইয়ং বেঙ্গল বলা হয়। এই ইয়ং বেঙ্গলরা চলাফেরা, খাদ্যাভ্যাসে, চেতনায় তৎকালীন সমাজের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।

হিন্দু কলেজে শিক্ষকতাকালীন তিনি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কষাঘাত করেন। এজন্য তিনি অনেকের রোষানলে পড়েছিলেন। তার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে ছাত্ররা ছিলেন উদগ্রীব। ধর্ম বা ঈশ্বর নিয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি এখনো ঈশ্বর বা ধর্ম সম্পর্কে চরম সত্যটি অবগত হতে পারিনি। এর ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে কলেজ থেকে। ধর্ম বিষয়ে এমন উক্তির ফলে ১৮৩০ সালে তার বিরুদ্ধে এক আদেশ জারি করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই আদেশ ছাত্রদের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে পরবর্তীতে নানা অজুহাতে হেনস্তা করতে চেয়েছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ। তিনি ছাত্রদের বলতেন, কোনো বিষয়ে মত প্রকাশের আগে পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তির আলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে যদি মনে হয় সঠিক, তবেই তা জনসম্মুখে প্রকাশে বাধা নেই।

হিন্দু কলেজের প্যারীদাঁস মিত্র, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রসিককৃষ্ণ মল্লিক, রাধানাথ সিকদার, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামগোপাল ঘোষ, হরচন্দ্র ঘোষ তার অনুসারী ছাত্র। এদের অনেকেই পরবর্তীতে সাহিত্যের ক্ষেত্রে হয়ে ওঠেন অবিস্মরণীয়। সাংবাদিকতায়ও এদের কয়েকজনের নাম উল্লেখযোগ্য। হিন্দু কলেজের বাইরে নিজের বাড়িতে ও মানিকতলায় শ্রীকৃষ্ণ সিংহর বাগানবাড়ির ঘরে ডিরোজিও অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন গড়ে মুক্তচিন্তা বিকাশের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাস থেকে ছাত্রদের মুক্তি দিতে যুক্তিবাদী ও সত্যসন্ধানী করে তোলায় তিনি ব্রতী ছিলেন। বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবতাবাদের প্রসার ঘটানো, নারী শিক্ষা ও নারী স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা, সংবাদপত্রে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলা, স্বদেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটানোর প্রতি ছিলেন সোচ্চার। প্রচলিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়-রাষ্ট্রীয় সংস্কার বা কুসংস্কারগুলোর বিরুদ্ধে স্বাধীন মতামত প্রদানের ব্যবস্থা করে ছাত্রদের মনে চিন্তার বিকাশ ঘটানোয় রাখেন উল্লেখযোগ্য অবদান। তিনি ক্লাসের ছকবাঁধা পাঠ্যক্রমের মধ্যে আবদ্ধ থাকেননি বরং শিক্ষার্থীদের বিতর্ক ও পত্রিকা বের করার উৎসাহ দিয়ে মনের ভিত্তিকে শক্ত করিয়েছেন। তার প্রভাবে কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘দ্য এনকোয়ারার’ ও দক্ষিণারঞ্জনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘জ্ঞানান্বেষণ’। এসব পত্রিকা প্রকাশ সমাজ বদলে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছিল। তাই এদের সঙ্গে রক্ষণশীল সমাজের একটি দ্বন্দ্ব চলতে থাকে।

১৪ বছর বয়সে তিনি লেখাপড়ার ইতি ঘটান কর্মের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে। তিনি উচ্চশিক্ষা আর গ্রহণ করেননি। ভেবেছিলেন এই সমাজ কিভাবে কলুষমুক্ত করা যায়, তার উপায় অন্বেষণ করা। দুটি চাকরির অফার পান তিনি। একটি ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেট’-এর সহসম্পাদক হিসেবে অন্যটি হিন্দু কলেজে শিক্ষকতার। জানা যায়, তিনি দুটি চাকরি করেন একই সাথে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি শিক্ষক হিসেবে হিন্দু কলেজে যোগদান করেন। তিনি শুধু সাংবাদিক ছিলেন না, কবিও ছিলেন। কবিতা লেখার উৎসাহ দিতেন ‘দ্য ইন্ডিয়া গ্যাজেট’-এর সম্পাদক ড. জন গ্রান্ট।

সমাজ সংস্কারের পাশাপাশি তিনি চিন্তারও সংস্কার করেছেন। চিন্তায় পরিবর্তন না আনতে পারলে কোনো কিছুর উন্নয়ন সম্ভব নয়। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন ডিরোজিওর পূর্ববর্তী বাঙালি দার্শনিক ও সমাজ সংস্কারক। কলকাতায় রাজা রামমোহন রায় থাকলেও সেসময় তার সাথে ডিরোজিওর পরিচয় ঘটেনি। যদি ঘটত তাহলে সংস্কারের গতিতে ভিন্ন রূপ লক্ষ করা যেত। গির্জা ও খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তার অভিমতের কারণে সমাজপতিরা তার প্রতি ছিল বিরূপ। ভারতীয় হয়েও তিনি রক্ষণশীল হিন্দুর কাছে বিধর্মী অন্যদিকে খ্রিস্টান হয়েও ইউরেশীয় হওয়ার জন্য শাসকগোষ্ঠীর কোনো সাহায্য পাননি। ১৮৩১ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র