Barta24

মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৬

English

মেঘপাহাড়ের ডাক-১০

চেরাপুঞ্জি: বৃষ্টির বিশ্ব বসতি

চেরাপুঞ্জি: বৃষ্টির বিশ্ব বসতি
ছবি: বার্তা২৪.কম
মাহমুদ হাফিজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর


  • Font increase
  • Font Decrease

চেরাপুঞ্জিকে আমি নাম দিয়েছি বৃষ্টির বিশ্ব বসতি। এখানে বৃষ্টি আকাশ থেকে পড়ে না। যে মেঘ থেকে আমরা বৃষ্টি ঝরতে দেখি, সে মেঘেরা বাস করে সেখানে। আর মেঘবৃষ্টির পরিমাণ এতো বেশি যে বহু আগে তা বিশ্বরেকর্ড করে বসে আছে। সে হিসেবে আমরা আজ বৃষ্টির বিশ্ব বাড়ির অতিথি। কিন্তু বৃষ্টি কই? ঘনমেঘে চারপাশ ছেয়ে আছে, বৃষ্টির কোনো আলামত দেখতে পাচ্ছি না। বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধুরা ফেসবুকে আমার চেক ইন আর গুগল মানচিত্রের লোকেশন দেখে ‘ওখানে বৃষ্টি পাবে না, চেরাপুঞ্জিতে এখন বৃষ্টি হয় না’ বলে যে মন্তব্য করেছিল, তাই কি তবে সত্য হতে চলেছে? রেইনকোট আর ছাতাগুলো টাটা সুমোর পেছনের বুটে পড়ে আছে। গায়ে চড়ানো তো দূরে থাক, এগুলোর মোড়ক পর্যন্ত খোলা হয়নি। অথচ যাওয়ার প্রস্তুতির সময় ভ্রমণসঙ্গী গিন্নী ও কনিষ্ঠপুত্রধনের জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছি, ‘রেইনকোট-ছাতার এন্তেজাম, কারণ এবারের ভ্রমণ বৃষ্টিমুখর। বৃষ্টি দেখতেই শিলং যাচ্ছি’।

থাংখারাং পার্কের লুকআউট পয়েন্ট থেকে কিনরেম ফলস দেখে বের হতেই মেঘের ঘনঘটা। বৃষ্টি এলো এলো। বৃষ্টিকে স্বাগত জানাচ্ছি বটে, উদ্বেগও আছে। ভারিবর্ষণ শুরুর আগেই শেলা-সোহরা সড়কের কাঁচা অংশ অতিক্রম করে ওপরের পাহাড়ের দিকে উঠে যেতে হবে। আসার সময় সড়কের কাঁচা অংশের যে অবস্থা দেখেছি, ঢলে তা যে গাড়ি চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়বে, তাতে সন্দেহ নেই।

পিচঢালা নতুন রাস্তায় এলেই গাড়ি ঊর্ধ্বগামী হতে থাকে। সেভেন সিস্টার্স ফলসের এর দিকে এগোতে থাকলেই গাড়ির মধ্যে তুসুর চিৎকার ‘মেঘ মেঘ, পাহাড়ের নিচে নেমে যাচ্ছে মেঘ’। সবাই তাকিয়ে দেখি, ডানের  উপত্যকাজুড়ে মেঘের ভেলা পাহাড়শীর্ষসমূহের নিচের দিকে পরিভ্র্রমণরত। সবুজ পাহাড়ের কোলে শুভ্র মেঘের এই পরিভ্রমণ চোখকে প্রশান্ত করে দেয় আমাদের। চোখের সামনে ইউরোপীয় সৌন্দর্য দেখে আমরা গাড়ি থেকে না নেমে আর স্থির থাকতে পারি না। জায়গাটির নাম নেই। আমি গুগলে দেখলাম, কিছুদূরে একটা নামের উল্লেখ রিংগুড নামে একটা নামের উল্লেখ আছে। সেভেন সিস্টার্স ফলস থেকে জায়গাটি অন্তত তিন কিলোমিটার নিচের দিকে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/19/1560949374296.jpg

ডাইনের ভ্যালির দিকে তাকিয়ে দেখি মেঘপাহাড়ের বিরামহীন লুকোচুরি। কখনো পাহাড়ের নিচে নেমে যাচ্ছে মেঘ। কখনো আবার পাহাড়কে চুমু দিয়ে উঠে যাচ্ছে ওপরে। কোনো কোনো মেঘের দল একস্থানে ভেসে রয়েছে। কিছু মেঘ উড়ছে একাধিক পাহাড়ের মাঝখানে ঢেউখেলানো ভাঁজে ভাঁজে। এই অভূতপূর্ব চোখের সাড়ে তিন ইঞ্চি লেন্সে তা রেকর্ড করে মস্তিষ্কের ডার্করুমে রেখে দেই। এই লেখাটি আসছে মস্তিষ্কের ডার্করুম থেকে সেই চলচ্ছবি ডেভেলপের মধ্য দিয়ে। মোবাইল ক্যামেরায় কিছু মেঘকে ক্যামেরাবন্দী করতেও আমাদের  দলটি ভুল করলো না। এই দৃশ্যপটটির মজা হচ্ছে এখান থেকে সেভেন সিস্টার্স ফলসটিও দেখা যায়। তবে সেভেন সিস্টার্স যে চুনাপাথরের পাহাড় থেকে নামছে, জায়গাটি তার নিচে বলে জলপ্রপাতটি ওপরের দিকে দৃষ্টিগোচার হয়।  

আমরা পাহাড়ি বাঁক নিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সেভেন সিস্টার্স বা মাওসমাই জলপ্রপাতের ভিউপয়েন্টে পৌঁছাই। রাস্তার পাশে বড়সড়ো পার্কিং, দোকানপাট। গাড়ি পার্ক করার জলপ্রপাত উপভোগ দেখতে নেমে পড়লাম আমরা। আমরা বলতে, চারজন। জলি,  তুসু আমি আর কবি কামরুল। হোস্টগণ অনেকবার আসায় গাড়িতেই বসে রইলেন। ঝির ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। তবে আমরা ছাতা বা রেইনকোট তখনো বের করিনি। জামাকাপড়ের ওপর যে বৃষ্টিসহনক্ষম জ্যাকেট আছে তা দিয়েই চালানো যাচ্ছে। আমার গায়ে লাল জ্যাকেট। যাত্রাকালে জলিকে বলেছিলাম, মেঘরাজ্য মেঘালয়ের সব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড হবে সবুজ। সবুজের ওপর কন্ট্রাস্ট করতে গায়ের পোশাক হতে হবে জুৎসই রঙের, তাতে ছবি ভাল ফুটবে। সেমতে, জামার ওপরে চাপিয়েছি লাল জ্যাকেট। যে লোকেশনে দাঁড়িয়েই পোজ দিই না কেন ছবি হচ্ছে ‘সেইরকম’।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jun/19/1560949438025.jpg

রেলিঙঘেরা ভিউপয়েন্টের নিচে পাহাড়ি উপত্যকা। অদূরে পাহাড়ের গা’ দিয়ে নামছে সাত সাতটি জলপ্রপাতের ধারা। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়, হা হয়ে ক্ষণিক সবকিছু ভুলে দাড়িয়ে থাকতে হয়। একহাজার ৩৩ ফুট উচ্চতার সেভেন সিস্টার্স বা মাওসমাই ফলস ভারতের অন্যতম দীর্ঘ জলপ্রপাতের মর্যাদা বহন করছে। জায়গাটি পর্যটকের পদভারের মুখরিত। ওয়াও ওয়াও ধ্বনি, আবাল বৃদ্ধ বণিতার গুঞ্জন, ক্যামেরা, ট্যাব, মোবাইলের ক্লিক ক্লিক। এখন প্রযুক্তির যুগ। মিডিয়া এখন আর সনাতনধারার পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশনের মধ্যে সীমিত নেই। সোস্যাল মিডিয়া যুগে পর্যটন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে কেউ ফেসবুকে লাইভ দিচ্ছে, কেউ ক্যামেরার সঙ্গে সেলফি স্ট্যান্ড লাগিয়ে সেলফি তুলছে, কেউ জলপ্রপাত পেছনে রেখে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বর্ণনা দিয়ে ভিডিও করছে। নিশ্চিত ইউটিউব চ্যানেলে ছাড়া হবে এসব ভিডিও। প্রযুক্তিযুগে পর্যটনস্পটগুলোর চেহারাও গেছে বদলে গেছে। তুসু জলপ্রপাতকে পেছনে রেখে সেলফি তুলতে চেষ্টা করছে। আমি একজায়গায় ‘সেলফি ডেঞ্জার জোন’ লেখা সাইনবোর্ড দেখিয়ে তাকে সাবধান করে দিলাম।

দুপুরে শিলং থেকে বের হওয়ার সময় থেকে এখন পর্যন্ত চা খাইনি। ইতোমধ্যে মধ্যাহ্নের সময়ও চলে যাচ্ছে। হোস্টগণ বাসা থেকে খাবার দাবার সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। স্ট্রিমলেট ডেখার আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছেন, চেরাপুঞ্জির ‘দোকান’ সড়কে তাঁর বোনের বাড়ি আছে। সেখানে দুপুরের খাওয়ার পর চা পানের ব্যবস্থা হবে। আমাদের পেটে ততোক্ষণে ইঁদুর দৌড় শুরু হয়েছে। আমরা তা ভুলে আছি উদার প্রকৃতি দেখার ঘোরে। খাবার কথা মনে হলে, আগে খাওয়ার কাজটি সারার জন্যই সবাই একমত হওয়া গেল। চেরাপুঞ্জি সদরের ডুকান সড়কে ডেখারের বোনের বাড়ি। গাড়ি দ্রুত সেদিকে ছুটে চললো।

আপনার মতামত লিখুন :

ব্যর্থতা এড়িয়ে চলার কৌশল

ব্যর্থতা এড়িয়ে চলার কৌশল
ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবী চষে এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না যে জীবনে সফল হতে চায় না। মানুষ আমৃত্যু ছুটতে থাকে সফলতার পেছনে। অধরা সফলতা ধরা দেয় না। দিনের শেষে পেছনে ফিরে তাকালে সবটা জুড়েই শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া কিচ্ছুটি দেখা যায় না। মনে পড়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে করা একটা ভুল কাজের কথা, একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের কথা। কিন্তু পেরিয়ে আসা সেইসময় আর নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কিংবা আবেগের বশে করা ভুলগুলো শোধরানোর তেমন কোনো উপায় থাকে না তখন।

তাই সচেতন হতে হয় সময় থাকতে। অল্প কিছু বিষয় খেয়াল করে চলতে পারলে হতাশা কাটিয়ে অর্জন করা যায় সফলতা, অন্তত এড়ানো যায় বড় ধরনের ব্যর্থতা—

সিদ্ধান্ত গ্রহণে হোন সতর্ক নিন বিশেষজ্ঞ-পরামর্শ

মানুষের জীবনের যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত তার জীবন বদলে দিতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে হতে হবে সতর্ক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন কারো সাথে করতে হবে পরামর্শ। ভরসা করা যায় এমন মানুষদের কাছ থেকে নিতে হবে দিকনির্দেশনা। তারপর বিকল্পগুলো থেকে সম্ভাব্য উত্তম বিকল্পকে গ্রহণ করা। এতে করে ভুল সিদ্ধান্তের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তবে যাদের থেকে পরামর্শ নেওয়া হবে তাদের ব্যাপারেও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

ইতিবাচক মানুষদের সাথে মিশুন

চারপাশ যদি নেতিবাচক মানুষদের দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে তাহলে আপনার মধ্যেও সেই প্রভাব সংক্রমিত হবে। একসময় নিজেও আপনি হতাশায় নিমজ্জিত হবেন। তাই নিজেকে চাঙ্গা রাখতে সবসময় ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষদের সাথে চলাফেরা করুন।

আজকের কাজ আজকেই করাকে নিয়ম মানুন

মানুষ স্বভাবতই কাজ করতে চায় কম, পেতে চায় বেশি ফল। আর এটাই ডেকে আনে সমস্যা। কাজকে ফেলে রাখে কাল করব পরশু করব ভেবে। কিন্তু সেই কাল-পরশু আর আসে না। তাই এই ক্ষেত্রে নিয়ে আসা উচিত বড় একটা পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকে। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে নিজের এলোমেলো বিছানা ঠিক করুন সবার আগে। একটু পরে করবেন মনে করে ফেলে রাখবেন না। নিজের জীবন গোছানোর কাজ শুরু করুন নিজের বিছানা থেকে। চাকরির জন্য সিভিটা আপডেট করা দরকার? এখনই করুন। কাল কাল করে করে ডেট চলে গেলে আর আপডেট করেইবা কী করবেন?

নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন

যে যত বেশি দায়িত্ববান, সে তত বেশি সফল। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার কাজ আপনাকেই করতে হবে। আপনার কাজ আপনার জন্য অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। হতে হবে সময়সচেতন। ব্যক্তিচরিত্র থেকে খামখেয়ালি কমিয়ে আনতে হবে। নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তবেই ধরা দেবে অধরা সফলতা।

দুশ্চিন্তার কারণগুলো এড়িয়ে চলুন

মানুষ যখন হতাশায় থাকে, চোখের সামনে কোনো পথ খোলা নেই, তখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অশুভ আশঙ্কার ছায়া দেখতে পায়। মূলত নিরুপায়বোধ ও অসহায়ত্ব থেকেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা আর ছাড়িয়ে যায় মাত্রা। দুশ্চিন্তা বেশি হলে অনেকে ভালোমন্দের জ্ঞান হারান। কী করবেন, কী করবনে না বুঝে উঠতে পারেন না। অনেকে নিজেকে তিলে তিলে অসুস্থ করে তোলেন এই দুশ্চিন্তার মাধ্যমে। এরফলে সমাধানের বদলে জড়িয়ে পড়েন আরো বড় সমস্যায়। তাই কোনো কাজে ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থতা পুরোপুরি গ্রাস করার আগেই নিজেকে আবার কাজে লাগিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যর্থতা মানুষের জীবনে থাকেই। পৃথিবীতে যত সফল মানুষ দেখা যায় প্রত্যেকেই নিজেদের সফল করেছেন ব্যর্থতা থেকে টেনে তুলে। নিজেকে শান্ত রেখে সমস্যা না বাড়িয়ে উপায় বের করার কাজে লেগে যেতে হবে। তবেই দুশ্চিন্তা পালাবে জাদুঘরে।

অবান্তর কল্পনা থেকে বের হয়ে আসুন

আমার এক বন্ধু আছে। যে সবসময় এটা ভাবত—এই যে বিল গেটস কিংবা জাকারবার্গ, এরা এত টাকার মালিক, কেউ যদি তাকে দুই তিন কোটি টাকা দিয়ে দেয় তবে তো তাদের কোনো সমস্যা হবার কথা না। এই কল্পিত ধারণা তাকে কোনো কাজেই মনোনিবেশ করতে দিত না। সাবধান থাকবেন, কল্পনার এমন জগত আপনার জন্য কোনোদিনই কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। রূপকথার কোনো আলাদীন এসে আপনার ইচ্ছা পূরণ করে দেবে না। তাই ক্ষতিকর কল্পনার জগত থেকে বের হয়ে নিজের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে নিজেরই বাস্তবতায়।

রাগা বারণ

কারো কারো ক্ষেত্রে এমন হয় যে, পান থেকে চুন খসলেই রাগ উঠে যায়। হয়তো বন্ধুবান্ধবরা মিলে কোথাও ট্যুর প্ল্যান করছেন, হুট করে সামান্য বিষয়ে রাগ করে নিজেকে ট্যুর থেকে প্রত্যাহার করে নিল। আবার কেউ আছে যাদের কোনো কিছুই পছন্দ হয় না। কক্সবাজার যেতে চায় না যেহেতু সেখানে তো শুধু পানি, পানি দেখার কী আছে। বান্দরবান যেতে যেতে চায় না কারণ সেখানেও তো শুধু পাহাড়। উঠতে বসতে এমন রেগে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। কারণ রাগত আপনি অন্যকে যে কথাগুলো বলেন তার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে তো নিয়ন্ত্রণশূন্য এক নিজেকে প্রদর্শন করা হয় এতে, তার-ওপর হয়তো আপনার জীবনে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন দেখা দেবে একদিন। কিন্তু সেদিন তো তারই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময়। রাগের ব্যাপারে সচেতন না হলে ধরে নিন আপনি ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন।

রোমান পোলান্‌স্কি : সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডালের মোক্ষম উদাহরণ

রোমান পোলান্‌স্কি : সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডালের মোক্ষম উদাহরণ
রোমান পোলান্‌স্কি

মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণভোমরা হলিউডের জন্য হলেও বিশ্বের অন্যতম রোমাঞ্চকর গল্পের নগরী হিসেবে লস এঞ্জেলসকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু ’৭০-এর দশকের এই শহর ছিল সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডাল দ্বারা অন্ধকারাচ্ছন্ন। যৌন বিকারগ্রস্ততা, মাদকাসক্তি প্রভৃতি ছিল হলিউড পাড়ার পরতে পরতে।

রোমান পোলান্‌স্কি তেমনই একজন সেলিব্রেটি যার ঝুলি নানাবিধ স্ক্যান্ডালে পরিপূর্ণ। তিনি একাধারে সফল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, এমনকি লেখক। তবে আজ তিনি পৃথিবীবাসির কাছে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেই সমধিক পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত। বহুমুখী প্রতিভাধর এই প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক তার এই এক জীবনে কুড়িয়েছেন অসংখ্য সুখ্যাতি, জীবন তাকে দু হাত ভরে দিয়েছে এবং তিনিও দু হাত পেতে সেসব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার জীবনের এই আলোয় ঝলমলে অধ্যায়ের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে এক ভয়ংকর কালো অধ্যায়। আর সেই কালো অধ্যায়ের সূত্র ধরেই বলায় যায়, রোমান পোলান্‌স্কির জীবনই হলো ‘সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডাল’-এর মোক্ষম উদাহরণ।

এই বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ১৯৩৩ সালের ১৮ আগস্ট ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু তার বেড়ে ওঠা পোল্যান্ডে। মা বুলা (জন্মনাম কাৎজ-প্রৎজেবর্স্কা) এবং বাবা রিসজার্ড পোলান্‌স্কি ছিলেন যথাক্রমে চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর্য নির্মাতা। পোলান্‌স্কির বাবা ইহুদি এবং পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। পোলান্‌স্কির মা রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং রোমান ক্যাথলিক হিসেবে বেড়ে ওঠেন, তিনি মূলত অর্ধ-ইহুদি বংশধর ছিলেন। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144369603.jpg
◤ পোলান্‌স্কির বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য পিয়ানিস্ট ◢


পোলান্‌স্কি পোল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম শহর উচের ন্যাশনাল ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে পদার্পণ একজন অভিনেতা হিসেবে। ১৯৫০-এর দশকে আন্দ্রজেয় ভায়দার ‘পোকোলনি’ (প্রজন্ম, ১৯৫৪) এবং একই বছর সিলিক স্টার্নফেল্ডের ‘জাকজারোয়ানি রোভার’ (জাদুকরী বাইসাইকেল) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে অভিনেতা পোলান্‌স্কির অভিষেক ঘটে।

চলচ্চিত্র পরিচালনায় পোলান্‌স্কির অভিষেক হয় ১৯৫৫ সালে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রোভার’ (সাইকেল) নির্মাণের মধ্যদিয়ে। রোভার একটি আধা-আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র এবং এখানেও পোলান্‌স্কি অভিনয় করেন।

রোভারে তিনি তার বাস্তব জীবনের একটি সহিংস চক্রের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে দেখানো হয়েছে এক কুখ্যাত ক্রাকো ফেলোন ইয়ানুশ ডিজুবা, পোলান্‌স্কির সাইকেল বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল; কিন্তু পরিবর্তে ডিজুবা তাকে মারধর করে এবং তার টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। বাস্তব জীবনে পোলান্স্কির মাথার খুলি ফাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে গ্রেফতার হয় এবং আরো আটটি অপরাধের মধ্যে তিনটি হত্যার জন্য তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। উচে পড়াশোনার সময় আরো বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি তাকে স্বীকৃতি এনে দেয়, বিশেষ করে ‘ডভায় লুডজি জ শাফাঁ’ (১৯৫৮) এবং ‘গডাই স্পাডায়া আনিওউ’ (১৯৫৯)। তিনি ১৯৫৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

ক্যারিয়ারের সোপানগুলি অবলীলায়, অত্যন্ত সফলতার সাথে ছুঁতে পারলেও তার দাম্পত্য জীবনের যাত্রাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। অভিনেত্রী বারবারা ল্যাস ছিলেন এই পোলিশ চলচ্চিত্র পরিচালকের প্রথম স্ত্রী। যিনি পোলান্‌স্কির ‘হোয়েন অ্যাঞ্জেলস ফল’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তারপর এই জুটি ১৯৫৯ সালেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিন্তু ১৯৬১ সালে মাত্র দু বছরের ব্যবধানে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তারপর তিনি আবারও ১৯৬৮ সালের ২০ জানুয়ারি অভিনেত্রী শ্যারন টেইটকে (২৪ জানুয়ারি ১৯৪৩-৯ আগস্ট ১৯৬৯) বিবাহ করেন। শ্যারন টেইটও ছিলেন একজন সুঅভিনেত্রী।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144309583.jpg
◤ অভিনেত্রী ও প্রথম স্ত্রী বারবারা ল্যাসের সঙ্গে পোলান্‌স্কি ◢


কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রোমান পোলান্‌স্কির ক্যারিয়ার যখন খ্যাতির তুঙ্গে, ১৯৬৯ সালে সাড়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অভিনেত্রী শ্যারন টেইটকে মাত্র ২৬ বছর বয়সে চার্লস ম্যানসনের অনুসারীরা হত্যা করে। স্ত্রীকে হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন এই উঠতি চলচ্চিত্র পরিচালক। পরবর্তীকালে দীর্ঘ এক বিরতির পর ১৯৮৯ সালে ইম্যানুয়েল সিনার সাথে তৃতীয়বারের মতো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি একজন ফরাসি অভিনেত্রী।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144429916.jpg
◤ অভিনেত্রী ও দ্বিতীয় স্ত্রী শ্যারন টেইটের সাথে পোলান্‌স্কি ◢


১৯৭৭ সালে রোমান পোলান্স্কি মাত্র ১৩ বছর বয়সী কিশোরী সামান্থা গেইমে’র সাথে যৌন সংসর্গে জড়িয়ে পড়েন, যখন তার বয়স ৪৩ বছর। ১০ মার্চ সামান্থার মা সুসানের তৎপরতায় পোলান্স্কিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পোলান্স্কি জনসম্মুখে অপরাধ স্বীকার করেন এবং ইউরোপে পালিয়ে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, এজন্য তিনি আর ফেরত আসেননি এবং ইউরোপ থেকেই চলচ্চিত্র পরিচালনা অব্যাহত রাখেন।

তবে শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্য যে, সামান্থার সাথে আজও রোমান পোলান্‌স্কির যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ আছে। জানা যায়, পোলান্‌স্কি ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ায় সামান্থা খুশিই হয়েছেন এবং তিনি তাকে ক্ষমাও করে দিয়েছেন। কারণ তিনি চান না পোলান্‌স্কির বাকি জীবন জেলে কাটুক। এদিকে রহস্যজনকভাবে সামান্থা পোলান্‌স্কিকে ধর্ষক কিংবা যৌননিপীড়ক কিংবা শিশুকামী হিসেবে চিহ্নিত করতে নারাজ। সামান্থার ভাষ্যমতে, “আমি কখনোই তাকে পেডোফাইল বলব না। আমি যেটা বলতে পারি তা হলো, তিনি নিতান্তই ভুলবশত চরমতম খারাপ একটা কাজ করে ফেলেছেন। এবং, আমি তাকে তখনই পেডোফাইল হিসেবে চিহ্নিত করতে পারতাম, যদি তিনি তার পরবর্তী জীবনেও এই একই ধরনের কাজ অব্যাহত রাখতেন।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144560460.jpg
◤ সামান্থা গেইম ◢


তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই সুইজারল্যান্ডে থাকাকালীন রোমান পোলান্‌স্কিকে গ্রেফতার করা হয় এবং এই গ্রেফতার নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম হয়। রোমান পোলান্‌স্কির পক্ষে হলিউডের অসংখ্য নামজাদা সেলিব্রেটি, ইউরোপের শিল্পীগোষ্ঠী, এমনকি রাজনীতিকরা সমবেত হয়। তারা এই গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে কথা বলে। এদিকে তার গ্রেফতারের ঘটনার পর আমেরিকার জনমত পোলান্‌স্কির বিপক্ষে গেলেও ইউরোপ এবং পোল্যান্ডের অগনিত মানুষ ছিল তার পক্ষে। আর এভাবেই এ-যাত্রায়ও আইনের বেড়াজাল থেকে পার পেয়ে যান রোমান পোলান্‌স্কি।

রোমান পোলানস্কি পরিচালিত চলচ্চিত্রসমূহ
• জ উ ভজি (১৯৬২)
• রিপালসন (১৯৬৫)
• কুল-দে-সাক (১৯৬৬)
• দ্য ফিয়ারলেস ভ্যাম্পায়ার কিলার্স (১৯৬৭)
• রোজামারিস বেবি (১৯৬৮)
• ম্যাকবেথ (১৯৭১)
• হোয়াট? (১৯৭২)
• চায়নাটাউন (১৯৭৪)
• লা লোকাতায়ার (১৯৭৬)
• তেস (১৯৭৬)
• পাইরেটস (১৯৮৬)
• ফ্র্যান্টিক (১৯৮৬)
• বিটার মুন (১৯৯২)
• ডেথ অ্যান্ড দ্য মেইডেন (১৯৯৪)
• দ্য নাইন্থ গেট (১৯৯২)
• দ্য পিয়ানিস্ট (২০০২)
• অলিভার টুইস্ট (২০০৫)
• দ্য ঘোস্ট রাইটার (২০১০)
• কার্নেজ (২০১১)
• লা ভেনাস অ লা ফরুর (২০১৩)
• দাপ্রেস উন হিস্তোয়ার ভ্রাই (২০১৭)

পোলান্‌স্কি পরিচালিত ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ চলচ্চিত্রটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং এটিই কেবল একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে। পোল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের যৌথ প্রযোজনায় নির্মীত এই দ্য পিয়ানিস্ট ২০০২ সালে মুক্তি পেয়েছিল।

পোল্যান্ডের এক ইহুদি পিয়ানো বাদকের ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ নামের আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। দ্য পিয়ানিস্ট কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া তিনটি ক্ষেত্রে একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে : সেরা অভিনেতা, সেরা পরিচালক এবং সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্য। এছাড়া ফ্রান্সের সেজার পুরস্কার লাভ করে তিনটি ক্ষেত্রে : সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা ও সেরা চলচ্চিত্র। এই ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যাড্রিয়েন ব্রডি। অ্যাড্রিয়েন ব্রডিই একমাত্র মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি ফ্রান্সের সেজার পুরস্কার জিতেছেন।

রোমান পোলান্‌স্কি শৈশবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিজ চোখে অবলোকন করেছিলেন, হয়তো সেজন্যই তার দ্য পিয়ানিস্টের নির্মাণশৈলি ছিল এত বেশি জীবন্ত। কাল পরিক্রমায় বিশ্ব রোমান পোলান্‌স্কিকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু দ্য পিয়ানিস্টকে কখনো ভুলতে পারবে না।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র