Barta24

সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৪ ভাদ্র ১৪২৬

English

ক্রিকেটারদের আত্মজীবনী : ক্রিকেটজীবনের ভিতর-বাহির

ক্রিকেটারদের আত্মজীবনী : ক্রিকেটজীবনের ভিতর-বাহির
ক্রিকেটারদের বইয়ের প্রচ্ছদ
শেহজাদ আমান
কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট


  • Font increase
  • Font Decrease

ক্রিকেটারদের জীবনী বা আত্মজীবনীতে শুধু ক্রিকেট নিয়েই যে সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের কথা বা স্মৃতিচারণ থাকে তা না। মাঠের বাইরের বিভিন্ন বিচিত্র ও আগ্রহোদ্দীপক ব্যাপার-স্যাপার এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন বিষয়-আশয়ও উঠে আসে বইগুলোতে। যা পড়ে পাঠকেরা চমৎকৃত হন। অনেক কিছু জানতে পারেন প্রিয় ক্রিকেটার সম্পর্কে। যেমন, পাকিস্তানী ক্রিকেটার শহীদ আফ্রিদি যে খেলোয়াড় হিসেবে পাঁচ-পাঁচটি বছর কমিয়ে নিয়েছিলেন, অথবা ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার মঈন আলীকে যে অস্ট্রেলিয়ার এক খেলোয়াড় স্লেজিং করে ‘ওসামা’ নামে ডেকেছিলেন, এরকম কিছু চমকপ্রদ তথ্য হয়তো কেবল ক্রিকেটারদের আত্মজীবনীতেই পাওয়া যেতে পারে। আবার, ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে পুনরায় যুবরাজ সিংয়ের ক্রিকেটে ফিরে আসার হৃদয়স্পর্শী কাহিনীর কথাই ধরুন না! সেই কাহিনী বিস্তারিত পাওয়া যাবে যুবরাজের আত্মজীবনীতেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563363767974.jpg
ক্রিকেটারদের বর্ণিল জীবনের শৈল্পিক আখ্যান তাদের জীবনীগ্রন্থগুলো ◢

 

যখন ক্রিকেটার নিজেই নিজের ক্রিকেট ও ব্যক্তিজীবনের কাহিনীটা লেখেন, সেটাকে বলা হয় ক্রিকেটারদের আত্মজীবনী। সেখানেও ক্রিকেটার কোনো লেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিকের সাহায্য নিয়ে যৌথভাবে বইটি লিখতে পারেন। কিন্তু যখন অন্য কোনো লেখক একেবারে আলাদাভাবে একজন বরেণ্য ক্রিকেটারের জীবনকাহিনী পাঠকদের সামনে তুলে ধরেন, যেখানে সাধারণত সেই নির্দিষ্টি ক্রিকেটারের সরাসরি কোনো সংস্রব বা ভূমিকা থাকে না, সেটাকে বলে ক্রিকেটারদের জীবনী। তবে, সেক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটার যদি বেঁচে থাকেন, বইটি লিখতে বা বইয়ের বিষয়বস্তু নির্বাচনে তাঁর অনুমতির দরকার হয়। সরাসরি ক্রিকেটারদের আত্মজীবনীর সংখ্যাই বেশি। তবে, বেশ কিছু অসাধারণ জীবনীগ্রন্থ, যেমন সুনীল গাভাস্কারের ‘সানি ডেজ’ (১৯৭৭), ইমরান খানের ‘ইমরান খান’ (২০০৯) বা মাশরাফি বিন মুর্তজাকে নিয়ে ‘মাশরাফি’র মতো দারুণ কিছু জীবনীগ্রন্থও আমরা পেয়েছি লেখকদের হাতে।

ক্রিকেটারদের আত্মজীবনীর ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্পিনার জিম লেকারের ‘স্পিনিং রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ বইটিকে অগ্রপথিক ধরা হয়। ১৯৫১ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। এরপরের কোনো ক্রিকেটারের আত্মজীবনীগ্রন্থের লেখকও জিম লেকারই। ১৯৬০ সালে তিনি প্রকাশ করেন দ্বিতীয় আত্মজীবনী ‘ওভার টু মি।’ এরপর ৬০’র দশক ও ৭০’র দশকে অল্পবিস্তর প্রকাশিত হতে থাকে বেশ কিছু আত্মজীবনী। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৭ সালে খেলোয়াড় থাকা অবস্থাতেই ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান সুনীল গাভাস্কারকে নিয়ে ‘সানি ডেজ’ এবং ১৯৮৩ সালে ইমরান খানের স্বনামে (ইমরান) তাঁর জীবনীগ্রন্থ বের হয়। তবে, নব্বইয়ের দশকে এসে, মানে ১৯৯০ সালের পর থেকে এধরনের আত্মজীবনী ও জীবনীগ্রন্থের সংখ্যা বাড়তে থাকে। অনেক সাবেক ক্রিকেটার, এমনকি তখনও খেলছিলেন এমন কিছু ক্রিকেটারও এসময় তাঁদের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন।

এসময়ই প্রকাশিত হয় ব্রায়ান লারার ‘বিটিং দ্য ফিল্ড’ (১৯৯৫), ওয়াসিম আকরামের ‘ওয়াসিম’ (১৯৯৮), রিচি বেনোর ‘অ্যানিথিং বাট অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’ (১৯৯৮), অ্যালান ডোনাল্ডের ‘হোয়াইট লাইটনিং’ (১৯৯৯)। ২০০০ সালের পরের সময়কালে এই সংখ্যাটা বাড়তে থাকে আরো। স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসের ‘দ্য ডেফিনিটিভ অটোবায়োগ্রাফি’ (২০০০), ইয়ান বোথামের ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’ (২০০০), শেন ওয়ার্নের ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’ (২০০২), ডেনিস লিলির ‘মিনেস : দ্য অটোবায়োগ্রাফি’ (২০০৩), বাসিল ডি অলিভিয়েরার ‘ক্রিকেট অ্যান্ড কনস্পিরেসি : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ (২০০৪), কপিল দেবের ‘স্ট্রেইট ফ্রম দ্য হার্ট’ (২০০৪), স্টিভ ওয়াহর ‘আউট অব মাই কমফোর্ট জোন’ (২০০৬), অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ‘ট্রু কালারস’ (২০০৮), ইমরান খানের ‘ইমরান খান’ (২০০৯), শোয়েব আখতারের ‘কন্ট্রোভার্শিয়ালি ইয়োরস’ (২০১১), যুবরাজ সিংয়ের ‘দ্য টেস্ট অব মাই লাইফ : ফ্রম ক্রিকেট টু ক্যান্সার অ্যান্ড ব্যাক’ (২০১২), শচীন টেন্ডুলকারের ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ (২০১৪), এবি ডি ভিলিয়ার্সের ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি’ (২০১৬), সৌরভ গাঙ্গুলির ‘এ সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ’ (২০১৮), ভিভিএস লক্ষ্মণের ‘টুএইটি ওয়ান অ্যান্ড বিয়ন্ড’ (২০১৮)-এর মতো অসংখ্য আলোচিত ও পাঠকপ্রিয় জীবনী বা আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় এই সময়কালে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563363833752.jpg
মাশরাফির বিন মুর্তজার জীবনীগ্রন্থ ‘মাশরাফি’ ◢



বাংলাদেশের বরেণ্য ক্রিকেটারদের নিয়ে জীবনী বা আত্মজীবনী লেখার ইতিহাস যদিও অল্পদিনের, তবে ইতোমধ্যে টুকটাক করে এগোচ্ছে। কিন্তু কোনো ক্রিকেটারের সরাসরি আত্মজীবনী এখনো বের হয়নি। গুণী কিছু ক্রীড়া সাংবাদিক লিখতে শুরু করছেন ক্রিকেটারদের জীবনীগ্রন্থ। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের ‘মাশরাফি’ ও মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদের ‘মানুষ মাশরাফি’। তবে, এধরনের বইয়ের সংখ্যা বাংলাদেশে এখনো অপ্রতুল।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563363940018.jpg
শহীদ আফ্রিদির বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘গেম চেঞ্জার’ ◢

 

আত্মজীবনী বা জীবনীগ্রন্থগুলো দর্শক ও ভক্তদের সাথে ক্রিকেটারদের বন্ধনকে করে আরো জোরালো। ভক্তদের আরো কাছে নিয়ে আসে ক্রিকেটারদের। ক্রিকেট জীবন এবং ব্যক্তিজীবন, একটা মানুষের দুটো জীবন যে হতে পারে একেবারে আলাদা, তা জানা যায় এই বইগুলোর মাধ্যমেই। কখনো কখনো আত্মজীবনী বা জীবনীগ্রন্থগুলো থেকে বেরিয়ে আসে এমন সব বিস্ফোরক তথ্য যা সৃষ্টি করে তুমুল বিতর্ক। এতে জড়িত হন আরো অনেকেই, পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলতে শুরু করেন সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের সমসাময়িক অনেক ক্রিকেটাররাও। তেমন বিতর্কই সৃষ্টি হয়েছিল, সাবেক পাকিস্তানী অলরাউন্ডার শহীদ আফ্রিদির আত্মজীবনী ‘গেম চেঞ্জার’ প্রকাশের পর। বইটিতে ভারতীয় ওপেনার গৌতম গম্ভীরকে ব্যক্তিগত শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ব্যক্তিত্বহীন আখ্যায়িত করেন আফ্রিদি। গম্ভীর প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে আফ্রিদি যেন সমালোচনার বন্যা বইয়ে দেন। গম্ভীরকে অসুস্থ মানসিকতার উল্লেখ করে ক্রিকেটের কলঙ্ক বলতেও দ্বিধা করেননি তিনি। জবাবে, গৌতম গম্ভীরও পরে ছেড়ে কথা বলেননি। তিনি টুইট করে বলেন, ‘আফ্রিদি, তুমি এত উচ্ছল মানুষ! সে যাক গে, আমরা চিকিৎসার জন্য এখনো পাকিস্তানিদের ভিসা অনুমোদন দিই। আমি ব্যক্তিগতভাবে তোমাকে একজন মানসিক রোগের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাব।’

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563363989504.jpg
ইংলিশ ক্রিকেটার মঈন আলীর আত্মজীবনী ‘মঈন’ ◢



এরকমই বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল ২০১৮-তে প্রকাশিত ইংলিশ ক্রিকেটার মঈন আলীর আত্মজীবনী ‘মঈন’। এতে তিনি অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। মঈন জানিয়েছেন ২০১৫ অ্যাশেজ সিরিজ চলাকালীন এক অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটার তাঁকে ‘ওসামা’ বলে ডেকেছিলেন। ৩১ বছর বয়সী ইংরেজ অরাউন্ডার জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে হওয়া ওই অ্যাশেজ সিরিজ তাঁর জন্য খুবই ভালো গিয়েছিল। কিন্তু তাঁকে ওই সিরিজে অত্যন্ত রাগিয়ে দিয়েছিল একটি দুঃখজনক ঘটনা। ক্রিকেট মাঠে তিনি কোনোদিন অতটা রেগে যাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। কার্ডিফে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম টেস্টে আট নম্বরে নেমে ব্যাটে গুরুত্বপূর্ণ ৭৭ রান যোগ করেছিলেন। সেই সঙ্গে বল হাতে তুলে নিয়েছিলেন ৫টি উইকেট। কিন্তু মঈনের দাবি, ওই ম্যাচেই তাঁকে ‘ওসামা বিন লাদেন’-এর সাথে তুলনা করে ‘ওসামা’ নামে ডেকেছিলেন এক অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটার। শুনে চোখ-মুখ লাল হয়ে গিয়েছিল তার। পরে তিনি দলের কয়েকজনকে বিষয়টা জানিয়েওছিলেন। সেই কথা পৌঁছেছিল ইংল্যান্ডের কোচ ট্রেভর বেলিসের কানেও। বেলিস তা জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয় কোচ ডারেল লেম্যানকে।
লেম্যান ওই অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটারকে ডেকে ওই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছিলেন। কিন্তু সে নাকি তখন তা অস্বীকার করে জানিয়েছিল, ‘ওসামা’ নয়, মঈনকে মাঠে তিনি ‘পার্টটাইমার’ বলেছিলেন। কিন্তু মঈন বলেন, ‘পার্টটাইমার’ আর ‘ওসামা’ এই কথাদুটি এতটাই আলাদা যে গুলিয়ে যাওয়াটা অসম্ভব।

ঠিক তেমনি, অনেক রকম বিতর্ক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল ইয়ান বোথাম, সুনীল গাভাস্কার থেকে শুরু করে অল্প ক’ বছর হলো সাবেক হওয়া শোয়েব আখতার ও অ্যাডাম গিলক্রিস্টের আত্মজীবনীও। তবে আত্মজীবনী বা জীবনীগ্রন্থগুলো শুধু যে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দেয়, তা নয়। এখানে উঠে আসে অনেক সুন্দর ও চমকপ্রদ তথ্য, যা না ইতোপূর্বে কখনো কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, আর না ক্রিকেটার নিজের মুখে বলেছেন।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563364046993.jpg
সৌরভ গাঙ্গুলির আত্মজীবনী ‘আ সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ’ ◢

 

যেমন, ‘আ সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ’ বইতে সৌরভ তুলে ধরেছিলেন এক মজার তথ্য। তখনও ভারতের অধিনায়কত্ব করছিলেন সৌরভ। সেসময় দুর্গাপুজোর সময়ে ঠাকুর দেখতে গিয়ে সর্দার সাজতে হয়েছিল তাকে। মেকআপ আর্টিস্টকে বাড়িতে ডেকে ভদ্রস্থ ও বিশ্বাসযোগ্য লুক তৈরি করা হয়। পরে রাস্তায় বেরিয়ে বাবুঘাটে আসতেই পুলিশ আধিকারিক চিনে ফেলেন সৌরভকে। তবে তাঁর অনুরোধে বিষয়টি গোপনই রাখেন ওই পুলিশ।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/17/1563364106152.jpg
ভিভিএস লক্ষ্মণের আত্মজীবনী ‘টুএইটিওয়ান অ্যান্ড বিয়ন্ড’ ◢



তেমনি, ‘টুএইটিওয়ান অ্যান্ড বিয়ন্ড’ বইতে ভারতের সাবেক সফল টেস্ট ব্যাটসম্যান ভিভিএস লক্ষণ তুলে ধরেছেন ব্যতিক্রমী এক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। সালটা ছিল ২০০৮। ভারত সফরে এসেছিল অস্ট্রেলিয়া। দিল্লিতে সিরিজের তৃতীয় টেস্টই ছিল লক্ষ্মণের শততম টেস্ট ম্যাচ। লক্ষ্মণ তাঁর বইতে জানিয়েছেন সেই টেস্ট শেষ হওয়ার পরই স্টেডিয়াম থেকে হোটেল পর্যন্ত ভারতীয় দলের টিমবাস চালিয়েছিলেন ধোনি। লক্ষ্মণ লিখেছেন, ধোনিকে বাস চালাতে দেখেও তাঁর ঘটনাটা সত্যি বলে বিশ্বাস হচ্ছিল না। কারণ তখন তিনি ভারতীয় দলের ক্যাপ্টেন। অধিনায়ক টিম-বাস চালাচ্ছেন, এরকম ভাবনাটাই তার আগে কখনো কারো মাথায় আসেনি বলে জানিয়েছেন লক্ষ্মণ। তবে, লক্ষণ মনে করেন, ধোনি এরকমই। কে কী মনে করল, পাত্তা দেয় না। করে যায় নিজের কাজটাই!

ক্রিকেটারদের জীবনী বা আত্মজীবনী শুধু একজন ক্রিকেটারের জীবন নিয়েই নয়, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে একটি দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের কোনো একসময়ের দর্পণ। তা পড়ে বোঝা যায়, ওই দেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি ও অবকাঠামোর অবস্থাও। তাই এধরনের একেকটা বই আক্ষরিক অর্থেই ‘ক্রিকেট জ্ঞানের আধার’। আর সৃষ্টিশীলতার দিক থেকে বা সৃষ্টিশীল কাজ হিসেবেই কি ক্রিকেটারদের আত্মজীবনী বা জীবনীমূলক বইগুলো পিছিয়ে আছে? স্রেফ সেই সাত দশক আগে জিম লেকারের ‘স্পিনিং রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ অথবা সাম্প্রতিক অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ‘ট্রু কালারস’ ও সৌরভ গাঙ্গুলির ‘আ সেঞ্চুরি ইজ নট এনাফ’ বইগুলোর নামগুলোর দিকেই খেয়াল করুন না! বই পড়েন এবং ক্রিকেট সম্পর্কে ধারণা রাখেন, এমন সব মানুষের নজর সহজেই কেড়ে নেয় এই সৃষ্টিশীল নামগুলো। আর ভেতরের লেখার উপাদানও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিক করা হয় অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বা অন্যান্য লেখকদের সাহায্য নিয়ে। তাই তো, শিল্পকর্ম হিসেবে সেগুলো ভালোই আকর্ষণ করে রস-অনুসন্ধানী ক্রিকেটামোদী পাঠকদের।

এই জীবনীগ্রন্থগুলো দারুণ সহায়ক ও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে আগামীদিনের ক্রিকেটারদের জন্য। দুঃসময় ও স্বাস্থ্যগত মহাসংকটকে অতিক্রম করে কিভাবে ক্রিকেটে ফেরা ও টিকে থাকা যায়, তা তারা জানতে পারবে মাশরাফি বিন মুর্তজা ও যুবরাজ সিংয়ের মতো ক্রিকেটারের জীবনী বা আত্মজীবনী পড়েই।

উল্লেখ করতে হচ্ছে, বাংলাদেশের জীবন্ত কিংবদন্তি ক্রিকেটার এবং জাতীয় দলের বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার জীবনীগ্রন্থ ‘মাশরাফি’র কথা। বইয়ে লেখক দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের সাথে এক সাক্ষাৎকারে সত্যিকার বীর কারা, সেই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘হ্যাঁ, সব সময় বলি, বীর হলেন মুক্তিযোদ্ধারা। আরে ভাই, তারা জীবন দিয়েছেন। জীবন যাবে জেনেই ফ্রন্টে গেছেন দেশের জন্য। আমরা কী করি? খুব বাজেভাবে বলি—টাকা নেই, পারফর্ম করি। অভিনেতা, গায়কের মতো আমরাও পারফর্মিং আর্ট করি। এরচেয়ে এক ইঞ্চি বেশিও কিছু না। মুক্তিযোদ্ধারা গুলির সামনে এইজন্য দাঁড়ায় নাই যে জিতলে টাকা পাবে। কাদের সঙ্গে কাদের তুলনা রে! ক্রিকেটে বীর কেউ থেকে থাকলে রকিবুল হাসান, শহীদ জুয়েলরা। রকিবুল ভাই ব্যাটে জয় বাংলা লিখে খেলতে নেমেছিলেন, অনেক বড় কাজ। তার চেয়েও বড় কাজ, বাবার বন্দুক নিয়ে ফ্রন্টে চলে গিয়েছিলেন। শহীদ জুয়েল ক্রিকেট রেখে ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দিয়েছিলেন। এটাই হলো বীরত্ব। ফাস্ট বোলিং সামলানার মধ্যে রোমান্টিসিজম আছে, ডিউটি আছে; বীরত্ব নেই।’

একজন ক্রিকেটার হয়েও মাশরাফির জীবনবোধ যে অসাধারণ, অনন্য যে তার দেশপ্রেম, এই বিষয়টাই তো ফুটে উঠেছে মাশরাফির কথনে! ক্রিকেটারাও যে মানুষ, মানুষ হিসেবে তাদের অনেকেরই যে চমৎকার জীবনদর্শন রয়েছে, রয়েছে সুন্দর কিছু চিন্তা, সেসব এভাবেই অনেক সময় প্রকাশিত হয় তাঁদের জীবনী বা আত্মজীবনীতে। তাই তো, এসব বই ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে আসে ভক্তদের আরো কাছে। বইগুলোর মাহাত্ম্য এখানেই!

 

আরো পড়ুন
সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ফাইনালের সাক্ষী লর্ডস

আপনার মতামত লিখুন :

ব্যর্থতা এড়িয়ে চলার কৌশল

ব্যর্থতা এড়িয়ে চলার কৌশল
ছবি : সংগৃহীত

পৃথিবী চষে এমন একজন মানুষও পাওয়া যাবে না যে জীবনে সফল হতে চায় না। মানুষ আমৃত্যু ছুটতে থাকে সফলতার পেছনে। অধরা সফলতা ধরা দেয় না। দিনের শেষে পেছনে ফিরে তাকালে সবটা জুড়েই শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া কিচ্ছুটি দেখা যায় না। মনে পড়ে একটা নির্দিষ্ট সময়ে করা একটা ভুল কাজের কথা, একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের কথা। কিন্তু পেরিয়ে আসা সেইসময় আর নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনা যায় না। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কিংবা আবেগের বশে করা ভুলগুলো শোধরানোর তেমন কোনো উপায় থাকে না তখন।

তাই সচেতন হতে হয় সময় থাকতে। অল্প কিছু বিষয় খেয়াল করে চলতে পারলে হতাশা কাটিয়ে অর্জন করা যায় সফলতা, অন্তত এড়ানো যায় বড় ধরনের ব্যর্থতা—

সিদ্ধান্ত গ্রহণে হোন সতর্ক নিন বিশেষজ্ঞ-পরামর্শ

মানুষের জীবনের যে কোনো একটি সিদ্ধান্ত তার জীবন বদলে দিতে পারে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে হতে হবে সতর্ক। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নির্দিষ্ট বিষয়ে জানাশোনা আছে এমন কারো সাথে করতে হবে পরামর্শ। ভরসা করা যায় এমন মানুষদের কাছ থেকে নিতে হবে দিকনির্দেশনা। তারপর বিকল্পগুলো থেকে সম্ভাব্য উত্তম বিকল্পকে গ্রহণ করা। এতে করে ভুল সিদ্ধান্তের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। তবে যাদের থেকে পরামর্শ নেওয়া হবে তাদের ব্যাপারেও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

ইতিবাচক মানুষদের সাথে মিশুন

চারপাশ যদি নেতিবাচক মানুষদের দ্বারা পরিপূর্ণ থাকে তাহলে আপনার মধ্যেও সেই প্রভাব সংক্রমিত হবে। একসময় নিজেও আপনি হতাশায় নিমজ্জিত হবেন। তাই নিজেকে চাঙ্গা রাখতে সবসময় ইতিবাচক মানসিকতা সম্পন্ন মানুষদের সাথে চলাফেরা করুন।

আজকের কাজ আজকেই করাকে নিয়ম মানুন

মানুষ স্বভাবতই কাজ করতে চায় কম, পেতে চায় বেশি ফল। আর এটাই ডেকে আনে সমস্যা। কাজকে ফেলে রাখে কাল করব পরশু করব ভেবে। কিন্তু সেই কাল-পরশু আর আসে না। তাই এই ক্ষেত্রে নিয়ে আসা উচিত বড় একটা পরিবর্তন। আর এই পরিবর্তনের শুরু হওয়া উচিত নিজের ঘর থেকে। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে নিজের এলোমেলো বিছানা ঠিক করুন সবার আগে। একটু পরে করবেন মনে করে ফেলে রাখবেন না। নিজের জীবন গোছানোর কাজ শুরু করুন নিজের বিছানা থেকে। চাকরির জন্য সিভিটা আপডেট করা দরকার? এখনই করুন। কাল কাল করে করে ডেট চলে গেলে আর আপডেট করেইবা কী করবেন?

নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হোন

যে যত বেশি দায়িত্ববান, সে তত বেশি সফল। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার কাজ আপনাকেই করতে হবে। আপনার কাজ আপনার জন্য অন্য কেউ এসে করে দিয়ে যাবে না। হতে হবে সময়সচেতন। ব্যক্তিচরিত্র থেকে খামখেয়ালি কমিয়ে আনতে হবে। নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তবেই ধরা দেবে অধরা সফলতা।

দুশ্চিন্তার কারণগুলো এড়িয়ে চলুন

মানুষ যখন হতাশায় থাকে, চোখের সামনে কোনো পথ খোলা নেই, তখন ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অশুভ আশঙ্কার ছায়া দেখতে পায়। মূলত নিরুপায়বোধ ও অসহায়ত্ব থেকেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা আর ছাড়িয়ে যায় মাত্রা। দুশ্চিন্তা বেশি হলে অনেকে ভালোমন্দের জ্ঞান হারান। কী করবেন, কী করবনে না বুঝে উঠতে পারেন না। অনেকে নিজেকে তিলে তিলে অসুস্থ করে তোলেন এই দুশ্চিন্তার মাধ্যমে। এরফলে সমাধানের বদলে জড়িয়ে পড়েন আরো বড় সমস্যায়। তাই কোনো কাজে ব্যর্থ হলেও সেই ব্যর্থতা পুরোপুরি গ্রাস করার আগেই নিজেকে আবার কাজে লাগিয়ে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যর্থতা মানুষের জীবনে থাকেই। পৃথিবীতে যত সফল মানুষ দেখা যায় প্রত্যেকেই নিজেদের সফল করেছেন ব্যর্থতা থেকে টেনে তুলে। নিজেকে শান্ত রেখে সমস্যা না বাড়িয়ে উপায় বের করার কাজে লেগে যেতে হবে। তবেই দুশ্চিন্তা পালাবে জাদুঘরে।

অবান্তর কল্পনা থেকে বের হয়ে আসুন

আমার এক বন্ধু আছে। যে সবসময় এটা ভাবত—এই যে বিল গেটস কিংবা জাকারবার্গ, এরা এত টাকার মালিক, কেউ যদি তাকে দুই তিন কোটি টাকা দিয়ে দেয় তবে তো তাদের কোনো সমস্যা হবার কথা না। এই কল্পিত ধারণা তাকে কোনো কাজেই মনোনিবেশ করতে দিত না। সাবধান থাকবেন, কল্পনার এমন জগত আপনার জন্য কোনোদিনই কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। রূপকথার কোনো আলাদীন এসে আপনার ইচ্ছা পূরণ করে দেবে না। তাই ক্ষতিকর কল্পনার জগত থেকে বের হয়ে নিজের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে নিজেরই বাস্তবতায়।

রাগা বারণ

কারো কারো ক্ষেত্রে এমন হয় যে, পান থেকে চুন খসলেই রাগ উঠে যায়। হয়তো বন্ধুবান্ধবরা মিলে কোথাও ট্যুর প্ল্যান করছেন, হুট করে সামান্য বিষয়ে রাগ করে নিজেকে ট্যুর থেকে প্রত্যাহার করে নিল। আবার কেউ আছে যাদের কোনো কিছুই পছন্দ হয় না। কক্সবাজার যেতে চায় না যেহেতু সেখানে তো শুধু পানি, পানি দেখার কী আছে। বান্দরবান যেতে যেতে চায় না কারণ সেখানেও তো শুধু পাহাড়। উঠতে বসতে এমন রেগে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। কারণ রাগত আপনি অন্যকে যে কথাগুলো বলেন তার ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একে তো নিয়ন্ত্রণশূন্য এক নিজেকে প্রদর্শন করা হয় এতে, তার-ওপর হয়তো আপনার জীবনে সেই ব্যক্তির প্রয়োজন দেখা দেবে একদিন। কিন্তু সেদিন তো তারই মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সময়। রাগের ব্যাপারে সচেতন না হলে ধরে নিন আপনি ব্যর্থ হতে যাচ্ছেন।

রোমান পোলান্‌স্কি : সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডালের মোক্ষম উদাহরণ

রোমান পোলান্‌স্কি : সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডালের মোক্ষম উদাহরণ
রোমান পোলান্‌স্কি

মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্পের প্রাণভোমরা হলিউডের জন্য হলেও বিশ্বের অন্যতম রোমাঞ্চকর গল্পের নগরী হিসেবে লস এঞ্জেলসকে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু ’৭০-এর দশকের এই শহর ছিল সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডাল দ্বারা অন্ধকারাচ্ছন্ন। যৌন বিকারগ্রস্ততা, মাদকাসক্তি প্রভৃতি ছিল হলিউড পাড়ার পরতে পরতে।

রোমান পোলান্‌স্কি তেমনই একজন সেলিব্রেটি যার ঝুলি নানাবিধ স্ক্যান্ডালে পরিপূর্ণ। তিনি একাধারে সফল একজন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, এমনকি লেখক। তবে আজ তিনি পৃথিবীবাসির কাছে একজন চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেই সমধিক পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত। বহুমুখী প্রতিভাধর এই প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক তার এই এক জীবনে কুড়িয়েছেন অসংখ্য সুখ্যাতি, জীবন তাকে দু হাত ভরে দিয়েছে এবং তিনিও দু হাত পেতে সেসব গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার জীবনের এই আলোয় ঝলমলে অধ্যায়ের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে এক ভয়ংকর কালো অধ্যায়। আর সেই কালো অধ্যায়ের সূত্র ধরেই বলায় যায়, রোমান পোলান্‌স্কির জীবনই হলো ‘সেলিব্রেটি স্ক্যান্ডাল’-এর মোক্ষম উদাহরণ।

এই বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ১৯৩৩ সালের ১৮ আগস্ট ফ্রান্সের প্যারিস শহরে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু তার বেড়ে ওঠা পোল্যান্ডে। মা বুলা (জন্মনাম কাৎজ-প্রৎজেবর্স্কা) এবং বাবা রিসজার্ড পোলান্‌স্কি ছিলেন যথাক্রমে চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর্য নির্মাতা। পোলান্‌স্কির বাবা ইহুদি এবং পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। পোলান্‌স্কির মা রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং রোমান ক্যাথলিক হিসেবে বেড়ে ওঠেন, তিনি মূলত অর্ধ-ইহুদি বংশধর ছিলেন। 

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144369603.jpg
◤ পোলান্‌স্কির বিখ্যাত চলচ্চিত্র দ্য পিয়ানিস্ট ◢


পোলান্‌স্কি পোল্যান্ডের তৃতীয় বৃহত্তম শহর উচের ন্যাশনাল ফিল্ম স্কুলে পড়াশোনা করেন। তাঁর চলচ্চিত্রে পদার্পণ একজন অভিনেতা হিসেবে। ১৯৫০-এর দশকে আন্দ্রজেয় ভায়দার ‘পোকোলনি’ (প্রজন্ম, ১৯৫৪) এবং একই বছর সিলিক স্টার্নফেল্ডের ‘জাকজারোয়ানি রোভার’ (জাদুকরী বাইসাইকেল) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যদিয়ে অভিনেতা পোলান্‌স্কির অভিষেক ঘটে।

চলচ্চিত্র পরিচালনায় পোলান্‌স্কির অভিষেক হয় ১৯৫৫ সালে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘রোভার’ (সাইকেল) নির্মাণের মধ্যদিয়ে। রোভার একটি আধা-আত্মজীবনীমূলক চলচ্চিত্র এবং এখানেও পোলান্‌স্কি অভিনয় করেন।

রোভারে তিনি তার বাস্তব জীবনের একটি সহিংস চক্রের কথা উল্লেখ করেছেন। যেখানে দেখানো হয়েছে এক কুখ্যাত ক্রাকো ফেলোন ইয়ানুশ ডিজুবা, পোলান্‌স্কির সাইকেল বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল; কিন্তু পরিবর্তে ডিজুবা তাকে মারধর করে এবং তার টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। বাস্তব জীবনে পোলান্স্কির মাথার খুলি ফাটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় সে গ্রেফতার হয় এবং আরো আটটি অপরাধের মধ্যে তিনটি হত্যার জন্য তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। উচে পড়াশোনার সময় আরো বেশ কয়েকটি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি তাকে স্বীকৃতি এনে দেয়, বিশেষ করে ‘ডভায় লুডজি জ শাফাঁ’ (১৯৫৮) এবং ‘গডাই স্পাডায়া আনিওউ’ (১৯৫৯)। তিনি ১৯৫৯ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।

ক্যারিয়ারের সোপানগুলি অবলীলায়, অত্যন্ত সফলতার সাথে ছুঁতে পারলেও তার দাম্পত্য জীবনের যাত্রাটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। অভিনেত্রী বারবারা ল্যাস ছিলেন এই পোলিশ চলচ্চিত্র পরিচালকের প্রথম স্ত্রী। যিনি পোলান্‌স্কির ‘হোয়েন অ্যাঞ্জেলস ফল’ (১৯৫৯) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তারপর এই জুটি ১৯৫৯ সালেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিন্তু ১৯৬১ সালে মাত্র দু বছরের ব্যবধানে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তারপর তিনি আবারও ১৯৬৮ সালের ২০ জানুয়ারি অভিনেত্রী শ্যারন টেইটকে (২৪ জানুয়ারি ১৯৪৩-৯ আগস্ট ১৯৬৯) বিবাহ করেন। শ্যারন টেইটও ছিলেন একজন সুঅভিনেত্রী।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144309583.jpg
◤ অভিনেত্রী ও প্রথম স্ত্রী বারবারা ল্যাসের সঙ্গে পোলান্‌স্কি ◢


কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রোমান পোলান্‌স্কির ক্যারিয়ার যখন খ্যাতির তুঙ্গে, ১৯৬৯ সালে সাড়ে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী অভিনেত্রী শ্যারন টেইটকে মাত্র ২৬ বছর বয়সে চার্লস ম্যানসনের অনুসারীরা হত্যা করে। স্ত্রীকে হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েন এই উঠতি চলচ্চিত্র পরিচালক। পরবর্তীকালে দীর্ঘ এক বিরতির পর ১৯৮৯ সালে ইম্যানুয়েল সিনার সাথে তৃতীয়বারের মতো বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি একজন ফরাসি অভিনেত্রী।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144429916.jpg
◤ অভিনেত্রী ও দ্বিতীয় স্ত্রী শ্যারন টেইটের সাথে পোলান্‌স্কি ◢


১৯৭৭ সালে রোমান পোলান্স্কি মাত্র ১৩ বছর বয়সী কিশোরী সামান্থা গেইমে’র সাথে যৌন সংসর্গে জড়িয়ে পড়েন, যখন তার বয়স ৪৩ বছর। ১০ মার্চ সামান্থার মা সুসানের তৎপরতায় পোলান্স্কিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। পোলান্স্কি জনসম্মুখে অপরাধ স্বীকার করেন এবং ইউরোপে পালিয়ে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরলে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে, এজন্য তিনি আর ফেরত আসেননি এবং ইউরোপ থেকেই চলচ্চিত্র পরিচালনা অব্যাহত রাখেন।

তবে শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্য যে, সামান্থার সাথে আজও রোমান পোলান্‌স্কির যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ আছে। জানা যায়, পোলান্‌স্কি ইউরোপে পালিয়ে যাওয়ায় সামান্থা খুশিই হয়েছেন এবং তিনি তাকে ক্ষমাও করে দিয়েছেন। কারণ তিনি চান না পোলান্‌স্কির বাকি জীবন জেলে কাটুক। এদিকে রহস্যজনকভাবে সামান্থা পোলান্‌স্কিকে ধর্ষক কিংবা যৌননিপীড়ক কিংবা শিশুকামী হিসেবে চিহ্নিত করতে নারাজ। সামান্থার ভাষ্যমতে, “আমি কখনোই তাকে পেডোফাইল বলব না। আমি যেটা বলতে পারি তা হলো, তিনি নিতান্তই ভুলবশত চরমতম খারাপ একটা কাজ করে ফেলেছেন। এবং, আমি তাকে তখনই পেডোফাইল হিসেবে চিহ্নিত করতে পারতাম, যদি তিনি তার পরবর্তী জীবনেও এই একই ধরনের কাজ অব্যাহত রাখতেন।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/18/1566144560460.jpg
◤ সামান্থা গেইম ◢


তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই সুইজারল্যান্ডে থাকাকালীন রোমান পোলান্‌স্কিকে গ্রেফতার করা হয় এবং এই গ্রেফতার নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম হয়। রোমান পোলান্‌স্কির পক্ষে হলিউডের অসংখ্য নামজাদা সেলিব্রেটি, ইউরোপের শিল্পীগোষ্ঠী, এমনকি রাজনীতিকরা সমবেত হয়। তারা এই গ্রেফতারি পরোয়ানার বিরুদ্ধে কথা বলে। এদিকে তার গ্রেফতারের ঘটনার পর আমেরিকার জনমত পোলান্‌স্কির বিপক্ষে গেলেও ইউরোপ এবং পোল্যান্ডের অগনিত মানুষ ছিল তার পক্ষে। আর এভাবেই এ-যাত্রায়ও আইনের বেড়াজাল থেকে পার পেয়ে যান রোমান পোলান্‌স্কি।

রোমান পোলানস্কি পরিচালিত চলচ্চিত্রসমূহ
• জ উ ভজি (১৯৬২)
• রিপালসন (১৯৬৫)
• কুল-দে-সাক (১৯৬৬)
• দ্য ফিয়ারলেস ভ্যাম্পায়ার কিলার্স (১৯৬৭)
• রোজামারিস বেবি (১৯৬৮)
• ম্যাকবেথ (১৯৭১)
• হোয়াট? (১৯৭২)
• চায়নাটাউন (১৯৭৪)
• লা লোকাতায়ার (১৯৭৬)
• তেস (১৯৭৬)
• পাইরেটস (১৯৮৬)
• ফ্র্যান্টিক (১৯৮৬)
• বিটার মুন (১৯৯২)
• ডেথ অ্যান্ড দ্য মেইডেন (১৯৯৪)
• দ্য নাইন্থ গেট (১৯৯২)
• দ্য পিয়ানিস্ট (২০০২)
• অলিভার টুইস্ট (২০০৫)
• দ্য ঘোস্ট রাইটার (২০১০)
• কার্নেজ (২০১১)
• লা ভেনাস অ লা ফরুর (২০১৩)
• দাপ্রেস উন হিস্তোয়ার ভ্রাই (২০১৭)

পোলান্‌স্কি পরিচালিত ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ চলচ্চিত্রটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং এটিই কেবল একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে। পোল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের যৌথ প্রযোজনায় নির্মীত এই দ্য পিয়ানিস্ট ২০০২ সালে মুক্তি পেয়েছিল।

পোল্যান্ডের এক ইহুদি পিয়ানো বাদকের ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ নামের আত্মজীবনী গ্রন্থ থেকে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে। দ্য পিয়ানিস্ট কান চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা ছবির পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া তিনটি ক্ষেত্রে একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে : সেরা অভিনেতা, সেরা পরিচালক এবং সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্য। এছাড়া ফ্রান্সের সেজার পুরস্কার লাভ করে তিনটি ক্ষেত্রে : সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেতা ও সেরা চলচ্চিত্র। এই ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যাড্রিয়েন ব্রডি। অ্যাড্রিয়েন ব্রডিই একমাত্র মার্কিন চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি ফ্রান্সের সেজার পুরস্কার জিতেছেন।

রোমান পোলান্‌স্কি শৈশবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিজ চোখে অবলোকন করেছিলেন, হয়তো সেজন্যই তার দ্য পিয়ানিস্টের নির্মাণশৈলি ছিল এত বেশি জীবন্ত। কাল পরিক্রমায় বিশ্ব রোমান পোলান্‌স্কিকে ভুলে যেতে পারে, কিন্তু দ্য পিয়ানিস্টকে কখনো ভুলতে পারবে না।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র