Barta24

রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯, ১০ ভাদ্র ১৪২৬

English

এস এম সুলতান : আবহমান বাংলার বৈশ্বিক ভবঘুরে

এস এম সুলতান : আবহমান বাংলার বৈশ্বিক ভবঘুরে
নড়াইলে নিজ বাড়িতে ছবি আঁকছেন সুলতান
মরিয়ম সুলতানা
কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট


  • Font increase
  • Font Decrease

তিনি ছিলেন এক আশ্চর্য চিত্রকর, তাঁর তুলির আঁচড়ে ফুটে উঠত আবহমান বাংলার প্রতিচ্ছবি। যার সমগ্র জীবন ও যাপনে ছিল এক আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া। যার ছিল নিজস্ব ধরন, গড়ন এবং দর্শন। যার চিন্তার জগতের পুরোটুকু জুড়ে ছিল গ্রামীণবাংলা এবং বাংলার দরিদ্র ও নিপীড়িত কৃষক সমাজ। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন আমাদের লাল মিয়া। যার ভালো নাম, শেখ মোহাম্মদ সুলতান। পরবর্তীতকালে যিনি শিল্পী এস এম সুলতান নামে বিশ্ব দরবারে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাসিমদিয়ায় এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে সুলতানের জন্ম। বাবা শেখ মোহাম্মদ মেসের আলীর মূল পেশা কৃষিকাজ হলেও, বাড়তি রোজগারের জন্য তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজও করতেন। সামর্থ্য ছিল না, তবুও ১৯২৮ সালে বাবা মেসের আলী তাঁকে নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করান। কিন্তু স্কুলের বাঁধাধরা গণ্ডিবদ্ধ জীবন তাঁর ভালো লাগেনি। ক্লাস ছেড়ে তিনি চলে যেতেন তাঁর প্রিয় চিত্রা নদীর পাড়ে, ব্যস্ত হয়ে পড়তেন আঁকাআঁকিতে। ক্লাসে থাকাকালীনও তিনি একই কাজ করতেন। স্কুলের শিক্ষক রঙ্গলাল ব্যাপারটি সর্বপ্রথম খেয়াল করেন, টের পেলেন সুলতানের ভেতরে বাস করছে এক অদম্য শিল্পীসত্তা। তিনি সুলতানকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে যান এবং তাঁকে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে শিক্ষাদান করেন।

রঙ্গলালের মেয়ে অরোরার সাথে সুলতানের প্রেম হয়ে যায়। যদিও রঙ্গলাল তাদের সে সম্পর্ক মেনে নেননি। উপরন্তু অরোরার বিয়ে দিয়ে দেন। অরোরার বিয়ে হয়ে গেলে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন এবং সাথে করে নিয়ে আসেন অরোরার নিজ হাতে বানানো কাঁথা। এ পর্যায়ে মাত্র ৫ বছর স্কুলে অধ্যয়নের পর স্কুল ছেড়ে বাড়ি ফিরে আসার পর তিনি বাবার সহকারী হিসেবে রাজমিস্ত্রীর কাজে যোগ দেন। এসময় বাবার বানানো বিভিন্ন ঘর বাড়ির নকশা দেখে তিনি প্রভাবিত হন এবং তিনি রাজমিস্ত্রীর কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছবি আঁকা শুরু করেন। বলা যায় তাঁর ছবি আঁকার হাতেখড়ি বাবার কাছ থেকেই।

সুলতানের বাল্যবয়সের চরিত্র-গঠন সম্বন্ধে আহমদ ছফা লিখেছেন—
“কোনো কোনো মানুষ জন্মায়, জন্মের সীমানা যাদের ধরে রাখতে পারে না। অথচ যাদের সবাইকে ক্ষণজন্মাও বলা যাবে না। এরকম অদ্ভুত প্রকৃতির শিশু অনেক জন্মগ্রহণ করে জগতে, জন্মের বন্ধন ছিন্ন করার জন্য যাদের রয়েছে এক স্বাভাবিক আকুতি। শেখ মুহাম্মদ সুলতান সে সৌভাগ্যের বরে ভাগ্যবান, আবার সে দুর্ভাগ্যের বরে অভিশপ্তও।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565442027565.png
◤ এস এম সুলতান ও আহমদ ছফা ◢


এদিকে তিনি যখন স্কুলে পড়েন, তখন আশুতোষ মুখার্জির ছেলে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল পরিদর্শনে এলে ১০ বছর বয়সী সুলতান তাঁর একটা পেন্সিল স্কেচ এঁকে তাঁকে তাক লাগিয়ে দেন এবং এই পেন্সিল স্কেচের মধ্যদিয়েই শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে।

সুলতানের ইচ্ছে ছিল ছবি আঁকা শিখবেন, ছবি আঁকা শেখার জন্য কলকাতা যেতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু কলকাতায় পড়তে যাওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি তার পরিবারের কখনোই ছিল না। তখন ১৯৩৮ সালে নড়াইলের জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায় পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতানকে কলকাতা নিয়ে যান। তিনি ধীরেন্দ্রনাথের সহযোগিতায় কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তিপরীক্ষা দেন এবং তাতে প্রথম হন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার অভাবের জন্য তিনি কলেজে ভর্তি হতে পারছিলেন না। এসময় তৎকালীন প্রখ্যাত শিল্পসমালোচক ও কলকাতা আর্ট কলেজের পরিচালনা পরিষদের সদস্য, শিল্পাচার্য শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সুপারিশে ১৯৪১ সালে সুলতান কলকাতা আর্ট কলেজে ভর্তি হন। সোহরাওয়ার্দী সুলতানকে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করতে থাকেন। তার অসাধারণ সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার সুলতানের জন্য সবসময় উন্মুক্ত ছিল। এরপর প্রায় তিন বছর ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের বাসায় থেকে সুলতান লেখাপড়া চালিয়ে যান।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565442496741.jpg
◤ শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এস এম সুলতানের একজন পৃষ্ঠপোষক 


কিন্তু তিন বছর সেখানে পড়াশোনা করার পর সুলতান যখন শেষবর্ষে তখন তিনি আর্ট কলেজ ত্যাগ করে ভারত ভ্রমণে বেড়িয়ে পড়েন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার রীতিনীতি তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। তিনি ছিলেন প্রকৃতিপ্রেমী, তাঁর জন্মই হয়েছিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে বেড়ানোর জন্য। তাই তিনি বারংবার অস্বীকার করেছিলেন বাঁধাধরা, শ্বাসরুদ্ধকর নাগরিক জীবনকে। তিনি বাঁচতে চেয়েছিলেন মাটির কাছে, প্রকৃতির কোলে, মানুষের মাঝে।

কলকাতার নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে ১৯৪৩ সালে তিনি যোগ দেন খাকসার আন্দোলনে। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বেড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে। শহর বন্দরে ঘুরে ঘুরে তিনি তখন ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের ছবি আঁকতেন। সেসব ছবি বিক্রি করে চলত তাঁর জীবন। এরপর তিনি কাশ্মীরে এসে কিছুকাল থিতু হন, বসবাস করতে শুরু করেন সেখানকার এক আদিবাসী দলের সাথে।

কাশ্মীরে থাকাকালীন তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। শিল্পী হিসেবে তিনি তখন কিছুটা পরিচিতিও লাভ করেছিলেন। সে সময় তিনি নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রতিকৃতির ছবি আঁকতেন। সিমলায় কানাডার এক নারী মিসেস হাডসনের সহযোগিতায় ১৯৪৬ সালে তাঁর আঁকা ছবির প্রথম প্রদর্শনী হয়। কিন্তু জাগতিক বিষয়ের প্রতি ছিল তাঁর নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি। তাইতো শিকড় ছড়াবার আগেই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।

তারপর তিনি কাশ্মীর ছেড়ে রওনা হন পাকিস্তানের লাহোর অভিমুখে। ১৯৪৭ সালে সেখানে তাঁর ছবির একক প্রদর্শনী হয়। ১৯৪৮ সালে লাহোর থেকে চলে যান করাচিতে এবং সেখানে তুমুল খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি পাকিস্তানের সরকারি প্রতিনিধি হয়ে আন্তর্জাতিক শিল্পী সম্মেলনে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এক প্রদর্শনীতে পিকাসো, সালভাদর দালির মতো শিল্পীর সাথে প্রদর্শিত হয় তাঁর ছবি। পরবর্তীতে নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও পরে লন্ডনে তাঁর ছবির একক প্রদর্শনী করেন। দেশ বিভাগের পর কিছু দিনের জন্য সুলতান দেশে ফিরলেও এর এক বছর পর ১৯৫১ সালে তিনি করাচি চলে যান। সেখানে এক পারসি স্কুলে দু বছর শিক্ষকতা করেন। সে সময় চুঘতাই ও শাকের আলীর মতো শিল্পীদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়।

এভাবে দেশে বিদেশে প্রায় ২০টি প্রদর্শনী শেষ করে ১৯৫৩ সালে তিনি নড়াইলে ফিরে আসেন এবং শিশুশিক্ষায় মনোনিবেশ করেন। নড়াইলে তিনি নন্দন কানন নামের একটি প্রাইমারি ও একটি হাইস্কুল এবং একটি আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। শিশুদের জন্য কিছু করার আগ্রহ থেকে শেষবয়সে তিনি ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদেরকে শেখাতে হলে আগে তাদের বন্ধু হতে হবে; হয়েছেনও তাই। তিনি শিশুশিক্ষা সম্বন্ধে বলেছেন, তিনি ওদেরকে কিছু শেখান না। শুধু দেখেন, বাংলাদেশের কোন গাছের পাতাটা কেমন, তা আঁকতে যেন শিশুরা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।

জীবন যখন তাঁর হাতের মুঠোয়, খ্যাতি যখন তাঁর পদতলে; তখন তিনি বেছে নেন লোকালয়ের সংশ্রব-বিবর্জিত এক বন্য জীবন, ঠাঁই নেন এক পরিত্যক্ত ভাঙা মন্দিরে। যেটা কোনো মানুষ নয়, সাপ-খোপেদের আখড়া। তাঁর বাড়িতে আরো ছিল হাঁস-মুরগি এবং ২২টি বেড়াল। আশৈশব যাযাবর চিরকুমার এই শিল্পী কোনো সাংসারিক মায়ায় জড়াননি। কিন্তু ১৯৫৩ সালে গ্রামে ফেরার পর ১৯৫৪ সালে এক দরিদ্র হিন্দু পরিবারের সাথে তিনি মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে পড়েন। এক নিম্নবর্ণের বিধবা হিন্দু মহিলা ও ২ বিধবা কন্যা আত্মীয় পরিজনহীন এই শিল্পীকে স্বেচ্ছা নির্বাসিত জীবন থেকে ফিরিয়ে আনেন। তাদের অপরিসীম মমতা তাঁর ভেতর এক দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। তারপর থেকে আমৃত্যু তিনি রয়ে যান এই পরিবারের সঙ্গে।

৫০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে প্রচুর কাজ হয়। সেসময় শিল্পীরা বিভিন্ন কৌশল-রীতি, নিয়ম ও ছবির মাধ্যমসহ নতুন নতুন বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা নিয়ে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি রয়ে যান সকলের অলক্ষ্যে, নড়াইলেই। তিনি দলছুট হয়ে নড়াইলের ওই জীর্ণ ভাঙা ভুতুড়ে বাড়িতে বসে ছবি আঁকতেন নিজের তৈরি করা ক্যানভাস এবং রঙ দিয়ে। তিনি বলেছিলেন, “একটা বিদেশি ক্যানভাসের দাম ৪০০-৬০০ টাকা যা অনেক ব্যয়সাপেক্ষ, কষ্টসাপেক্ষ। ওর চাইতে ভালো পাটের চটে আঁকা।” তাই তিনি পাটের চটকে ক্যানভাস হিসেবে ব্যবহার করতেন। চটকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য জেলেরা তাদের জালে যেমন করে গাবের নির্যাস ব্যবহার করে, তিনিও তাদের মতো করে পাটের চটে গাবের নির্যাস ব্যবহার করতেন।

তাঁর জীবনের মূল সুরটি ছিল গ্রামীণ জীবন, কৃষক ও কৃষিকাজের ছন্দের সঙ্গে বাঁধা। তাঁর প্রেরণার উৎস ছিল এই সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন। তাঁর মতো এত গভীরভবে, নিবিড়ভাবে, সমগ্র জীবন দিয়ে বাংলার কৃষকদেরকে কোনো শিল্পী অনুভব করেছিলেন কিনা; বলা মুশকিল। তাঁর ভাষায়, “আমাদের কৃষকদের জীবণধারণ খুব সাধারণ, তারা অল্পাহারী। তারা খুব কষ্টের মাঝে থেকে ফসল ফলায়। তাদের খুব ভালোভাবে থাকবার কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা হাই স্ট্যান্ডার্ড অব লিভিং নিয়ে ভাবে না। তারা যেন শুধুমাত্র উৎপন্ন করে যাওয়ার ব্রতে ব্রতী।” যারা আমাদের জন্য নিরলসভাবে ফসল ফলায়, তারাই অনাহারে দিন কাটায়; এই নির্মম পরিহাস তিনি যেন মেনে নিতে পারেননি।

তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন আমাদের রাজনৈতিক চক্রব্যুহকেও। আমরা রাজনৈতিক স্বার্থে কৃষকদের দীনতা, অভাব নানাভাবে ওদের সামনে তুলে ধরি। আমরা কৃষকদেরকে মোটা ভাত, মোটা কাপড় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিই। আমরা তাদের ছেলেমেয়েদেরকে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলি। কিন্তু শিল্পী মনে করেন, “এসব আমরা আমাদের লিবারেশনের পূর্বেও বলেছি, এখনো বলছি। তাতে ওদের কিছু এসে যায় না। কে ওদের ভালো করবে, ভালো রাখবে, এসবে কোনো উৎসাহ নেই ওদের।”

তিনি তাঁর ছবিতে নারী ও পুরুষকে সমানভাবে দেখিয়েছেন। সে হোক ঘরে কিংবা বাইরে। তিনি কৃষক পুরুষকে দিয়েছেন পেশিবহুল ও বলশালী দেহ এবং কৃষক রমণীকে দিয়েছেন সুঠাম ও সুডৌল গড়ন, দিয়েছেন লাবণ্য ও শক্তি। আপাত দৃষ্টিতে দুর্বল দেহী, মৃয়মাণ ও শোষণের শিকার কৃষকদেরকে তিনি দেখতেন শক্তিশালী ও স্বাস্থ্যবান কৃষক সমাজ হিসেবে। তাঁর আঁকা ছবি ছিল প্রাণশক্তিতে ভরপুর। কারণ বাংলার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষক।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565443247651.jpg
◤ সুলতানের পেশিবহুল কৃষকেরা ◢


কৃষকদের এমন বলশালী পেশি আঁকা সম্বন্ধে তিনি তারেক মাসুদের আদম সুরতে বলেছেন, “অদ্ভুত এক প্রহসন চলছে কৃষকদের নিয়ে। এটা বেশ লাগে ভালো। এদেরকে যত বেশি নীপিড়ন করা হয়, আমি তত বেশি তাদের পেশি বড় করি, মজবুত করি। তোমরা মোটে ভয় পাবে না, তোমরা টিকে থাকবে, তোমরা এ মাটির প্রকৃত অধিকারী। মাটির সাথে সম্পর্ক তোমাদের, ওদের নয় যারা তোমাদেরকে উপহাস করে।”

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/10/1565443303968.jpg
◤ সুলতানের পেশিবহুল কৃষকেরা ◢


তারেক মাসুদ যখন তাঁর কাছে তাঁর ওপর ছবি বানানোর প্রস্তাব নিয়ে যান, তখনও তিনি কৃষকদের কথা ভেবেছেন। বলেছেন, “ছবি নির্মাণ হবে, কিন্তু ছবি আমার ওপর হবে না। হবে বাংলার কৃষকদের ওপর। এখানে আমি ক্যাটালিস্ট, প্রোটাগনিস্ট না।”

তাঁর ৪০ দশকের প্রায় সব কাজ তৈলচিত্র। এই দশকের গোড়ার দিকের কাজে একাধিক অংকনরীতি লক্ষ্যণীয় হলেও শেষের দিকে যখন তিনি কাশ্মীরের আদিবাসীদের সাথে বাস করতে শুরু করেন তখন তাঁর কাজে ভ্যানগগের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৫০ দশকের গোড়ার দিকে তৈলচিত্র থেকে সরে এসে তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে মনোনিবেশ করেন। কখনো চারকোল, কখনো প্যাস্টেল, কখনো কালিকলম আবার কখনো স্প্যাচুলা টেকনিক। ৫০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত অজস্র জলরঙ ছবি তিনি বিরতিহীনভাবে এঁকে যান। তাঁর ছবি আঁকার মূল বিষয় ছিল প্রকৃতি ও তার সৌন্দর্য। পরবর্তীকালে তিনি প্রকৃতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের প্রতি মনোনিবেশ করেন। যেমন পাতা, গাছের শেকড়, মেঘমালা ইত্যাদি।

তাঁর প্রথমদিককার ছবিতে সেভাবে মানুষের উপস্থিতি না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তাঁর ছবির প্রধান উপজীব্য বিষয় হয়ে ওঠে মানুষ। ধীরে ধীরে তিনি গ্রামীণ মানুষের কথা, কৃষকদের কথা বলতে থাকেন তাঁর তুলির মধ্যদিয়ে। কিন্তু ৬০ দশকের শেষের দিকে ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সামাজিক জাগরণ তাঁকে ভীষণভাবে আলোড়িত করে। তারপর আমরা দেখতে পাই ভিন্ন এক সুলতানকে। তাঁর আঁকা হত্যাযজ্ঞ (১৯৮৭) হলো এর অনন্য উদাহরণ।

১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সুলতান সবার আড়ালে থাকলেও সত্তরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর কিছু ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ী তাঁকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ঢাকায় আঁকা তাঁর কিছু ছবি দিয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর পর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। মূলত এ প্রদর্শনীটিই তাঁকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়। এ ছবিগুলিই তাঁকে নিম্নবর্গীয় মানুষের প্রতিনিধি ও তাদের নন্দন চিন্তার রূপকার হিসেবে পরিচিত করে। তাঁর ছবিতে কৃষকই হচ্ছে জীবনের প্রতিনিধি এবং গ্রাম হচ্ছে বিশ্বের কেন্দ্র।

অবয়ব বা আকৃতিধর্মিতাই তাঁর কাজের প্রধান দিক। তিনি আধুনিক ও নিরবয়ব শিল্পের চর্চা করেননি। মডার্ন অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, “জনসাধারণের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নাই। ভাববিলাস ছাড়া এ বিশেষ কিছু না। তারা অ্যাবস্ট্রাক্ট আঁকে, কিন্তু মানুষ তা বুঝতে পারে না। জিজ্ঞেস করে যে এটা কী এঁকেছেন? যদিও এর ডেকরেটিভ ভ্যালু আছে কিন্তু আমার চোখে তা প্রাধান্য না, কারণ সাধারণ মানুষের তা বুঝতে কষ্ট হয়।”

সুলতান নির্দিষ্ট কোনো নিয়মের প্রতি গুরুত্ব দেননি, দিয়েছেন মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিকে। তাঁর ছবিতে কোনো দালান-কোঠা নেই। রয়েছে বাঁশ আর খড়ের ঘর। মজার বিষয় হলো, তাঁর ছবিতে মাটি, খড় এবং মানুষের গায়ের রঙ যেন মিলেমিশে এক হয়ে গিয়েছে। আর্থ কালার অর্থাৎ ব্রাউন কালার ডমিনেট করে তাঁর ছবিতে। তাঁর মতো মাটির কাছাকাছি জীবন তাঁর সময়ে আর কোনো শিল্পী যাপন করেননি। তাঁর অজস্র ছবি রোদে পুড়ে, ঝড় বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেদিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না, এই নির্মোহ কিংবদন্তি যখন যেখানে থেকেছেন কেবল এঁকে গেছেন। জীবন যেখানে ডেকেছে, সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে সেখানে চলে গেছেন।

তিনি যে কতটা উদাসীন ছিলেন তাঁর অনন্য উদাহরণ হলো, তাঁর ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখা গিয়েছে যে তাঁর কোনো কোনো ছবি কারো বেড়া হিসেবে দৃশ্যমান কিংবা চায়ের দোকানের ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুলতান যখন লাউয়ের মাচা আঁকতেন তখন গ্রামের কোনো সাধারণ মানুষ এসে বলত, এটা আমার গাছের লাউ। গরু আঁকলে বলত, এ তো আমার গরু। শহরের মানুষের সপ্রশংস বাণীর থেকে গ্রামের মানুষের এই সহজ সরল মুগ্ধতা ছিল তাঁর কাছে বেশি মূল্যবান।

১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউটে সুলতানের একটি প্রদর্শনী হয়। ৮০’র শেষ দিকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোন-এ তাঁর শেষ প্রদর্শনীটি হয়। সে বছর আগস্ট মাসে ব্যাপক আয়োজন করে তাঁর গ্রামের বাড়িতে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। এর পরপরই ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে এই মহান শিল্পী মৃত্যুবরণ করেন।

শিল্পী এস এম সুলতান তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে বলে গিয়েছেন:
“আমি সুখী। আমার কোনো অভাব নেই। সকল দিক দিয়েই আমি প্রশান্তির মধ্যে দিন কাটাই। আমার সব অভাবেরই পরিসমাপ্তি ঘটেছে।”

তথ্যসূত্র:
১। আদম সুরত (তারেক মাসুদ)
২। উইকিপিডিয়া
৩। বাংলাপিডিয়া

আপনার মতামত লিখুন :

কফি সমাচার

কফি সমাচার
বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা বাণিজ্য শিল্প হলো কফি

কফি নামটা শুনলেই অনেকের মধ্যে চাঙ্গাভাব চলে আসে। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা কিংবা একঘেয়ে ভাব দূর করতে কফির বিকল্প নেই। আর এই কারণেই বিশ্বের দ্বিতীয় সেরা বাণিজ্য শিল্প হলো কফি। জেগে থাকতে হলে কফি চাই এমনই নিয়ম। অনেকের যেমন দিন শুরু হয় না, তেমনি অনেকের রাতজাগাও অসম্পূর্ণ থেকে যায় কফি ছাড়া।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566641523098.jpg
কফি মূলত একটি ফল


কফি মূলত একটি ফল। আমরা যে কফি পান করি, তা কফির বীজ বা বিন, গুঁড়ো করেই তবে তৈরি হয় কফি। ১৫৯৮ খ্রিস্টাব্দে ডাচ koffie শব্দের মাধ্যমে coffee শব্দটি ইংরেজি ভাষায় গৃহীত হয়। এই ডাচ শব্দটি আবার তুর্কি শব্দ kahve থেকে উদ্ভূত; তুর্কি শব্দটি আরবি qahwa শব্দেরই পরিবর্তিত রূপ। এই শব্দান্তরের ভেতরেই লুকিয়ে আছে কফির বিস্ময়কর ইতিহাস।

কফির আবিষ্কার

কফির আবিষ্কার নিয়ে বেশ কিছু মতবাদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গল্পটি একজন মেষ পালককে ঘিরে। নবম শতকে ইথিওপিয়ায় বাস করত খালদি নামের এক দরিদ্র মেষপালক। একদিন খেয়াল করল তার ছাগলগুলো অন্যদিনের চেয়ে আজ একটু বেশি লাফালাফি করছে। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখল লাল জামের মতো একটি ফল খাচ্ছে ছাগলগুলো। ঘটনার বর্ণনাসহ কারণ জানতে ফলগুলো সে নিয়ে যায় মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে। তারপর সেই ইমাম এবং তার ছাত্ররা মিলে এই ফল থেকে তৈরি করে পানীয়, যা আজ কফি হিসেবে পরিচিত।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566641883872.jpg
পাখি কফি খাচ্ছে


অন্য আরেকটি মত অনুযায়ী, কফি মূলত ইয়েমেনে আবিষ্কার হয়। সেখানে ঘোতুল আব্দুল নুরুদ্দীন আবুল আল-হাসান আল-সাদিলি নামে একজন সুফি ছিলেন। তিনি একবার ইথিওপিয়া সফর করতে গেলে একটি পাখিকে লাল রঙের একটি ফল খেতে দেখে কৌতূহলবশত নিজেও তা খেয়ে দেখেন। এরপর আগের সেই গল্পের মতোই তিনিও চাঙ্গা অনুভব করেন এবং আবিষ্কার হয় কফির।

বিক্রির দিক থেকে তেলের পরেই রয়েছে কফি

বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়ে থাকে তেল। আর এরপরই যে বস্তু সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় তা হলো কফি। সারা পৃথিবীতে বছর জুড়ে প্রায় ৫০০ বিলিওন কাপ কফি তৈরি হয়। তবে কফিপানের পরিমাণের দিক থেকে আমেরিকানদের ধারেকাছেও কেউ নেই। আমেরিকানরা গড়ে প্রতিদিন ৪০০ মিলিওন বা ৪০ কোটি কাপ কফি পান করে। বছর শেষে যার পরিমাণ প্রায় ১৪৬ বিলিওন। এরমধ্যে শুধু নিউইয়র্ক শহরে সারা পৃথিবীর তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি কফি পান করা হয়।

পাপের বাহন কফি

কফি আবিষ্কারের পেছনে মুসলমানদের অবদান থাকলেও একটা সময় সৌদি কিংবা মিশরের মতো দেশে ফতোয়া জারি করে কফিপান নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একই পরিস্থিতি দেখা দেয় ইউরোপেও। ইতালির ভেনিসেও পৌঁছে গিয়েছিল কফি। কিন্তু এই কফি মুসলমানদের আবিষ্কার হওয়ার কারণে এবং রেড ওয়াইনের জায়গা গ্রহণ করে ফেলায় কট্টর ক্যাথলিকেরা একে শয়তানের তিক্ত আবিষ্কার বলে মন্তব্য করেন। যদিও পরে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সবখানেই কফি জায়গা করে নেয় সগৌরবে।

সারা বিশ্বে প্রায় ৫০টির মতো দেশ কফি উৎপাদনের সাথে জড়িত। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যুক্ত আছে প্রায় ৫ কোটি মানুষ। আবিষ্কার অন্যত্র হলেও বর্তমানে সারা বিশ্বে মোট উৎপাদিত কফির ৪০ শতাংশ আসে ব্রাজিল থেকে। বিভিন্ন দেশে ও স্থানে কফি উৎপাদিত হলেও আমেরিকার হাওয়াই-এর কফি সবচেয়ে দামি এবং সর্বোৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

কফির প্রকারভেদ

পৃথিবীব্যাপী যত কফি আছে তাকে মূলত দুইভাগে ভাগ করা যায়—এরাবিকা এবং রোবুস্টা। এরাবিকাই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। রোবুস্টা খুব তিতকুটে হওয়ার ফলে এর চাহিদা খুব বেশি নেই।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566642015176.jpg
এরাবিকা এবং রোবুস্টা কফির দুই জাত


তবে পানীয় হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় কফি হলো এসপ্রেসো। “এসপ্রেসো” শব্দের অর্থ আক্ষরিকভাবেই “জোর করে কিছু বের করে দেওয়া!” এটি তৈরি করা হয় ফুটন্ত পানি কফির গুঁড়োর ভেতর দিয়ে চালনা করে। জেনে অবাক হবেন সাধারণ কফির তুলনায় প্রতি একক ঘনত্বে ক্যাফেইন প্রায় তিনগুণ বেশি থাকে এসপ্রেসো কফিতে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566642084888.jpg
ক্যাফেইন প্রায় তিনগুণ বেশি থাকে এসপ্রেসো কফিতে


অন্যদিকে ডিকেইফ নামে একধরনের কফি আছে যেটাকে বলা হয় ক্যাফেইনমুক্ত কফি। এই কফি বানানোর সময় বেশি রোস্ট করা হয় বলে অনেক ক্যাফেইন উড়ে যায়।

দামি কফি

দুনিয়ার অন্যতম দামি কফি—“Kopi Luwak”—এর প্রতি আউন্স বীজের দাম ৬০০ ডলার! অবাক হলেন? এখানেই শেষ না। অবাক হওয়ার এখনো অনেক বাকি। সুমাত্রান নামে এক জাতের জংলি বিড়াল আছে যাদের এই কফির বীজগুলো খাওয়ানো হলেও হজম হয় না।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566642179467.jpg
দামি কফির নেপথ্য নায়ক সুমাত্রান বিড়াল ◢


ফলে আংশিক পরিবর্তিত হয়ে বেরিয়ে আসে বিষ্ঠার সাথে। বলা ভালো সুমাত্রান বিড়ালের বিষ্ঠা থেকে উদ্ধারকৃত বীজগুলো থেকেই তৈরি করা হয় পৃথিবীর অন্যতম দামি কফি “Kopi Luwak”।

রোগ মুক্তি এবং আক্রান্ত হওয়ার বাহন কফি

কফি একই সাথে রোগমুক্তির এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণ হতে পারে। কাউকে মেরে ফেলেতে চাইলে তাকে একাধারে প্রায় ১০০ কাপ কফি খাওয়ালেই চলবে। আবার একই সাথে পরিমিত কফি পান হতে পারে আপনার জন্য আশীর্বাদ। এতে যেমন অবসাদ কাটে তেমনি এতে পাওয়া গেছে নারীদের স্কিন ক্যান্সার প্রতিরোধের উপাদান, আছে ডায়াবেটিস টাইপ ২ এবং বয়ঃবৃদ্ধদের আলঝেইমার রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে সক্ষম নানান উপাদান। কফিপানে হৃদপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পায়। এটি শরীরে উদ্যম ও উৎসাহ তৈরি করে।

জেনে নিন নতুন টাইগার-গুরু রাসেল ডমিঙ্গো সম্পর্কে

জেনে নিন নতুন টাইগার-গুরু রাসেল ডমিঙ্গো সম্পর্কে
বিশ বছর বয়সেই ডমিঙ্গো নিয়েছিলেন কোচিং-দীক্ষা

সদ্য সমাপ্ত ওয়ানডে বিশ্বকাপের ব্যর্থতায় স্টিভ রোডসকে ছাঁটাইয়ের পর যখন বিসিবি নতুন কোচ নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিল, তাতে সাড়া দিয়ে অন্য সবার আগে ঢাকায় এসেছিলেন এক দক্ষিণ আফ্রিকান। সব যাচাই-বাছাই শেষে ৪৪ বছর বয়সী সেই দক্ষিণ আফ্রিকানকেই নিয়োগ দিয়েছে বিসিবি। বলা হচ্ছে বাংলাদেশ দলের নতুন হেড কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর কথা—বাইশ গজে ব্যাট-বলের লড়াই ছেড়ে বিশ বছর বয়সেই যিনি নিয়েছিলেন কোচিং-দীক্ষা।

১৯৭৪ সালে পোর্ট এলিজাবেথে জন্ম নেওয়া ডমিঙ্গোর খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার সীমাবদ্ধ থেকেছে ইস্টার্ন প্রভিন্সের যুবদলের মধ্যেই। সিনিয়র দলে উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ রাসেল মাত্র বাইশ বছর বয়সেই পেয়ে যান প্রথম কোচিং সনদ, আর ২৫ বছর বয়সে সেই ইস্টার্ন প্রভিন্সে ফিরে আসেন যুবদলের কোচ হিসেবে।

জাতীয় দলে কিংবা ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেট খেলার অভিজ্ঞতা ছাড়াই কোচিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকে সুনাম কুড়ানোর ঘটনা বিরলই বটে। হিলটন অ্যাকারম্যানের অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় একাডেমিতে কাজ করা ডমিঙ্গো বাংলাদেশে পা রাখেন ২০০৪ সালে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের সেই আসরে দক্ষিণ আফ্রিকার কোচ হিসেবে কাজ করা রাসেল ডমিঙ্গো ঠিক তার পরের বছর শীর্ষ ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি ওয়ারিয়র্সের হেড কোচ হিসেবে যোগ দেন। তাঁর হাত ধরেই পরবর্তী পাঁচ মৌসুমে প্রায় ৬ জন ক্রিকেটারের ডাক পড়ে জাতীয় দলে। ২০০৯-১০ মৌসুমে ঘরোয়া ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টি টুর্নামেন্টের সিংহাসনে বসার পাশাপাশি টানা দুই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ টি-টুয়েন্টি আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ওয়ারিয়র্স। ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ডমিঙ্গোর ওয়ারিয়র্স অবশ্য ফাইনালে হেরে যায় আইপিএল শিরোপাধারী চেন্নাই সুপার কিংসের কাছে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566632079923.jpg
ডমিঙ্গো বাংলাদেশে প্রথম পা রাখেন ২০০৪ সালে


জাতীয় পর্যায়ে কোচিংয়ের সুযোগ লুফে নিতে কখনো দ্বিধা করেননি। ২০১০ সালে ফের বাংলাদেশ যাত্রায় রাসেল দায়িত্ব পান দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের। এর পরের বছর নিজভূমে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ফিরতি সফরেও একই পদে বহাল থাকা ডমিঙ্গো সে বছরের জুনেই ডাক পান সিনিয়র দলের কোচিং ইউনিটে। হেড কোচ গ্যারি কারস্টেনের সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ডমিঙ্গোকে এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে অবশেষে সহকারীর তকমা ঝেড়ে ফেলেন রাসেল ডমিঙ্গো। টি-টুয়েন্টি দলের হেড কোচ হিসেবে কারস্টেনের স্থলাভিষিক্ত হন নিউজিল্যান্ড সিরিজের ঠিক আগে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, সে সময় শীর্ষ পর্যায়ের ক্রিকেট না খেলে কোনো জাতীয় দলের হেড কোচ হওয়ার কীর্তি এই ডমিঙ্গো আর একই সিরিজের কিউই কোচ মাইক হেসনের ছাড়া ছিল না আর কারোই। বেশ ভালোভাবেই সে দায়িত্ব পালন করতে থাকা ডমিঙ্গোর কোচিং ক্যারিয়ারের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয় ঠিক তার পরের বছরেই। ২০১৩ সালের মে মাসে সব ফরম্যাট থেকে গ্যারি কারস্টেনের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণায় পুরো জাতীয় দলের দায়িত্বই বর্তায় ডমিঙ্গোর কাঁধে।

পরে রাসেলের চুক্তির মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ায় প্রোটিয়া বোর্ড। তাঁর অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকা এরপর ২০১৪ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষ করে সেমিফাইনালে পৌঁছে। ২০১৭ পর্যন্ত হেড কোচের দায়িত্ব পালন করা রাসেল ডমিঙ্গো পরবর্তীতে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করে সাড়া পাননি বোর্ডের। ওটিস গিবসন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলে ডমিঙ্গো আবার ফিরে যান নিজভূমে, ঘরোয়া টি-টুয়েন্টি লিগে প্রিটোরিয়া ম্যাভেরিকসকে নিয়ে কাটান ব্যস্ত সময়। পাশাপাশি বহাল ছিলেন প্রোটিয়াদের ‘এ’ দলের কোচের পদে।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566632115903.jpg
তাঁর অধীনে দক্ষিণ আফ্রিকা টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ওয়ানডে বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছায়


আর দশজন প্রাক্তন ক্রিকেটারের মতো অবসরের পর খেলাটিকে ভিন্ন স্তরে নিয়ে যাবার চেষ্টা নয়, বরং পুরোদস্তুর পেশাদার এক কোচ হবার লক্ষ্য অনুসরণেই নিজেকে গড়েছেন রাসেল ডমিঙ্গো। প্রধান কোচের ভূমিকায় সাধারণত প্রাক্তন খেলোয়াড়দের সাফল্য বিশেষভাবে পরিলক্ষিত বলে তা ডমিঙ্গোর জন্যও সবসময় ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং—“যেহেতু শীর্ষ পর্যায়ে খেলবার কোনো শংসাপত্র আমার নেই, তাই নিশ্চিতভাবেই সেই মর্যাদাটা আমাকে অর্জন করে নিতে হতো। হয়তো এটা এভাবেই হবার কথা, তাই আমাকে সবচেয়ে কঠিন পথটি বেছে নিতে হয়েছিল আর হতে হয়েছিল খেলাটির এক মনোযোগী ছাত্র।”

সৌভাগ্যক্রমে ডমিঙ্গো সে লক্ষ্য অনুসরণে নিজেকে চেনান একেবারে শুরুতেই, আর ২০০০ সালের গোড়ার দিকে অংশ নেন মনোযোগী ছাত্র হবার জন্য আদর্শ এক আয়োজনের। তাঁকে কোচ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রোটিয়া বোর্ডের নেওয়া উদ্যোগে রাসেল শিক্ষানবিশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ড্রেসিংরুমে সময় কাটান বব উলমার ও গ্রাহাম ফোর্ডের সাথে। সেখানে শক্ত বন্ধন গড়েন মাত্র সাতটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলে প্রায় একইরকম আড়ম্বরহীন ক্যারিয়ার কাটানো ফোর্ড ও কারস্টেনের সঙ্গে।

কোচ হিসেবে গ্রাহাম ফোর্ডকে নিজের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মনে করতেন রাসেল। দারুণ জয়ের উদযাপনে বাঁধ দেওয়া কিংবা অপ্রত্যাশিত হারে বিচলিত না হবার দীক্ষা যে তাঁর থেকেই পেয়েছিলেন। যুবদল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সবসময়ই আলাদা রেখেছে অন্য যে কোনো কোচ থেকে। এমনকি ইয়োহান বোথা, রবিন পিটারসনদের মতো তারকাদের নিজ হাতে গড়েছিলেন রাসেল। নিজের অধীনে শুধু পাননি গ্রায়েম স্মিথ আর এবি ডি ভিলিয়ার্সদের।

রাসেল ডমিঙ্গো দক্ষিণ আফ্রিকার খোলনালচে পাল্টে দেবার মিশনে প্রয়োগ করেছিলেন নিজের জীবন থেকে নেওয়া সব শিক্ষা। ব্যাট-বলের লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছাড়াও বিনয় ও পরিণতিবোধের সাহায্যে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব, সেটি প্রমাণেই নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। সেই ধারায় এবার নিয়োগ পেলেন টাইগারদের হেড কোচ হিসেবে। কোচিং ইউনিটে যেখানে সাথে পাচ্ছেন নিল ম্যাকেঞ্জি, শার্ল ল্যাঙ্গাভেল্ট, রায়ান কুকের মতো অভিজ্ঞ স্বদেশীদের।

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/24/1566632201027.jpg
আপাতত দুই বছরের চুক্তিতে বাংলাদেশের কোচ হয়েছেন ডমিঙ্গো


দায়িত্ব পেলে পরের দিনই নেমে পড়বেন কাজে—রাসেলের এমন প্রতিশ্রুতিতে প্যাশনের আঁচ পেয়েছে বিসিবি। বোর্ডকে তেমন কোনো শর্তের বেড়াজালেও ফেলেননি বলেই তালিকার বাকি দুজনকে হটিয়ে রোডস-উত্তর বাংলাদেশ দলের গুরু নিযুক্ত হলেন কদিন বাদেই ৪৫-এ পা রাখতে যাওয়া সদা হাস্যোজ্জ্বল এই অভিজ্ঞ কোচ। শুধু জাতীয় দলই নয়, রাসেলের কর্মপরিকল্পনায় থাকবে ‘এ’ দল, হাইপারফরমেন্স এবং অনূর্ধ্ব-১৯ দলও। আপাতত আগামী বছর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপকে পাখির চোখ করলেও ডমিঙ্গো প্রথম পরীক্ষায় বসছেন আসছে সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠে সিরিজটি দিয়ে।

“উপমহাদেশের ক্রিকেটকে বদলে দিতে নয়, বরং এই ধারার সাথে মানিয়ে বদলে যেতে এসেছি”—রাসেল ডমিঙ্গোর এমন আশাবাদে নতুন যুগে পা রাখতে যাচ্ছে সাকিব-তামিম-মুশফিকরা। জীবনে বহু চরাই-উৎরাই পার করে আসা এই দক্ষিণ আফ্রিকানের নতুন মিশনে রইল শুভকামনা।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র