আমাজন : পৃথিবীর ফুসফুসের আদ্যোপান্ত

আহমেদ দীন রুমি, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
আকাশ থেকে আমাজন

আকাশ থেকে আমাজন

  • Font increase
  • Font Decrease

সাম্প্রতিক সময়ে আমাজনে আগুনের ঘটনা সারা বিশ্বে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবেশ আর মানুষের সম্পর্ককে ভাবতে বাধ্য করেছে আরো একবারের জন্য। ‘প্রকৃতি প্রতিশোধপরায়ণ’—কথাটা যে মিথ্যা না; মানবসভ্যতার অতীতে তার নজির কম নেই। প্রকৃতির সুবিশাল আর বিচিত্র জাদুঘরের নাম আমাজন। আজকের আয়োজনে তাই আমাজনের আদ্যোপান্ত।

আমাজন নদী অববাহিকায় অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম রেইনফরেস্ট। আয়তনের দিক থেকে অববাহিকাটি দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের মূল আয়তনের শতকরা ৪০ অংশ। ব্রাজিল, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ভেনিজুয়েলা, গায়ানা এবং সুরিনাম—মোট আটটি দেশ জুড়ে বিস্তৃত। যদিও এর বাইরে ঘিনিরও সংযুক্তি আছে। পরিবেশের বৈচিত্র্যময়তা আর পূর্ববর্তী সভ্যতার মানুষদের প্রভাবকে প্রতিফলিত করতেই এখানে জন্ম নিয়েছে নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র। মোজাইকের মতো গড়ে উঠেছে রেইনফরেস্ট, মৌসুমী বন, ক্ষণস্থায়ী বা পর্ণমোচী বন, প্লাবন বনভূমি এবং তৃণাঞ্চল।

আমাজন বনের বিস্তৃতি


গোটা অববাহিকায় আমাজন নদীটি জল যাতায়াতের পথ হিসাবে ভূমিকা পালন করে। নীলনদের পরে পৃথিবীর দীর্ঘতম নদী এটি। তার ওপর রয়েছে ১১০০টিরও বেশি উপনদী; যাদের ১৭টির দৈর্ঘ্য ১০০০ মাইলেরও বেশি। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা এই নদীই বনের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে অনেকাংশে। তাই নদী আর বন ঐতিহাসিকভাবে অভিন্ন হয়ে উঠেছে এখানে।

আমাজন অববাহিকা

আমাজন অববাহিকায় বিস্তৃত বনভূমি সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য নিম্নোক্ত ডায়াগ্রামটিকে ব্যবহার করা যেতে পারে।

আমাজনের ইতিবৃত্ত

এক সময় নদীটি প্রবাহিত ছিল আফ্রিকায় পশ্চিম দিকে কঙ্গো নদীর অংশ হিসাবে। তখন মহাদেশ দুটি পরস্পর যুক্ত ছিল গণ্ডোয়ানার অংশ হয়ে। আজ থেকে পনের মিলিয়ন বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকা প্লেটের সাথে নাজকা প্লেটের সংঘর্ষে জন্ম নেয় আন্দিজ। আন্দিজের গঠন আর সেই সাথে ব্রাজিল ও গায়ানার বেডরক শিল্ড বন্ধ করে দেয় নদীর পথ। ফলে আমাজন পরিণত হয় বিশালাকার অন্তর্দেশীয় নদীতে।

আমাজনের রয়েছে ১১০০’র বেশি উপনদী


আস্তে আস্তে পানি স্বচ্ছ হয়ে উঠতে থাকল। জন্ম নিল বসবাসের উপযোগী প্রাণী। প্রায় দশ মিলিয়ন বছর আগের কথা। বালি আর পাথরের মধ্য দিয়ে আমাজন পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে যাত্রা করে। এই সময়টাতেই মূলত গড়ে উঠে রেইনফরেস্ট। বরফ যুগের সময় সমুদ্রের উচ্চতা হ্রাস পায়। আমাজনের পানি দ্রুত প্রবাহিত হতে হতে পরিণত হয় নদীতে। তারও মিলিয়ন বছর পরে সমুদ্রের স্তর আরো নেমে গেলে অববাহিকায় গড়ে উঠে বনভূমি।

বন থাকবে, প্রাণী বৈচিত্র্য থাকবে না; কিভাবে সম্ভব? সেই সূত্র মেনেই দুই আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসে বিচিত্র সব প্রাণী। বরফ যুগের দরুণ ক্রান্তীয় অঞ্চলের রেইনফরেস্টগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল। ধারণা করা হয়, আমাজন তা ফিরে পেয়েছে বিস্তৃত তৃণ অঞ্চল এবং পার্বত্য বনভূমির মধ্য দিয়ে। তৃণ অঞ্চলগুলো রেইনফরেস্টকে দ্বীপের মতো বিভক্ত করেছে। বিদ্যমান প্রজাতিগুলোকে পৃথক করে রেখেছে। সেভাবেই ভিন্ন পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে একই প্রজাতিতে জন্ম নিয়েছে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য।

বরফ যুগের সমাপ্তি ঘটলে বনভূমি আবার সংযুক্ত হলো একে অপরের সাথে। ততদিনে প্রজাতির পরিবর্তনে ব্যবধান এতটাই ঘটে গেছে যে; পরিণত হয় সম্পূর্ণ পৃথক প্রজাতিতে। আর এভাবেই ওই অঞ্চলে জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য সমাবেশ রচিত হয়। প্রায় ছয় হাজার বছর আগে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দাঁড়ায় ১৩০ মিটারে; আর আরো একবারের জন্য নদী প্লাবিত হয়ে ধারণ করে দীর্ঘ, বিস্তীর্ণ ও স্বচ্ছ লেকের আকার।

কত বড় আমাজন বন?

প্রশ্নটা কঠিন না হলেও ব্যাখ্যা নির্ভর। এইজন্য কে কিভাবে সংজ্ঞায়ন করছে; সেদিক থেকে পরিবর্তিত হয় আয়তন। আমাজন নদী প্রায় ৬.৯১৫ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটারকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকার মোট আয়তনের ৪০ ভাগই এর অধীনে। কিন্তু সাধারণ অর্থে অববাহিকার বহির্ভাগকেও ব্যবহার করা হয়, যখন ‘দ্য আমাজন’ বলা হয়।

জীব বৈচিত্রের এক সতেজ জাদুঘর আমাজন


জীবভূগোলের দিক থেকে দেখলে আমাজনের আয়তন ৭.৭৬- ৮.২৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। যার শতকরা আশি ভাগই বনভূমি। মোট বনাঞ্চলের দুই-তৃতীয়াংশ অবস্থিত ব্রাজিলে। বর্তমান সময়ে নদী হিসাবে আমাজনের খ্যাতি অজানা না কারো। আয়তনের দিক থেকে মিসিসিপির চেয়ে ১১ গুণ বড়। অববাহিকা মিলিয়ে তো একেবারে খোদ USA-এর সমতুল্য। পানির মাত্রা যখন তুঙ্গে থাকে; নদীর মুখ তখন ৩০০ মাইল পর্যন্ত প্রশস্ত হয়। প্রতিদিন ৫০০ বিলিয়ন ঘনলিটার পর্যন্ত পানি প্রবাহিত করে ফেলে দেয় আটলান্টিক মহাসাগরে।

নদীর স্রোত বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বয়ে নেয় আন্দিজ থেকে। স্বচ্ছ পানি তাই পরিণত হয় ঘোলা কাদায়। হিসাব করে দেখা যায়, প্রতিদিন ১০৬ মিলিয়ন ঘনফুট পলি প্রতিদিন ধুয়ে নামে সমুদ্রে। ফলে এই পলি থেকেই আমাজনের মুখে জন্ম নিয়েছে মাহারো আইল্যান্ড—আয়তনে যা সুইটজারল্যান্ড-এর সমান। আমাজন রেইনফরেস্ট আমাজন অববাহিকা পৃথিবীর বৃহত্তম ক্রান্তীয় রেইনফরেস্ট। অঞ্চলটুকুতে বিচিত্র ও অজস্র বাস্তুতন্ত্র আছে; তৃণ অঞ্চল থেকে জলাভূমি অব্দি। মাটির প্রকার, ইতিহাস কিংবা অন্যান্য প্রভাবকের ওপর ভর করেও রেইনফরেস্ট ভিন্ন হতে পারে।

দিন বদলে বিবর্তন

আমাজনে মানুষের বসবাসের ইতিহাস অনেক পুরাতন। কিন্তু বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অন্যান্য কারণে বিবর্তন আসছে। বিশাল পরিমাণ আসবাব কিংবা ব্যবহার্য দ্রব্যাদির যোগান দেয় আমাজন। পশুর মাংস, চামড়া, কাঠ, ফল, তেল, গ্যাস কিংবা মিনারেলের মতো আরো অনেক কিছুই পণ্য হিসাবে রপ্তানি করা হচ্ছে চীন, ইউরোপ, আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশগুলোতে।

নির্বিচারে কেটে উজাড় করা হচ্ছে বনভূমি


সব ক্রিয়ারই একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই আমাজনও আক্রান্ত হয়েছে দ্রুত। ব্যাপক পরিমাণ গাছ বিলুপ্ত হচ্ছে মানুষের লোভের তোপে পড়ে। ১৯৭০ সালের পর থেকে প্রায় ১.৪ মিলিয়ন হেক্টর বন কেটে ফেলা হয়েছে। সেই সাথে আগুনের মতো ঘটনায় বিশাল পরিমাণের ক্ষয়ক্ষতির নজির তো আছেই। খনি খনন, তেল অনুসন্ধান, সয়াবিনের চাষ, নগরায়নের মতো কার্যাবলির প্রভাব পড়েছে আমাজনের ওপর। বনের মধ্য দিয়ে পথ নির্মাণের মাধ্যমে গভীর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে গাছ কেটে আনা হচ্ছে আজকাল।

তবে, বৃক্ষনিধনই আমাজনের পরিবর্তনের জন্য একমাত্র কারণ নয়। বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন আমাজন রেইনফরেস্টের ওপর প্রভাব ফেলে চলছে। ক্রান্তীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি আমাজনের বৃষ্টিপাতের মাত্রা ব্যাপকভাবে হ্রাস করে দিচ্ছে। দেখা দিচ্ছে খরা কিংবা ঘন ঘন দাবানল। যদি এভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতার বৃদ্ধি চলতে থাকে; বেশির ভাগ বনভূমিই ধীরে ধীরে তৃণভূমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। বিশেষভাবে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য এই ঝুঁকি বেশি। সেই সাথে আছে মনুষ্য সৃষ্ট কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি।

আমাজন রক্ষার তদবির

২০০৪ সালের পর থেকে আমাজন রক্ষার জন্য বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু তৎপরতা নেওয়া হয়েছে। ২০০০ সাল থেকে ব্রাজিল সরকার পৃথিবীর বৃহত্তম সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করে আমাজনকে কেন্দ্র করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গঠন, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নীরিক্ষা এবং পরিবেশ রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক ভর্তুকি প্রদানের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মালিকেরাও নিজেদের অবস্থান থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

অথচ বর্তমান সময়ের দাবানলের ঘটনা এবং সেই ক্ষেত্রে ব্রাজিল সরকারের অবস্থান বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক তৎপরতার প্রতি নিতান্ত ভ্রূক্ষেপহীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে অনেকেই ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে পেয়েছেন। আমাজনের ভেতরে বিচিত্র প্রাণী এবং গাছগুলোর ছাই মানুষের মনে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। তার সাথে আছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং আদিবাসী সংস্কৃতির বিপন্ন অবস্থা; যেগুলো বাঁচিয়ে রাখা গোটা মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য জরুরি।

আমাজনের আগুন তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে


ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে উঠেছে পৃথিবীর ফুসফুস। শীঘ্রই কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে দেরিতে হলেও গোটা মানবসভ্যতাকে পস্তাতে হবে তার জন্য।

আপনার মতামত লিখুন :