কবিপ্রেমী চা-অলার দোকান

রুহুল সরকার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চা দোকানটায় ঢুকতেই চোখ আটকে যায় দেয়ালে যত্ন করে বাঁধানো সব কবি, সাহিত্যিক ও রাজনীতিকদের ছবিতে। চা দোকানে যদি কিছু সাঁটানোই হয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা হয়ে থাকে নায়ক-নায়িকা বা কোনো সিনেমার পোস্টার। এই দোকানটি ব্যতিক্রম। এখানে সাঁটানো ছবিগুলো বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, মুক্তিযোদ্ধা ও মনীষীদের। মৃদু শব্দে দোকানটিতে বাজানো হয় পুরনো দিনের রুচিশীল বাংলা গান।

উত্তরের সীমান্তজেলা লালমনিরহাট শহরের সাপটানা সড়কের কালিবাড়ি এলাকায় চা দোকানটির অবস্থান। কবিপ্রেমী চা দোকানীর নাম দয়ারাম দয়াল। ৩২ বছর বয়সী দয়ালের গ্রামের বাড়ি জেলার আদীতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের পূর্ব ভেলাবাড়ি গ্রামে। ৩ ভাই ২ বোনের মধ্য দয়াল চতুর্থ। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল না। স্থানীয় স্কুলে ৩য় শ্রেণীতে পড়াকালীন দারিদ্র্যের কারণে লালমনিরহাট শহরে কাজের জন্য চলে আসেন দয়াল।

শহরে এসে কিছুদিন স্বর্ণকারের দোকানে কাজ করেন। তারপর দৈনিক ৩০ টাকা মজুরিতে হোটেলে কাজ শুরু করেন, পরে ১৫০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেতেন। ওই টাকায় কোনোমতে চলে যেত নিজের ও পরিবারের খরচ। অন্যের দোকানে কাজ করতে করতে নিজেই একটি দোকানের স্বপ্ন দেখেন। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। শহরের কালিবাড়ি এলাকায় ছোট একটি দোকান ভাড়া নেন।

২০১৩ সালের জুন মাসে চা, বিস্কিট, পাউরুটি বিক্রি দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। এরপর ব্যক্তিগত ভালোলাগা থেকে শুরু করেন কবি সাহিত্যিকদের ছবি সংগ্রহ। প্রথমে তিনজন কবির ছবি সাঁটানো হয় দোকানে। অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলত চায়ের দোকানে আবার কবি সাহিত্যিকদের ছবি কেন! কারো কারো সন্দেহ ছিল, হয়তো প্রেমে ব্যর্থ হয়ে এসব ছবি লাগিয়েছে দয়াল।

চা দোকানে মণীষীদের ছবি সাঁটানোর ব্যাপারে জানতে চাইলে দয়াল বলেন, স্কুলে পড়ার সময় স্যারদের কাছ থেকে কবিতা, গল্প ও মনীষীদের জীবনী শুনতে ভালো লাগত। সেই ভালোলাগা থেকেই দোকানে প্রথমে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ছবি কিনে লাগাই। অনেকে প্রশংসা করলেন আবার অনেকে তিরস্কারও।

শেখ মুজিবুর রহমান, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিবেকানন্দ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, মাদার তেরেসা, লালন শাহ, সুফিয়া কামাল, সুকান্ত ভট্টাচার্য, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আব্বাসউদ্দিন আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, কায়কোবাদ, একেএম ফজলুল হক, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মোনালিসা, ৭ বীরশ্রেষ্ঠ, বাংলা মায়ের কৃতি সন্তান, বাংলাদেশের মানচিত্রসহ প্রায় ২২টি বাঁধাইকৃত ছবি সাঁটানো আছে দোকানের চারপাশজুড়ে।

স্থানীয় রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, চাকুরিজীবী ও তরুণরাই এ দোকানের প্রধান ক্রেতা। দয়ালের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা লালমনিরহাট সরকারি গার্লস স্কুলের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক প্রমোদ কুমার মোহন্ত বলেন, দোকানটির নিরিবিলি পরিবেশ ভালো লাগে, মৃদুলয়ে পুরনো দিনের গানও শোনা হয় এখানে এসে।

ভবিষ্যত-ভাবনার কথা জানতে চাইলে দয়াল জানান, এখন প্রতিদিন প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকার মতো বিক্রিবাট্টা হয়। দোকানটি আরেকটু বড় করার ইচ্ছে আছে তার।

আপনার মতামত লিখুন :