মাছ ধরার ভেসাল

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
গ্রামীণ জনপদে মাছ ধরার ভেসাল, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

গ্রামীণ জনপদে মাছ ধরার ভেসাল, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মাছে ভাতে বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে কত কিছু! শত শত প্রজাতির মাছ, মাছ ধরার রকমারি নৌকা আর বিচিত্র জাল।

শহরের নাগরিক জীবনের নতুন প্রজন্ম বিভিন্ন ধরনের নৌকা ও জালের নামও জানবে না। অনেকগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। যেমন হারাচ্ছে অনেক প্রজাতির মাছ।

মাছ ধরার ভেসাল গ্রামীণ বাংলার এক অতি চেনা নাম। মাছ শিকারের জাল হিসেবে খুবই জনপ্রিয় এ জালের ছবি গ্রামবাংলার পথে প্রান্তরে খাল, বিল, নদী, নালায় দেখা যায়।

মাছ ধরার ভেসাল বেয়াল জাল নামেও পরিচিত। এটি এমন একটি মাছ ধরার পদ্ধতি, যা পানির একটি নির্দিষ্ট গভীরতা পর্যন্ত ডুবিয়ে দেয়া হয়। তারপর মাছ প্রবেশ করলে উত্তোলন করে মাছ ধরা হয়।

ভেসাল জালগুলো অনেক সমতল বা থলে আকৃতির, আয়তক্ষেত্র, পিরামিড বা শঙ্কুর মতো হতে পারে। এ জাল জেলে তার হাত দিয়ে পরিচালনা করে। এটি কখনো নির্দিষ্টস্থানে বসিয়ে কিংবা নৌকা দিয়েও পরিচালনা করা যায়।

ভেসাল জাল কখনো কখনো 'গভীর জাল' নামেও পরিচিত হয়, যদিও এ শব্দটি হাত জাল বলেও ডাকা হয়। ভেসাল জাল বানাতে বাঁশ ও জাল তৈরির উপযোগী শক্ত সুতা ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ত্রিভুজাকৃতির একটি লম্বা বাঁশের ফ্রেম থাকে। এ ফ্রেম জুড়ে জাল সংযুক্ত করা হয়।

প্রাথমিকভাবে ছোট মাছ ধরতে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। এটির এক পাশ পানির তলদেশে ডুবে যায়, অপর পাশ জেলের হাতে থাকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা, ছোট নদী ও খালে এর ব্যবহার বেশি দেখা যায়। জেলে একটি মাচা তৈরি করে সেখান থেকে নিজেকে নিরাপদ স্থান দাঁড় করিয়ে এ জালটি মাছ ধরার কাজে পরিচালনা করেন।

নৌকা চালিত ভেসাল জাল বা বিভিন্ন জলবাহী জাহাজ থেকে পরিচালিত ভেসাল জাল রয়েছে। এসব নৌযানে কখনো কখনো হাত দ্বারা বা যন্ত্র দ্বারা জালকে উঁচু করে পানি থেকে তোলা হয় আবার পানির গভীরে পাঠানো যায়। নৌকা বা নৌকাতে থাকা কয়েকটি খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শক্তভাবে যুক্ত রাখা হয়। এ জাল দিয়ে মাছ ধরতে কখনো কখনো বাতি বা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহৃত হয়। যা মাছকে আকৃষ্ট করে এবং জালে নিয়ে আসতে সহায়তা করে।

ভেসাল জাল সাধারণত অন্যান্য জালগুলোর চেয়ে কিছুটা বড় আকৃতির হয়। এটি একটি বাঁশ-কাঠের কাঠামোতে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত থাকে। জেলে হাত দিয়ে জালটি ব্যবহার করতে পারে এবং মাছ ধরার সময় গুটিয়ে নিয়ে মাছ তার থলেতে রাখতে পারে।

শুধু জালের কথাতেই মাছের প্রসঙ্গ অসমাপ্ত থাকবে। কবি ঈশ্বর গুপ্ত বলেছেন, ‘ভাত মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙালি সকল।’ তিনি তপসে মাছ নিয়ে অনেক বড় কবিতা লিখে গেছেন।

মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলে নানা রকমের মাছের রান্নার বর্ণনা দিয়েছেন। আরেক কবি বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলেও পাওয়া যায় মাছের বাহারি বিবরণ ।

চণ্ডীমঙ্গলে আছে- সর্ষে তেল দিয়ে চিতল মাছের কোল ভাজা, কুমড়ো বড়ি আর আলু দিয়ে রুই মাছের ঝোল, আদারস দিয়ে সর্ষে তেলে কই মাছ ভাজা, কাতলা মাছের ঝোল, খরশোলা মাছ ভাজা, শোল মাছের কাঁটা ছাড়িয়ে নিয়ে কাঁচা আমের সঙ্গে রান্না।

আরও আছে, 'লিখিব পড়িব মরিব দুঃখে, মৎস্য মারিব খাইব সুখে— মাছ নিয়ে মধ্যযুগের জনপ্রিয় শ্লোক।

সবই সাহিত্যের কথা এবং স্মৃতির বিষয়। কখনো প্রত্যন্ত গ্রামের গভীরে গেলে দেখা মেলে প্রায়-লুপ্ত প্রজাতির মাছ, জাল, নৌকা। বয়স্করা শৈশবের হারানো দিনের ছায়ায় দেখেন মাছদের উচ্ছ্বলতা, নৌকার ভাসান আর জলেতে জালের খেলা।

মৎস্যগন্ধী অতীত ও ঐতিহ্যের আধুনিক প্রত্যাবর্তন সম্ভব হলে উজ্জ্বলতায় উদ্ভাসিত হবে শাশ্বত বাংলা। বাংলার চিরন্তন সম্পদগুলোও টিকে থাকবে বিলুপ্তির করাল থাবার কবল থেকে।

আপনার মতামত লিখুন :