ওই খানে কবি জসীম উদ্দীনের কবর ডালিম গাছের তলে

মবিনুল ইসলাম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ডালিম গাছের নীচে চিরনিদ্রায় শায়িত কবি জসীম উদ্দীন

ডালিম গাছের নীচে চিরনিদ্রায় শায়িত কবি জসীম উদ্দীন

  • Font increase
  • Font Decrease

ফরিদপুর থেকে ফিরে: ‘ওই খানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে/ তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ পল্লীকবি জসীম জসীম উদ্দীনের অমর সৃষ্টি ‘কবর’ কবিতা। এ কবিতায় ডালিম গাছের নীচে শুয়ে আছেন কবির কল্পনার কোন এক বালকের দাদি। বালকের দাদা তার স্ত্রীকে কত ভালোবাসতেন, এ কবিতায় তা সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে।

এ কবিতার মাধ্যমে মৃত্যুর পর কবি হয়তো ডালিম গাছের নীচে শায়িত হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। আর তাই কবির কবরে মাথার পাশে লাগানো হয়েছে ডালিম গাছ। কবিতার ‘দাদি’র মতো পল্লীকবিও শায়িত আছেন ডালিম গাছের তলে।

জসীম উদ্দীনের পারিবারিক কবরস্থানটি রাস্তা থেকে কিছুটা উঁচু, চারিদেকে ইট ও কংক্রিটের ঢালাই করা। কবরস্থানে উঠার জন্য একটি প্রশস্ত সিঁড়ি আছে। তবে এটি তালা দেওয়া থাকে। বিপরীত দিকে অর্থাৎ রাস্তার ধার থেকে জসীম উদ্দীনের কবর দেখা যায়। কবরের আশেপাশে রয়েছে আরও কয়েকটি কবর। সেখানে ঘুমিয়ে আছেন কবির বাবা আনসার উদ্দিন মোল্লা, মা আমিনা খাতুন, কবির তিন ভাই, বোনসহ অনেকের কবর।

কবির পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে গোবিন্দপুর গ্রাম

 

কবির পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুরের অম্বিকাপুরে গোবিন্দপুর গ্রাম। কবির পৈত্রিক বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে স্রোতহীন কুমার নদ। কবির বাবা-মা যে ঘরে থাকতেন সেটি পাকা ঘর, এ বাড়ির আঙ্গিনায় রয়েছে চারটি চৌ-চালা ঘর। এছাড়া আরও কয়েকটি ঘর রয়েছে। কোন ঘরে কে থাকতেন তা উল্লেখ করা আছে। ঘরগুলোর কয়েকটিতে কবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে।

পুরো বাড়িটিই কবির বিভিন্ন লেখা দিয়ে সাজানো হয়েছে। কবির বিয়েতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন তাও স্থান পেয়েছে।

কবি মায়ের হাতের পিঠা খুব পছন্দ করতেন। মা যে ঢেঁকি দিয়ে পিঠার আটা তৈরি করতেন সেই ঢেঁকিও একটি কোনে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। সেখানে কবির উদ্ধৃতি দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘আমাদিগকে পিঠা খাওয়াইতে মা যে কত কষ্টই না করিতেন। পিঠার চাল আলাইবার কেহ না থাকিলে তাহা গুঁড়া করা যায় না। মা ঢেঁকিতে দু’চার পাড় দিতেন আবার নামিয়া আসিয়া নোটের চাল নাড়িয়া চাড়িয়া দিতেন।’

কবি জসীম উদ্দীনের বাড়িতে এক সময়ের ব্যবহৃত পালকি

 

লেখা আছে কবির স্মৃতি কথা, ‘আমাদের গরীবের সংসার। ঘি-ময়দা-ছানা দিয়ে জৌলুশ পিঠা তৈরির উপকরণ মায়ের ছিলো না। চাউলের গুঁড়া আর গুড় এই মাত্র মায়ের সম্পদ।’ একটি ঘরে রয়েছে কবির ব্যবহৃত পালকিও।

সবচেয়ে বেশী চোখে পড়বে কবির প্রিয় মাটির অসংখ্য পুতুল। এছাড়া একটি ঘরে কবির নাতি-নাতনিদের ব্যবহৃত পুতুলও আছে। আছে সেই আমলের ঘড়ি, টেলিফোন সেট, হ্যারিকেন, টাইপ মেশিন, শাড়ি চাদর, নকশীকাঁথা প্রভৃতি।

কবি কতটা প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন। মা-মাটি ও মানুষকে কতটা ভালবাসতেন তা পল্লীকবির পৈত্রিক বাড়িতে না গেলে বোঝা যাবে না।

কবি জসীম উদ্দীনের প্রতিকৃতি

 

কবির জন্ম ফরিদপুরের সদর উপজেলার তাম্বুলখানা গ্রামে নানার বাড়িতে। মাধ্যমিকের শিক্ষা সনদ অনুযায়ী কবির জন্ম ১৯০৪ সালের ১ জানুয়ারি। ১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ পরলোকগমন করেন বাংলাসাহিত্যের অমর কবি পল্লীকবি জসীম উদ্দীন।

কবির বাড়ি পরিদর্শনে গিয়ে স্রোতহীন কুমার নদের শীতল বাতাস আর স্নিগ্ধ পরিবেশ আপনার প্রাণ জুড়াবে। কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি ও জাদুঘরের প্রবেশের জন্য ২০ টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয়।

কিভাবে যাবেন:

ফরিদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি ২ কিলোমিটার দূরে। দেশের যে কোন জেলা থেকে ফরিদপুর এসে মোটর চালিত রিকশা কিংবা অটোতে সহজেই কবির বাড়ি যাওয়া যায়। তাদের বললেই হবে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি যাব।

আপনার মতামত লিখুন :