যদি বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট পরিষেবা

তানিম কায়সার, কন্ট্রিবিউটিং করেসপন্ডেন্ট
একদিন যদি বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট?

একদিন যদি বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট?

  • Font increase
  • Font Decrease

ঘুম থেকে উঠে আমাদের অধিকাংশের প্রথম কাজ ঘুম ঘুম চোখে মোবাইলটা হাতে নেওয়া। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কল বা মেসেজ এলো কিনা চেক করা। আবার অনেকেই ঘুম ঘুম ভাব দূর করতে একটু ঢুঁ মারি ফেসবুকে। কী হবে যদি এমনই এক সকালে একদিন দেখি ইন্টারনেট আর কাজ করছে না! গুগল ম্যাপ ছাড়া কোনো অচেনা শহরে পথ খুঁজে নিতে হলে কী বেকায়দায়ই না পড়ে যাব তখন! যখন পছন্দের ওয়েবসাইটটি লোড নেবে না, ফেসবুকে বন্ধুবান্ধবদের মেসেজ করলেও তা আর ডেলিভার হবে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশ ইন্টারনেট অ্যাডিক্টরা ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে পড়ব।

ইন্টারনেট এখন আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের অংশ। একটা দিনও আমরা ইন্টারনেট ছাড়া কল্পনা করতে পারি না। বাসায় থাকলে যেভাবে একটু ক্ষিদা লাগলেই ফ্রিজ খুলে দেখি বারবার, তেমনিভাবে বারবার ইন্টারনেট চালু করে দেখতে হয় নতুন কিছু এলো বা হলো কিনা। এটুকু না হলে অস্থিরতার সীমা পরিসীমা নাই। ভেতরে অশান্তি কাজ করতে শুরু করে। কী হবে এই আমাদের, যদি হুট করে একদিন বন্ধ হয়ে যায় ইন্টারনেট?

প্রশ্নটা উঁকি মেরে গিয়েছিল স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক জ্যাক হ্যানককের মাথায়। ২০০৮ সালে তিনি তার ছাত্রদের এসাইনমেন্টের অংশ হিসেবে টানা ৪৮ ঘণ্টা ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন। ছাত্ররা বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। ইন্টারনেট ছাড়া তারা নিজেদেরকে নিপাট অসহায়রূপে আবিষ্কার করেছে। কারো সাথে যোগাযোগ করে ভালোমন্দ শেয়ার করতে না পেরে নিজেদেরকে কারাগারের বন্দী বলে মনে হয়েছে তাদের।

ইন্টারনেটের জনক ভিনটন জি কার্ফ


পৃথিবীতে ইন্টারনেট যাত্রা শুরু করে ১৯৬৯ সালে ভিনটন জি কার্ফ-এর হাত ধরে। এর প্রসার ঘটে ১৯৮০’র দশকের শেষভাগে এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে। এই সময়ে বাণিজ্যিক ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীরা (আইএসপির) আবির্ভাব হতে থাকে। মূলত ১৯৯৫ সালে ইন্টারনেটকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় ইন্টারনেট ভিত্তিক নতুন এই জয়যাত্রা। ফলে যেখানে ১৯৯৫ সালে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করত। গত ২২ বছরের মধ্যে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ৩ বিলিয়নে! যা পুরো পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। আর প্রতি সেকেন্ডে এই পরিসংখ্যানে নতুন যুক্ত হচ্ছেন আরো দশজন করে। এটা শুধু প্রত্যক্ষভাবে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের সংখ্যা। এর বাইরেও অনেকে পরোক্ষ উপায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার বা এর সুফল ভোগ করে থাকে। এমন সফলতার কথা হয়তো ইন্টারনেটের জনক ভিন জি কার্ফও ভাবতে পারেননি।

ইন্টারনেট আজ আমাদের জীবনে যেভাবে জড়িয়ে আছে, একইভাবে একদিন আবার নাইও হয়ে যেতে পারে। কী, বিশ্বাস হচ্ছে না? মনে করে দেখুন এই কিছুদিন আগেও দেশের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল ছিল, তখনও কিছুদিনের জন্য আমরা ইন্টারনেট সেবার বাইরে ছিলাম। কোনো দেশ চাইলে কিল সুইচের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবস্থা বন্ধ করে দিতে পারে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় মিশর যেমনটা করেছিল। তুরস্ক এবং ইরানও হেঁটেছিল একই পথে। পাকিস্তানেও একটি মামলার রায়ের পর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ইন্টারনেট সেবা।

এবার আসুন জেনে নিই ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

ইন্টারনেট বন্ধের পর প্রথম ধাক্কাটি হবে স্যোশাল মিডিয়ার বিলুপ্তি ◢


ইন্টারনেট বন্ধের পর সর্বপ্রথম যে ধাক্কাটি আমাদের সামলাতে হবে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিলুপ্তি। জীবনের অংশ হয়ে যাওয়া একটি অভ্যাস হুট করে হারিয়ে গেলে আমাদের জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইন্টারনেট মানুষের যোগাযোগ-দূরত্বকে এত কমিয়ে দিয়েছে যে এটি বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ দৈনন্দিন জীবনে ভোগান্তির শিকার হবে। এখন চাইলেই একটা পোস্ট দিয়ে হাজার মানুষকে জানিয়ে দেওয়া যায় আপনি একটু পরে কী করতে যাচ্ছেন। তখন আর এমনটা সম্ভব হবে না। মোবাইল হাতে ভিডিও কলের মাধ্যমে দেখে নিতে পারছেন প্রিয়জন এবং প্রয়োজনের অনেক কিছু। কিন্তু ইন্টারনেট না থাকলে প্রতিটি জায়গায় যেতে হবে সশরীরে। গচ্চা যাবে সময়, অপচয় হবে অর্থের।

ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে যখন সবাই সবাইকে ফোন করতে শুরু করবে, তখন টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমের ওপরে অবিশ্বাস্যরকম চাপ পড়বে। এর ফলে ব্যাড কানেকশন, দুর্বল নেটওয়ার্ক, কল ড্রপের ঘটনাগুলো আরো স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে। মোবাইল অপারেটররা দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের নেটওয়ার্ক এতটা পাওয়ারফুল বা আপগ্রেড করতে পারবে না। এদিকে এত বেশি নেটওয়ার্ক প্রেশার সহ্য করতে না পেরে মোবাইল ফোন টাওয়ারগুলো টেম্পোরারিলি হ্যাং হয়ে যেতে পারে। মোবাইল অপারেটররা যতদিন এই এক্সট্রা প্রেশার সহ্য করার জন্য নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করছে, ততদিন পর্যন্ত এই সমস্যা চলতেই থাকবে।

টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেমের ওপরে অবিশ্বাস্যরকম চাপ পড়বে


এর পরের ধাক্কাটা আসবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। যেহেতু বাসা থেকে বের হলেই প্রয়োজন পড়বে টাকার। ইতোমধ্যেই পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইন্টারনেট নির্ভর। ইন্টারনেট ছাড়া আপনার ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড পরিণত হয়েছে অকেজো প্লাস্টিকের টুকরায়। কার্যত অচল হয়ে যাবে অর্থনৈতিক সিস্টেম। বন্ধ হয়ে যাবে সবধরনের ডিজিটাল পেমেন্ট ও মানি ট্রান্সফার সার্ভিস।

অবশ্য, ২০০৮ সালে পরিচালিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায় কখনো যদি ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায় তাহলে প্রাথমিকভাবে ব্যাংকিংখাতে যে সমস্যা তৈরি হবে, পরবর্তী চারদিনেই তার থেকে উত্তরণ সম্ভব। গবেষণাটি করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড স্টেটস সাইবার কনসিকুয়েন্স ইউনিট।

ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বিরূপ প্রভাব পড়বে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। অভ্যস্ত উপায়ে প্রিয়জনদের খোঁজ খবর নিতে না পেরে, হাল হকিকত জানতে না পেরে নতুন ধরনের ডিপ্রেশনে পড়ে যাবে মানুষ। এর নেতিবাদী ফল দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তৈরি করতে পারে অচলাবস্থার, নতুন কোনো কর্মোদ্দীপনায় মনোনিবেশের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে ইন্টারনেটে অভ্যস্ত পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশিসংখ্যক মানুষ। অজানা এই মানসিক বিপর্যয় কিভাবে সামাল দেবে মানুষ? পুরোপুরি কল্পনা করাও সম্ভব নয় যেন।

আপনার মতামত লিখুন :