সাঁওতালদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ

মায়াবতী মৃন্ময়ী, অতিথি লেখক, বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

তখনো উপমহাদেশে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয় নি। কারণ দেশের কোথাও কোনও প্রতিবাদের চিহ্ন রাখে নি দখলদার ইংরেজ। তত দিনে বাণিজ্যের নামে আগত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা দখল করে নিয়েছে পুরোপুরি। এক শ বছর পার করেছে ইংরেজরা নির্মম শাসন, শোষণ ও লুটপাটের মাধ্যমে।

ব্রিটিশের চরম শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কেউ নেই। সবাইকে নির্মূল করে ফেলেছে দখলদার ইংরেজ বাহিনী। তবু প্রতিবাদ হলো। যাদের কথা কেউ ভাবে নি, তারাই করলো তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-বিদ্রোহ।

সিপাহী বিদ্রোহের (১৮৫৭) দুই বছর আগের সেই মহান প্রতিবাদের ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় অম্লান অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে। অভূতপূর্ব শিহরণ জাগানো ঘটনাটি লিপিবদ্ধ রয়েছে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মহত্তম ইতিহাসের পৃষ্ঠায়।

সাল ১৮৫৫। জুন মাসের শেষ আর জুলাই মাসের শুরুর দিক। বিদ্রোহ-বিক্ষোভে উত্তাল হলো ব্রিটিশ-বাংলা। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়ে মাঠে নেমে আসেন বাংলার আদিবাসী সাঁওতাল জনতা। বন-জঙ্গল, নিভৃত জনপদ থেকে দলে দলে সাঁওতাল নারী-পুরুষ বের হয়ে আসেন বিদ্রোহের মহামন্ত্রে উজ্জীবিত প্রত্যয়ে। তাদের হাতে তীর, ধনুক, বর্শা, বল্লম, দা, কুড়াল, সড়কি ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্র। মুখে তাদের স্বাধীনতার প্রতীতি।

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস অবিস্মরণীয় সংগ্রামের প্রতীক। সোনার বাংলার কৃষক শ্রেণির উপর সেকালের ব্রিটিশ নামক দখলদার রাষ্ট্র- ও রাজত্বের শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য বিদ্রোহের দুর্বার দৃষ্টান্ত এই সাঁওতাল বিদ্রোহ।

কৃষকের অতিচেনা, জনপ্রিয় মুখ ছিল সেদিনের বিদ্রোহের নেতৃত্বে। সিধু-কানু-ফুল ভাইবোনেদের তীর-ধনুকের এই বিদ্রোহ উপমহাদেশে সেদিন ব্রিটিশ শাসকের অন্যায়ের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। প্রতিবাদ করতে ভুলে যাওয়া জনতা আবার জেগেছি বিদ্রোহের প্রজ্বলিত অগ্নিশিখায়।

বিনয় ঘোষ, সুশোভন সরকার প্রমুখ সমাজতাত্ত্বিক-ঐতিহাসিক বাংলার বিদ্রোহের ইতিহাসে উচ্চতম স্থান দিয়েছেন সাঁওতালদের সংগ্রামকে। তীতুমীর, হাজি শরিয়তুল্লাহ, নানাকার বিদ্রোহ, পাগলা ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ ইত্যাদি গৌরবোজ্জ্বল জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অধ্যায়ের সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহকেও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ঔপন্যাসিক মহাশ্বেতা দেবী সাঁওতাল জনসমাজ ও তাদের সংগ্রামী উপাখ্যানকে অনবদ্য ভাষায় বর্ণনা করেছেন কথাশিল্পে।

এতো কিছুর পরও সবাই মনে রাখে নি বাংলার ইতিহাসে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এই সংগ্রামী অতীতকে। নীরবতা যেন ঘিরে ধরেছে আমাদের অতীত তেজ ও গৌরবের ইতিবৃত্তকে। কৃষক ও মানুষের মুক্তির নামে যারা কাজ করেন, তাদেরও কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ে নি সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস উপলক্ষ্যে।

অথচ এদেশের ঘরে ঘরে সাঁওতাল বিদ্রোহের এই দিবসটাই পালিত হবার কথা ধানে ও ধনুকে! চিরায়ত বাংলার লোকজ দ্রোহকে অন্তর দিয়ে স্মরণ করার কথা ছিল নদী ও ফসলের বাংলাদেশে। বাংলাদেশের জলে, স্থলে, চরে, জঙ্গলে, পাহাড়ে, সমুদ্রে চিরসংগ্রামশীল মানুষের প্রতি একাত্মতা জানানোর কথা ছিল বাংলার অতীত দিনের বীরদের বীরোচিত ইতিহাসের পুনঃপাঠের মাধ্যমে।

তেমন কিছুই হয় নি সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে। সমাজ-রাজনীতির মতো প্রতিষ্ঠানসমূহকের বোবা থাকতে দেখা গেলো সাঁওতালদের ঐতিহাসিক বিদ্রোহের দিনটিতে। আমরা জানি না, দেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কৃষি শিক্ষায় কি সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা পড়ানো হয়? দেশের কৃষি অফিসে, ভূমি অফিসে কি সাঁওতাল বিদ্রোহের ছবি টাঙানো আছে? সম্মান জানানো হয় কি ভূমি, জলাশয়, জঙ্গলের উপর মানুষের শাশ্বত অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা সাঁওতালদের?

সংগ্রাম ও অধিকারে ইতিহাস কৃষকদের জানানো না হলে কিভাবে তাদের ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে? কিভাবে কৃষি ও কৃষকের শোষণ মুক্তি সম্ভব হবে, তাদেরকে ইতিহাসের শিক্ষা থেকে দূরে রেখে?

এই ধরনের ইতিহাস-বিমুখতার মাধ্যমে কৃষি, কৃষক ও গ্রামের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব হবে না। গ্রামীণ বাংলাদেশের আদি ও অকৃত্রিম সংগ্রামশীলতার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকেও রক্ষা করা যাবে না ইতিহাস-বিমুখতার মাধ্যমে।

আপনার মতামত লিখুন :