কালজয়ী গানের শিল্পী মান্না দে

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম  
শিল্পী মান্না দে

শিল্পী মান্না দে

  • Font increase
  • Font Decrease

বেঙ্গালুরুর 'দেবি শেঠির হাসপাতাল' নামে পরিচিত 'নারায়ণা হৃদয়ালয়'-এর সুপরিসর ওয়েটিং লবিতে বসে কথা হচ্ছিল কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে।চিকিৎসার জন্য এরা প্রায়ই দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী শহরে আসেন। আমি নতুন এসেছি বলে ওদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখছি।

আলাপের এক পর্যায়ে একজন হঠাৎ বললেন, 'জানেন, এই হাসপাতালে বিখ্যাত শিল্পী মান্না দে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।'

তথ্যটি জেনে চমকে ওঠি। রোমান্টিক বাংলা গানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়কের দেহান্তর হয়েছিল এখানে?

'হা' এখানেই', ভদ্রলোক আরও জানান, '৫০ বছরেরও বেশি সময় বোম্বের কাটানোর পর তিনি বেঙ্গালুরুর কালিয়ানগর এলাকায় বসবাস করছিলেন।'

মান্না দে'র মৃত্যুর দিনটি ছিল ২০১৩ সালের ২৪ অক্টোবর, বাংলা পৌষ মাসের কাছাকাছি

অগ্রহায়ণের একটি দিন। আমার তখন বার বার মনে পড়ছিল তার গাওয়া বিখ্যাত একটি গানের লাইনগুলো, 'পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন, ফিরে আর আসবে কি কখনো...।'

মান্না দে আসল নাম নয়। পোষাকী নাম ছিল প্রবোধ চন্দ্র দে। জন্ম পহেলা মে, ১৯১৯ সাল। জনস্থান অবিভক্ত বাংলার কলকাতা শহর। শিক্ষা ও সঙ্গীতের তালিম নেন তিনি কলকাতাতেই। বিখ্যাত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি।

পঞ্চাশ ও ষাট দশকের আধুনিক বাংলা গানের উজ্জ্বল তারকা তিনি। বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছিলেন। গান গেয়ে পেয়েছেন পদ্মশ্রী, পদ্মবিভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে ও বঙ্গবিভূষণ সম্মাননা। সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার তিনি পেয়েছেন, তা হলো মানুষের ভালোবাসা। গান গেয়ে বছরের পর বছর, প্রজন্মের পর প্রজন্ম মাতিয়ে রেখেছেন তিনি।

১৯৪৩ সালে বোম্বের ‘তামান্না’ চলচ্চিত্রে বিখ্যাত গায়িকা ও নায়িকা সুরাইয়ার সঙ্গে গান গেয়ে মান্না দে’র অভিষেক হয়। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকান নি তিনি। বাংলা, হিন্দি, মারাঠি, গুজরাতিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়ে জয় করেছেন অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়।

১৯৫৩ সালে কেরালার মেয়ে সুলোচনা কুমারনকে বিয়ে করেন মান্না দে।

কাজের প্রয়োজনে নানা স্থানে থাকলেও বাংলা ভাষা, গান ও বাংলার সঙ্গে কখনোই তার বিচ্ছেদ ঘটে নি। ছিন্ন হয় নি শ্রোতার সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক।

কালজয়ী হয়ে আছে তার গানগুলো। এখনো ফিরছে মানুষের ঠোঁটে ঠোঁটে। প্রেম ও স্মৃতির সরণী বেয়ে বিস্মরণের ওপার থেকে ভেসে আসে তার গান: কফি হাউসের সেই আড্ডাটা, আবার হবে তো দেখা, এই কূলে আমি আর ওই কূলে তুমি, তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়, যদি কাগজে লেখো নাম, সে আমার ছোট বোন, যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম মেনে, খুব জানতে ইচ্ছে করে। ইত্যাদি চিরন্তন গানে তিনি আজো বাঙালিশ্রোতার চিত্তে অমর হয়ে আছেন।

ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা, সম্মান ও ভালোবাসার অধিকারী মান্না দে পৌষের কাছাকাছি একটি দিনে বাংলা থেকে বহুদূরে দক্ষিণ ভারতের বেঙ্গালুরুর নারায়ণা হৃদয়ালয়ে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা হালকা শীতের দিনগুলোতে তার কথা বাঙালির মনে পড়বেই।

মনে পড়বে তার চিরায়ত গানগুলো।

আপনার মতামত লিখুন :