ঋত্বিক ঘটক: চলচ্চিত্রের শিল্পিত কারিগর

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
ঋত্বিক ঘটক, ছবি: সংগৃহীত

ঋত্বিক ঘটক, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘সুবর্ণরেখা’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি কালজয়ী চলচ্চিত্রের নাম উচ্চারিত হলেই ভেসে উঠে একজন বিশিষ্ট নির্মাতার মুখচ্ছবি। বাংলা চলচ্চিত্রে এমনই অনেক জীবনছোঁয়া-ক্লাসিক সিনেমার নির্মাতা ঋত্বিক ঘটক। সিনেমার পর্দায় মানবিকতার সঙ্কট, মানবযন্ত্রণা ও জনবেদনার সুনিপূণ ভাষ্যকার তিনি। কমার্শিয়াল ফ্যান্টাসি ফিল্মের জগত ভেঙে মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠ আর্টের জগত নির্মাণ করতে চেয়েছেন ঋত্বিক। যত না তিনি একজন সাধারণ চলচ্চিত্রকার, তারচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রের শিল্পিত কারিগর।

খরা, মারী, মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ আর শরণার্থী জীবনের বিদীর্ণ যাতনার কথা তাঁর মতো আর কেউ চলচ্চিত্রের ভাষায় বলতে পারেন নি। উপমহাদেশের ধ্রুপদী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেনের পাশাপাশি তাঁর নামও সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয় সিনেমার ইতিহাসে।

বাংলাদেশের ঢাকা শহরের পুরনো অংশের জিন্দাবাজারে ১৯২৫ সালে ৪ঠা নভেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন ঋত্বিক ঘটক। পিতা সুরেশ ঘটক ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী। মা ইন্দুবালা দেবী গৃহিনী। তিনি বাবামায়ের ১১তম ও কনিষ্ঠতম সন্তান। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা ও রাজশাহীতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ কোর্স শেষ করেও পরীক্ষা দেন নি তিনি।

ঋত্বিক ঘটক ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় হাজার হাজার শরণার্থীদের মিছিলে মিশে নিজের পরিবারে সঙ্গে চলে যান কলকাতায়। শরণার্থীর অস্তিত্বের সঙ্কট, দেশত্যাগের বেদনা, উদ্বাস্তুর আর্থ-সামাজিক হাহাকার জীবনভর তাঁকে তাড়িত করে। তাঁর জীবন, শিল্পচর্চা ও চলচ্চিত্রে বার বার ফিরে ফিরে আসে এইসব মানবিক কষ্ট ও অস্তিত্বের সঙ্কটের জ্বলন্ত প্রসঙ্গ। ফলে তিনি কলকাতার জীবনে বামপন্থী সংগঠন ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ বা ‘আইপিটিএ’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নাটকরচনা, অভিনয় ও নাট্যপরিচালনায় ব্যস্ত থাকেন ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত।

তারপর ‘ছিন্নমূল’ ছবিতে অভিনয় ও সহকারী পরিচালক হিসাবে শুরু হয় তার চলচ্চিত্র জীবন। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘নাগরিক’। ষাটের দশকে মুক্তি পায় তাঁর ত্রয়ী বা ট্রিলজি নামে পরিচিত তিনটি ছবি। এগুলো হলো: মেঘে ঢাকা তারা, কোমল গান্ধার ও সুবর্ণরেখা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহর ও শহরতলীর ছিন্নমূল, দেশত্যাগী, উদ্বাস্তু জীবনের চরম বেদনার শৈল্পিক প্রকাশ ঘটে ঋত্বিকের এইসব দাগকাটা চলচ্চিত্রে।। ছবিগুলো বাণিজ্যিকভাবে চরম অসফল হলেও তিনি সৃষ্টি করেন শৈল্পিক নির্মাণশৈলীর নিজস্ব চলচ্চিত্র ঘরানা।

মধ্য ষাটের দশকে ঋত্বিক ঘটক কলকাতা থেকে চলে যান মহারাষ্ট্রের পুনা শহরে। সেখানে ফিল্ম ইন্সটিউটে ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে চলচ্চিত্র বিষয়ে অধ্যাপনা করেন তিনি। নির্মাণ করেন আদিবাসী জীবন, বিহার, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, লেনিনকে নিয়ে শর্টফিল্ম ও তথ্যচিত্র।

ভালো ছবি নির্মাণের প্রত্যাশা নিয়ে ঋত্বিক ঘটক আবার মূলধারার চলচ্চিত্র জগতে ফিরে আসেন সত্তর দশকে। একজন বাংলাদেশী প্রযোজকের হাত ধরে তিনি আবার ক্যামেরা হাতে তুলে নেন। নির্মাণ করেন অদ্বৈতমল্ল বর্মণ রচিত মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের জীবন সংগ্রামের অনবদ্য কাহিনী অবলম্বণে কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। তাঁর নির্মিত শেষ ছবি ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’।

অনিয়ম, উদ্বেগ, রোগ তাকে ক্রমেই জর্জরিত করতে থাকে। ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৬ সালে ৫১ বছর বয়সে কলকাতায় মারা যান তিনি। স্বল্প পরিসরের জীবনে সুতীব্র ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্যেও ঋত্বিক ঘটক উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে সংযোজন করেছেন ভিন্নতর স্বতন্ত্র মাত্রা। শিল্পসম্মত ভালো ছবি নির্মাণের আজীবন সংগ্রামী তিনি। সমাজের নিগৃহীত, প্রান্তিক, ছিন্নমূল ও অন্তজ্য মানুষ এবং তাদের অন্তর্গত বেদনার অগ্রণী চলচ্চিত্রকার তিনি।

আর্থিক ও বাণিজ্যিকভাবে অসফল হলেও চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর অসামান্য শৈল্পিক কৃত্বিত্বের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন ঋত্মিক ঘটক। উপমহাদেশের নেতৃস্থানীয় চলচ্চিত্রকার হিসাবে ঋত্বিক ঘটক লাভ করেন ভারতের পদ্মশ্রী পুরস্কার। বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারেও তিনি ভূষিত হন। তাঁর ভাই মণীশ ঘটক একজন নামকরা লেখক এবং ভ্রাতৃকন্যা মহাশ্বেতা দেবী বরেণ্য ঔপন্যাসিক ও সমাজসেবী। স্ত্রী সুরমা ঘটকের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে তার দুই কন্যা ও এক পুত্রের জন্ম হয়।

৯৩তম জন্মদিনে ক্ষণজন্মা বিরল প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটকের প্রতি বার্তা২৪.কমের বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কালজয়ী চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আশাহত ও বিপণ্ন মানুষের কথা রূপালি পর্দায় মানবিক আর্তিতে তুলে ধরার প্রেরণা জাগিয়ে কাল-কালান্তরে বেঁচে থাকবেন তিনি ।

আপনার মতামত লিখুন :