জয়পুর-আজমীরে ভ্রমণ ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে

ড. মাহফুজ পারভেজ, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর, বার্তা২৪.কম
আজমীর শরিফ, ছবি: সংগৃহীত

আজমীর শরিফ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

‘এবার আজমির শরিফে গিয়ে নতুন চিত্র দেখতে পেলাম। জিয়ারতের পর দেখি চিকিৎসা আর ভ্রমণের নানা প্যাকেজের ছড়াছড়ি। নামকরা হাসপাতালগুলো সবই চলে এসেছে আজমির-জয়পুরে। চিকিৎসার ফাঁকে ফাঁকে রোগীদের দেখিয়ে দিচ্ছে নানা ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান’, সদ্য সফর থেকে ফিরে জানালেন শেখ ফারুক আহমেদ।

চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মার্দাশা এলাকার এই ভদ্রলোকের ভ্রমণের বাতিক আছে। মোটামুটি অনেক জায়গাই তিনি ঘুরেছেন। বার্তা২৪.কমকে তিনি আরও বলেন, ‘উত্তর ভারতের আজমির শরিফে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ যান খাজা হজরত মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ.)-এর দরগাহ শরিফ জিয়ারতের উদ্দেশ্যে। এদের অধিকাংশই চট্টগ্রামের, যারা কলকাতা বা দক্ষিণ ভারতের বদলে রাজস্থানেই তীর্থযাত্রা আর স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পাচ্ছেন এখন।’

একদা মারওয়া-মেওয়ার নামক ছোট ছোট রাজপুত জাতির এই এলাকাটি শাসিত হতো যোধপুর আর উদয়পুর থেকে। পরে রাজা জয় সিংহ পুরো রাজ্য একত্রিত করে বানান আধুনিক ভারতের প্রথম পরিকল্পিত শহর জয়পুর, যা ব্রিটিশ রাজপুত্র প্রিন্স অব ওয়েলেস-এর আগমন উপলক্ষে গোলাপি রঙে সাজানো হয়। এখনো সেখানে নিয়ম আছে প্রাচীন শহরের সবগুলো বাড়ির বাইরের রঙ হতে হবে গোলাপি। এজন্যই জয়পুরকে ডাকা হয় ‘পিংক সিটি অব ইন্ডিয়া’।

ইংরেজ চলে গেলে এসব দেশীয় রাজ্য ভারতে যোগ দেন এবং পুরো রাজপুতানা এলাকার নাম হয় রাজস্থান রাজ্য। রাজধানী থাকে জয়পুরই। প্রধান শহর আজমীর, বিকানার, যোধপুর, উদয়পুর, জয়সালমির, আনা সাগর ইত্যাদি। প্রধানত প্রাচীন প্রত্ন-স্থাপত্য আর আজমীর শরিফের জন্য সারা বছরই দেশ-বিদেশের মানুষের ঢল লেগে থাকে রাজপুত জাতির দেশ রাজস্থানে। ভারতের সবচেয়ে বিলাশবহুল টুরিস্ট ট্রেন চলে দিল্লি আর জয়পুরের মধ্যে, যার নাম ‘পিংক সিটি সুপার এক্সপ্রেস’। আর জয়পুর হলো ভারতের শীর্ষ টুরিস্ট হটস্পট ‘গোল্ডেন টায়াঙ্গাল'-এর একটি। ভ্রমণের সোনালী ত্রিভূজের বাকী দু’টি বাহু হলো দিল্লি আর আগ্রা। জয়পুরে আছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনার বেশ কয়েকটি।

মানুষের স্রোতের তালে তালে রাজস্থানের জয়পুর আর আজমীর ভরে গেছে ভারতের নামকরা মাল্টিস্পেশাল হাসপাতালে। বিখ্যাত প্রায়-সকল হাসপাতাল গ্রুপেরই ব্রাঞ্চ আছে এখানে। মজার ব্যাপার হলো, একই হেলথ চেকআপ প্যাকেজ বা চিকিৎসা খরচ দিল্লির চেয়ে জয়পুরে কম।

শেখ ফারুক আহমেদ তার ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় জানান, ‘বেশ কিছু হাসপাতাল সর্বভারতীয় মানের। দিল্লির মানুষও এখানে ছুটে আসেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। ভাণ্ডারি হাসপাতাল লেপারোস্কোপি আর কিডনি চিকিৎসায় এগিয়ে গেছে। সেখানে সব ধরণের চিকিৎসারই সুপার কনসালটেন্ট পাওয়া যাচ্ছে।’

জয়পুরের হাসপাতালগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো- রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি থাকার ও ভ্রমণের ব্যবস্থা করে। দালাল বা বাইরের লোকের দৌরাত্মও কম। অনেকগুলো হাসপাতালই ট্রাস্ট্র বা চ্যারিটেবল সোসাইটির। যে কারণের বাণিজ্যিক মনোবৃত্তিও সেখানে তুলনামূলক কম।

এসব বিষয়ে টেলিফোনে আলাপকালে ভাণ্ডারি হাসপাতাল ও মেডিকেল রিসার্সের পরিচালক ডা. চেরাগ ভাণ্ডারি বার্তা২৪.কমকে বলেন, ‘আজমীর-জয়পুর শুধু ঐতিহাসিকই নয়, আধ্যাত্মিক শহরও বটে। হিন্দু-মুসলমান-জৈন সম্প্রদায়ের বহু তীর্থক্ষেত্র এখানে রয়েছে। ফলে এখানে আগত মানুষজন ধর্মনিষ্ঠ ও তীর্থযাত্রী। আমরা তাদেরকে এভাবেই দেখি। বাণিজ্যিক লাভের বদলে মানবতা ও মানবসেবার বিষয়টি আমরা প্রাধান্য দিই।'

'জয়পুরে আরও অনেক খ্যাতনামা হাসপাতাল, যেমন দীপমালা, এসডিএমএইচ ইত্যাদি আছে, যেগুলো চালায় অলাভজনক-সমাজসেবামূলক সংস্থা। কর্পোরেট হাসপাতালগুলোর মতো বিজ্ঞাপন না দেওয়ায় এদের কথা মানুষের অজানা’, বলেন শেখ ফারুক। তার মতে, ‘প্রচারের বাইরের এই হাসপাতালগুলোর মান খুবই ভালো এবং খরচ ব্র্যান্ড হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার আগে সকলের উচিত বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হওয়ার বদলে নিজে খোঁজ-খবর নেওয়া।’

বাংলাদেশের রুগীদের কিছু হলেই দেশের বাইরে খোঁজ-খবর না নিয়ে চিকিৎসার জন্য ছুটে যাওয়াও সমালোচনা করেন শেখ ফারুক আহমেদ। ‘আজকাল ইন্টারনেটে সব খবর পাওয়া ও যোগাযোগ করা সম্ভব হলেও অনেকেই কিছু না জেনেই লোকমুখে শুনে নানা হাসপাতালে হাজির হয়। তারপর অ্যাপয়নমেন্ট না পেয়ে দিনের পর দিন হোটেলের খরচ টানেন বা ভুল হাসপাতালে গিয়ে নাকাল হন। কোনো অবস্থাতেই আগাম যোগাযোগ ও খোঁজ-খবর না নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়া উচিত নয়’ বলে মত দেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন :