‘গরীবের বউ রাজনীতি’ ও ‘রাজনীতির ভেতর পলিটিক্স’

ড. হারুন রশীদ
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ রাজনীতি নিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের গ্রামে একটা প্রবাদ আছে৷ গরীবের বউ সবার ভাবি। রাজনীতি গরীবের বউয়ের মতো। যে কেউ যে কোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে, কোনো বাধা নেই।’

রাষ্ট্রপতির এই কথা নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। বিশেষ করে লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে হাস্যরসের ছলে লঘু চালে তিনি যে গুরু কথা বলেছেন তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। ভাবগাম্ভীর্য ও গুরুগম্ভীর পরিবেশে রাষ্ট্রপতি লিখিত বক্তব্যে ভারী ভারী কথা বলবেন- এমনটিই আশা করেছিলেন অধিকাংশ লোকজন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল আর রীতি-নীতির বাইরে এসে মানুষের মনের কথাই বলেছেন।

বঙ্গভবনে যিনি বিশ্রামকালীন সময়ে লুঙ্গি পরে থাকেন তাকে কোট-টাই-হ্যাট আর সমাবর্তন গাউন পরিয়ে দিলেই বদলে যাবেন- এমনটি ভাবা ঠিক নয়। ভাটি অঞ্চলের হাওর বেষ্টিত জল-জোছনায় বেড়ে ওঠা মানুষ তিনি। একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে ডেপুটি স্পিকার থেকে হয়েছেন স্পিকার। দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার সততা, নিরপেক্ষতা ও দক্ষতা তাকে করেছে সর্বজনগ্রাহ্য।

মাটি ও মানুষের কাছে ছিলেন বলেই জনগণের মনের ভাষা তিনি পড়তে পারেন। ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। রাজনীতির জন্য জেল খেটেছেন। দেশের কঠিনতম মুহূর্তেও এক মুহূর্তের জন্য তার কোনো নৈতিক স্খলন ঘটেনি রাজনীতিতে। রাজনীতির হাল-হকিকত মাটিগন্ধী এই রাজনীতিবিদের চেয়ে আর কে ভাল  জানবেন। তাই তিনি অকপটে বর্তমান রাজনীতিকে গরীবের বউয়ের সাথে তুলনা করতে পারেন।

রাষ্ট্রপতির রাজনীতির এই স্বরূপ সন্ধান যে যথার্থ সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা যদি তার বক্তব্যটি একটু শুনে দেখে আসি তাহলে দেখবো তিনি বলেছেন- ‘আমি যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স পড়াইতে চাই, ভিসি আমাকে দিবে না৷ আমি যদি এত বছর রাজনীতি করার পর হাসপাতালে ডাক্তারি করতে চাই তাহলে বুঝেন হাসপাতালে কি অবস্থা হবে৷ আমি যদি এখন ফিজিক্স ক্যামেস্ট্রি পড়াইতে যাই তাহলে হাসির পাত্র হবো।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু রাজনীতি গরীবের বউয়ের মতো। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার সবাই ঢুকতে পারে। এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  ভিসি উনিও ৬২ বছর অবসরের পর হয়তো বলবেন আমিও রাজনীতি করবো। রাষ্ট্রপতি বলেন, যারা সরকারি চাকরি করেন জজ সাহেব, ৬৭ বছর রিটায়ার করে বলবেন আমিও রাজনীতি করি। আর্মির জেনারেল হয়, সেনাপ্রধান হয়৷ অনেক আগে রিটায়ারমেন্টে গিয়ে বলবে আমিও রাজনীতি করি৷ সরকারি সচিবরাও বলবে আমিও রাজনীতি করি। মনে হচ্ছে যখন যার ইচ্ছা, রাজনীতিতে ঢুকে পড়বে। তিনি বলেন, আমার মনে হয় এই ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দলের চিন্তা করা উচিত৷’

কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? কথায় আছে যার নাই কোনো গতি সেই করে রাজনীতি। আসলে রাজনীতি কি এতই সোজা? এমনও শোনা যায় আজকাল ‘রাজনীতির ভিতর পলিটিক্স ঢুকে গেছে।’ রাজনীতি মানে রাজার নীতি। সেই রাজা হতে হবে জনবান্ধব। আবার উল্টিয়ে বলা যায় ‘নীতির রাজা হচ্ছে রাজনীতি’। কিন্তু রাজনীতি যেন আজ পথ হারাতে বসেছে। সে কারণেই রাজনীতির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজনীতির ব্যাপারে একেবারেই অনাগ্রহী। এ কারণে ছাত্র রাজনীতিরও করুণ দশা। মেধারীরা রাজনীতিতে আসতে চায় না। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে সেই দলের লেজুড়বৃত্তি করাই এখন ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। এতে টুপাইস কামানো যায়। রাতারাতি বাড়ি-গাড়ির মালিকও হওয়া যায়। এটা কোনো কল্যাণকর অবস্থা হতে পারে না।

ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে ছাত্র নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। যারা পরবর্তীতে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হতেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্ররাজনীতিরই ফসল। তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ যারা পড়েছেন তারা বিষয়টি ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। প্রসঙ্গত ডাকসু নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এ ব্যাপারে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই। এর আগেও ঢাবির সমাবর্তনে তিনি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর কিছু তোড়জোড় চললেও ডাকসু নির্বাচন আলোর মুখ দেখেনি।

‘পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো’র মত গৌরবময় ছাত্র রাজনীতি আজ যেন বিপথে। সাংঘর্ষিক ছাত্র রাজনীতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থিরতা লেগেই আছে। গৌরবময় ইতিহাস থাকলেও ইদানীং যেন পথ হারিয়েছে ছাত্ররাজনীতি। যে কারণে জাতীয় স্বার্থ ত্যাগ করে দলীয় ও সঙ্কীর্ণ স্বার্থে আত্মকলহে লিপ্ত থাকছে অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন। লেজুড়বৃত্তিক মানসিকতাও প্রবল। এখন আর ছাত্রদের কল্যাণের জন্য ছাত্ররাজনীতি  নয়। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের মাধ্যমে রাতারাতি সম্পদশালী হওয়া, সম্মান, যশ, খ্যাতির দিকে ঝুঁকছে অনেকেই। এ কারণে নিঃস্বার্থপরতা বিদায় নিয়েছে। হল গুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি। সামান্য কারণে রক্তারক্তির মতো ঘটনা ঘটছে।

দীর্ঘদিন ধরে নেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক আধিপত্যও রীতিমত কালচারে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে সব কিছুতেই দলীয় বিবেচনা কাজ করায় ছাত্ররা অনেকক্ষেত্রে লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে হবে যে কোনো মূল্যে। বিশ্ববিদ্যালয় যেন রণক্ষেত্র না হয়।

অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ছাত্রদের সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চার মধ্যদিয়েই আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য যোগ্য হয়ে উঠতে হবে। এজন্য শুধু ডাকসু নয় এ ধরনের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। যে বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি।

পাদটীকা : বাংলাদেশের যা কিছু মহৎ অর্জন তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাজনীতির। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে স্বাধীনতা লাভ-সবকিছুতেই রাজনীতির অবদান অনস্বীকার্য। আজকের অগ্রসরমান বাংলাদেশের পেছনেও রয়েছে রাজনীতির অবদান। তবে ‘রাজনীতির ভেতর পলিটিক্স’ ঢুকে যাওয়ার কারণে তা এখন গরীবের বউ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রগতির অন্তরায়ও হচ্ছে এই রাজনীতি। আরো সহজ করে বললে রাজনীতিই এখন বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা। যখন নির্বাচন আসে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক শুদ্ধাচার ছাড়া এ থেকে মুক্তির উপায় নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আপনার মতামত লিখুন :