আমরা শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল চেয়েছিলাম!

প্রভাষ আমিন
ছবি: বার্তা২৪

ছবি: বার্তা২৪

  • Font increase
  • Font Decrease

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ। তিনি আমাদের দাবি মেনে নিয়েছেন, প্রজ্ঞাপন হয়ে গেছে। এখন আর ১ম ও ২য় শ্রেণির চাকরিতে কোটা থাকবে না। সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠী অনগ্রসর চাকরি করবে। আর আমরা অগ্রসর অংশ মেধার লড়াই করে চাকরির ক্রিম খাবো। অনগ্রসর বা মুক্তিযোদ্ধার সেন্টিমেন্ট ব্যবহার করে চাকরি পাওয়ার দিন শেষ, বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ।

আমরা কিন্তু খুব কৌশলে সরকারকে ঘোল খাইয়েছি। মেধাবী তারুণ্যকে বোঝাতে পেরেছি, তোমাদের চাকরি পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের উত্তরসুরীরা। স্বাধীনতার পর থেকেই সরকারি চাকরিতে কোটা ছিল। কিন্তু আমরা কৌশলে এমনভাবে আন্দোলন করেছি, যেন বর্তমান সরকারই কোটা চালু করে মেধাবী তারুণ্যের চাকরির পথ আটকে রেখেছে। এমনকি আমরা কৌশলে ছাত্রলীগের ছেলেদেরকেও রাজপথে নামিয়ে দিয়েছি।

২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে ব্যাপক জাগরণ ঘটেছিল। এর বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষেও একটা গণজাগরণ দরকার ছিল। তো স্বাধীন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে বলতে বাধো বাধো ঠেকে, চক্ষুলজ্জায় আটকায়। তাই তরুণ প্রজন্মের বেকারত্বের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাদের মাঠে নামিয়ে দিলাম। ব্যস আমাদের কাজ অর্ধেক হয়ে গেল। তরুণ প্রজন্ম স্বাধীন বাংলাদেশের রাজপথে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে তালে তালে স্লোগান দিচ্ছে, এর চেয়ে বড় বিজয় আর কী হতে পারে আমাদের।

২০১৩ সালে কোটা আন্দোলনে সফল হতে না পারলেও গণজাগরণ মঞ্চ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে যে গণজোয়ার সৃষ্টি করতে পেরেছিল, আমরা কোটা আন্দোলন দিয়ে তা স্তিমিত করতে পেরেছি। যে শাহবাগে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে স্লোগান উঠেছে, সেই শাহবাগেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে স্লোগান উঠেছে; এও তো আমাদের কম বড় বিজয় নয়।

২০১৩ সালে সফল না হলেও আমরা হাল ছাড়িনি। আমরা জানি নির্বাচনের আগে আগে ঠিকমত চাপ দিতে পারলে যে কোনো দাবি আদায় করা সম্ভব। তাই মাঝখানে ৫ বছর চুপ থেকে আমরা আবার মাঠে নেমেছি ঠিক নির্বাচনের আগে। তবে পুলিশ ভাইদের ধন্যবাদ। তারা হামলা চালিয়ে আমাদের কাজটা সহজ করে দেয়। ছাত্রীরা নেমে আসে রাস্তায়। ভিসির বাসায় চলে নারকীয় তান্ডব। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আমাদের দখলে চলে আসে। শুধু ছবি দেখলে যে কেউ ভাববে বিপ্লব বুঝি হয়েই গেছে। বিশেষ করে 'পেছনে টিয়ার গ্যাসের ধোয়ায় অন্ধকারে সাথীদের রেখে একটি ছেলে পুলিশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, হাতে জাতীয় পতাকা' এমন একটি অসাধারণ ছবি তো ফেসবুকে গণ কাভার ফটো হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, কিন্তু তাদের হাতেই আবার তুলে দিলাম জাতীয় পতাকা। হা হা হা। একেই বলে বিষে বিষক্ষয়। আবার অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী বক্তৃতার আংশিক প্রচার করে তরুণ প্রজন্মকে ক্ষেপিয়ে তুলতে একটুও সময় লাগেনি। যে তরুণের বুকভরা দেশের জন্য ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি দারুণ কৌতুহল; তার বুকেই আমরা বুনে দিয়েছি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ঘৃণা। তারা এখন বুকে 'আমি রাজাকার' লিখে রাস্তায় দাড়ায়। এটা যে কত বড় বিজয়, বোঝাতে পারবো না।

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, হুমায়ুন আহমেদ তার এক নাটকে পাখির মুখে 'তুই রাজাকার' স্লোগান বসিয়ে দিয়ে দেশজুড়ে রাজাকারের বিরুদ্ধে ঘৃণার প্লাবন বইয়ে দিয়েছিলেন। লেখক-সাহিত্যিকরা যেখানে ভালোবাসা ছড়ায়, সেখানে হুমায়ুন আহমেদ ছড়ালেন ঘৃণ।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তুলে ঘৃণা ছড়ালেন জাহানারা ইমাম। আর সত্যি সত্যি ইসলামী চিন্তাবিদদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সেই ঘৃনাকে স্থায়ী রূপ দিলেন শেখ হাসিনা। আচ্ছা বলুন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এসে ভালোবাসা না ছড়িয়ে ঘৃণা ছড়ানোর কোনো মানে হয়? রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা প্রসঙ্গে জাতিকে যারা বিভক্ত করে, তারা দেশের উন্নয়ন চায় না। আমরা চাই, সবাই মিলেশিলে থাকবে, যে মেধাবী সে চাকরি পাবে; কার বাবা রাজাকার ছিল, এটা বিবেচনা করে যেন কাউকে বঞ্চিত করা না হয়। কার দাদা মুক্তিযোদ্ধা ছিল, সেটাও যেন বিবেচনা করা না হয়। এটাই আমাদের দাবি।

হুমায়ুন আহমেদের তুই রাজাকার, জাহানারা ইমামের গণআদালত আর শেখ হাসিনার ট্রাইব্যুনাল- মিলে যে ধারাবাহিক পরাজয়ের ইতিহাস; তার বিপরীতে বুকে 'আমি রাজাকার' লিখে রাজপথে কাউকে দাড় করাতে পারা যে কত বড় বিজয়, আসলেই বলে বোঝানো যাবে না।

৩০ বছর ধরে 'তুই রাজাকার' স্লোগান বুকে যে পাথর চাপা দিয়ে রেখেছিল, 'আমি রাজাকার' তা সরিয়ে দিল। আহা কী যে প্রশান্তি! এক আন্দোলনের কত যে বিজয়। তুই রাজাকার সমান সমান আমি রাজাকার। গণজাগরণ মঞ্চ সমান সমান কোটা সংস্কার আন্দোলন। বাহ, সব সমান সমান। দারুণ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড।

শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু কন্যা। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার আবেগ একটু বেশি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে একাধিকবার বলেছেন। কিন্তু আমরা পরিস্থিতি এমন জায়গায় নিয়ে গেলাম প্রধানমন্ত্রী রাগ করে কোটা বাতিল করে দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখের কথা শেষ পর্যন্ত প্রজ্ঞাপন আকারে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কলিজা ঠান্ডা হয়নি। আসলে আমাদের কলিজা কখনোই ঠান্ডা হবে না।

এখন আমরা বলছি, আমরা কোটা বাতিল চাইনি, সংস্কার চেয়েছি। হুম, সংস্কার চেয়েছি বটে। তবে আমাদের সংস্কার বাস্তবায়ন করা পৃথিবীর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের চাওয়ার আগেই সরকার সবচেয়ে বড় যৌক্তিক সংস্কারটা করে রেখেছিল- কোটায় লোক পাওয়া না গেলে পদ শূন্য না রেখে সাধারণ তালিকা থেকে তা পূরণ করা হবে। এবার এটি অর্ডার হয়েছে বটে, তবে গত তিনবছর ধরেই বিশেষ আদেশে এটি কার্যকর হচ্ছিল। আর তাতে ৫৫ ভাগ কোটা ৩০ ভাগে নেমে এসেছিল। তাতে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারতাম। কিন্তু সন্তুষ্ট হওয়া আমাদের লক্ষ্য নয়। আমরা চির অসন্তুষ্ট। কলিজা কেটে দিলেও আমাদের কলিজা ঠান্ডা হবে না।

আমাদের দাবি ছিল, কোটা ৫৫ ভাগ থেকে ১০ ভাগে নামিয়ে আনা। হা হা হা ১০ ভাগ কোটায় ৫ জনগোষ্ঠিকে ধারণ করা যে বানরের পিঠা ভাগের মতই অসম্ভব, সেটা যে কোনো বোকাও বুঝবে। কিন্তু মেধা যার, চাকরি তার; এই চটুল স্লোগান দিয়ে জাতিকে এমন ঘুম পাড়িয়েছি; তারা কিছুতেই বুঝতে পারছেন না আমাদের দুরভিসন্ধি। জেনেবুঝেই কোটা ১০ ভাগে নামিয়ে অসম্ভব দাবিটা আমরা দিনের পর দিন করে আসছি।

আসলে আমাদের মুখের দাবি আর মনের দাবি যে এক নয়, সেটা কেউ কেউ টের পেয়ে যান। সরকার কোটা বাতিল করে খুব অন্যায় করেছে। আমাদের তো দয়ার শরীর। আমরা সরকারের মত অবুঝ নই। আমরা প্রতিবন্ধী কোটা চাই, আদিবাসী কোটা চাই, নারী কোটাও চাই। আমাদের আপত্তি খালি মুক্তিযোদ্ধা কোটায়। মুক্তিযুদ্ধের নাম শুনলেই আমাদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়। স্বাধীনতার ৪৭ বছর আবার কিসের মুক্তিযোদ্ধা আর অমুক্তিযোদ্ধা। ২% পরিবারের জন্য ৩০% কোটা মহা অন্যায়। আপনারা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেন, সাহায্য দেন; তাদের পরিবারের কাউকে চাকরি দিয়েন না। তাদের চাকরি দিলে তো প্রশাসনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক বেড়ে যাবে। ৪৭ বছর আগে কি গন্ডগোল হয়েছিল, তা নিয়ে ভাবার টাইম আমাদের নাই। আমরা মেধাবী, সারাদিন পড়ি। আদর্শ-ফাদর্শ নিয়ে ভাবা, রাস্তায় মিছিল করা মানে সময় নষ্ট। পরীক্ষায় আমি ফার্স্ট। দেশ এখন কোটামুক্ত। আমার চাকরি ঠেকায় কে? যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ঠেকাতে পারিনি, কিন্তু তরুণ প্রজন্মকে ভুল বুঝিয়ে তাদের মাথায় বন্দুক রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের কিন্তু ঠেকিয়ে দিয়েছি। হা হা হা। চিয়ার্স।

আসলে সত্যি কথা বলি, পুরো কোটা বাতিল করার দরকার ছিল না, খালি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করলেই আমরা সন্তুষ্ট হতাম। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাদ দিলে কোটা নেমে আসতো ২৫ ভাগে। তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তখন চাইলে দয়া করে মুক্তিযোদ্ধাদের ২ ভাগ কোটা দিয়েও দিতে পারতাম। মুক্তিযোদ্ধারা মর্যাদায় সবার ওপরে থাকবে, এটাই আমাদের জ্বালা।

আমরা চাই তারা আমাদের করুণায় থাকুক। দেখেন না, এমন প্যাচ খেলেছি, মুক্তিযোদ্ধারা ফেসবুকে, আলোচনায় রীতিমত মাফ চাইছে, বাবারা আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি, চাকরির জন্য নয়। কোটা আমরা চাই না। তবুও তোমরা আমাদের আর অপমান করো না, গালাগাল করো না। মুক্তিযোদ্ধাদের এই করুণ দশা দেখতে আমাদের খুব ভালো লাগে। এটা আসলে এক ধরনের প্রতিশোধ।

এখন আরো মজা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের কেউ কেউ কোটা বহালের দাবিতে শাহবাগে রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করেছে। কিন্তু বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধার কাছে কোটাকে আমরা অবমাননা হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছি। তাই তারা বা তাদের উত্তরসুরীরা সে আন্দোলনে যায়নি। অল্পকিছু নাছোরবান্দা সেখানে অবস্থান নিয়েছে। তাতে পুরো বিষয়টিকে হাস্যকর করে তোলা গেছে। কয়েকদিন রাস্তা বন্ধ রাখতে পারলে সাধারণ মানুষও তাদের অপছন্দ করবে। আহা, এক আন্দোলনে কত মাত্রিক বিজয় যে আসছে একের পর এক। দেখানো যাচ্ছে, দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষের লোক ২০ থেকে ২০০। আর কোটার বিপক্ষের লোক হাজার হাজার, লাখ লাখ।

আদিবাসী, নারী আর প্রতিবন্ধীদের জন্য একটু খারাপ লাগছে বটে, তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ঠেকানো গেছে; এই অর্জনের তুলনায় সেই খারাপ লাগাটা কিছুই না। আমরা এখন মন দিয়ে পড়বো। কোটামুক্ত বিসিএসে পরীক্ষা দিয়ে ডিসি হবো, এসপি হবো, সচিব হবো। সারাজীবন ঘুষ খাবো। রিটায়ারমেন্টে গিয়ে ঘুষের টাকায় এমপি হবো, মন্ত্রী হবো। তবে আমরা আর দেশকে বিভক্তির পথে চলতে দিবো না। কে রাজাকার, কে মুক্তিযোদ্ধা; কে স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি, কে বিপক্ষ- ৪৭ বছর পর এসব বিতর্ক তুলে উন্নয়নের গতিকে মন্থর হতে দেবো না। একাত্তরে আমাদের বাপ-দাদারা যা পারেনি, আমরা তাদের সেই অসমাপ্ত স্বপ্ন শেষ করবো। তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ আমরা নেবোই নেবো।

জয়বাংলা। এই স্লোগানটা বলতে একটু অস্বস্তি লাগে বটে। কিন্তু যদ্দেশে যদাচার। আর কাটা তুলতে হয় কাটা দিয়েই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

আপনার মতামত লিখুন :