গেমচেঞ্জার ও মোদির গেম

শুভ কিবরিয়া
গেমচেঞ্জার ও মোদির গেম, শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তা২৪.কম

গেমচেঞ্জার ও মোদির গেম, শুভ কিবরিয়া, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে সম্প্রতি। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফরে এসে নানা রকম চুক্তি করে গেছেন। সবচেয়ে বড় চুক্তিটি হচ্ছে সমরাস্ত্র চুক্তি। এই চুক্তির ফলে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সামরিক উত্তেজনা বাড়তে পারে। আমেরিকাও এই অঞ্চলে তার বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে। ভারতের নীতি-নির্ধারকরা নানাভাবেই বলে আসছিলেন যে ভারত-রাশিয়া সমরাস্ত্র চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা হবে এই অঞ্চলে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম নিয়ামক। এটা কাজ করবে গেমচেঞ্জার হিসেবেই।

ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান বিএস ধানোয়া খোলামেলাভাবেই বলেছেন, রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভারতের হাতে এলে উপমহাদেশের খেলাটাই ঘুরে যাবে। কেননা, রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থায় শত্রু দেশের যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন চিহ্নিত করে তাকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে গুঁড়িয়ে দেবে। এই অস্ত্র হাতে থাকলে পাকিস্তানের সব বিমানঘাঁটিই ভারতের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। চীনও ভারতের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর আওতায় আসবে। পাকিস্তান আর চীন এই দুই শত্রুকে হাতের কব্জায় পেতে হলে চাই রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।

৪-৫ অক্টোবর ২০১৮ ১৯তম ভারত-রাশিয়া বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতে আসেন। এই সফরে পুতিন ভারতের সঙ্গে ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থাৎ ৩৯ হাজার কোটি টাকার এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ভারতের কাছে বিক্রির চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভারতের হাতে আসতে শুরু করবে।

রাশিয়ার এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম বিশ্বের সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাকে এখন বিশ্বের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থায় ৪০০ কিলোমিটার দূরের টার্গেট চিহ্নিত করা যাবে। একইসঙ্গে ৩৬টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পাশাপাশি একই সময়ে ৭২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া যাবে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতের বিমানবাহিনী সক্ষমতা অনেক গুণে বাড়িয়ে দেবে।

এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াও প্রতিরক্ষা, পরমাণু বিদ্যুৎ, মহাকাশ, রেলসহ বিভিন্ন খাতে মোট ২০টি চুক্তি হয়েছে। পুতিন-মোদি ইরানের তেল আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতেও কথা বলেছেন। চুক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়নে কাজ করতে সম্মত হয়েছে রাশিয়া।

আমেরিকা কী করবে
পুতিনের ভারত সফর রাশিয়ার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। কেননা এতে ভারত-রাশিয়া পুরনো সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে। কিন্তু অন্যদিকে ভারতের জন্য একটা বিপদের দিকও থেকে যায়। সেটা হলো এর ফলে আমেরিকার মার্কিন কাউন্টারিং অ্যামেরিকানস অ্যাডভার্সারিজ থ্রু স্যাঙ্কশান্স অ্যাক্টের (সিএএটিএসএ) অধীনে এই ধরনের সমরাস্ত্র কেনাবেচার ক্ষেত্রে আমেরিকার এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার ঝুঁকি আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই আইনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যেসব দেশ বাণিজ্য করবে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক এ ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছিল চীন। সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দেশটির কাছে হস্তান্তর শুরু করেছে রাশিয়া। এ কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে চীন।

রাশিয়ার কাছ থেকে সুখোই সু-৩৫ জঙ্গি বিমান এবং এস-৪০০ কেনার কারণে চীনের সামরিক বাহিনীর ওপর গত মাসে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। ভারতের ক্ষেত্রে কী ঘটে সেটা একটা দেখার বিষয়। কেননা, মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র বলেছেন, এস-৪০০ এয়ার অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমসহ অন্যান্য অস্ত্র সিস্টেম আপগ্রেডের বিষয়টি বিশেষভাবে সিএএটিএসএ আইনের দৃষ্টিতে থাকবে।

ভারতের যুক্তি
ভারতীয় সমর এস্টাবলিশন্টের চোখ প্রধানত চীন ও পাকিস্তানের দিকে। এই দুই দেশকে মোকাবিলায় তাদের দরকার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিজের হাতে থাকা। ইতোমধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ কিনেছে চীন। অতীতে আমেরিকার দিকে যত ঝুঁকেছে ভারত, সেই ফাঁকে রাশিয়ার কাছাকাছি হয়েছে চীন ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের ওপর মার্কিন প্রশাসন সম্প্রতি চাপ বাড়ানোর ফলে রাশিয়ার সঙ্গে নৌবাহিনী সমঝোতা চুক্তি করে বসেছে ইসলামাবাদ।

রাশিয়া-চীন-পাকিস্তানের এই মৈত্রীর দেয়াল ভাঙতে চায় ভারত। রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো বন্ধুত্বের দিনেই তাই ফেরত যেতে চায় ভারত। আঞ্চলিক রাজনীতির এমন মারপ্যাঁচে ভারত দুই কূলই রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ রাশিয়ার সঙ্গে পুরনো বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখে চীনকে রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন, তাদের থিওরি। সেই সূত্র মেনেই পুতিনকে স্বাগত জানানো হয়েছে ভারতে।

এ বছরে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনে ভারতের পূর্ণ সদস্য হওয়ার পেছনে সহযোগিতা করেছে রাশিয়া। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে ভারতের দীর্ঘদিনের চেষ্টাকেও সমর্থন করছে রাশিয়া। এই বন্ধুত্বে তাই ভারত সামরিক বাণিজ্যে আরও শক্তিমান দেখতে চায়।

চীনকে মোকাবিলা করতে ভারতকে পাশে চায় আমেরিকা। এটা সত্য। কিন্তু রাশিয়া, ইরানের মতো ভারতের বন্ধু দেশগুলো থেকে সামরিক ব্যবস্থা কিংবা তেল কিনলে আবার আইনি বেড়াজালে আটকাচ্ছে আমেরিকা। এই চাপের কাছে মাথা নোয়াতে চায় না ভারত। বরং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে আমেরিকার সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে ভারত। রাশিয়ার সঙ্গে এই মৈত্রীর সেটাও একটা বড় কারণ। যদিও আগামী বছরে ভারত-মার্কিন যৌথ সামরিক মহড়ার পরিকল্পনার কথা গত মাসেই ঘোষণা করা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে জরুরি সামরিক তথ্য আদান-প্রদানে সম্মত হয়েছে আমেরিকা।

ভারসাম্যের রাজনীতি
ভারত বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশগুলোর অন্যতম। শুধু তাই নয়, ভারত তার পুরনো সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়নের জন্যও ১০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে। এগুলোর অধিকাংশই সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে কেনা যার মধ্যে মিগ বিমানও আছে। আবার আমেরিকার কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভারত।

গত এক দশকে ভারত অনেক বেশি যুদ্ধাস্ত্র কিনেছে আমেরিকার কাছ থেকে। এই সময়ে ক্রমে রাশিয়ার সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে দিল্লির। এর মধ্যে বেড়ে চলে ভারতের শত্রুদেশ পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে রাশিয়ার মিত্রতা। বিশেষ করে রাশিয়া পাকিস্তানকে সামরিক হেলিকপ্টার বিক্রির সিদ্ধান্ত নিলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে এই একচোখা মার্কিন প্রীতির সম্পর্ক বদলাতে হবে। এই নীতির বদলে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রেখেই চলতে হবে। উল্টো দিকে রাশিয়াও আমেরিকাকে দেখাতে চাইছিল যে, ওয়াশিংটনের বাধা ও হুমকি মোকাবিলা করেই মস্কো তার সমরাস্ত্র বিক্রি করতে পারে।

এই ভারসাম্য রক্ষা করতেই গত কয়েক মাসে ভারতীয় কূটনীতিকরা ট্রাম্প প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগেই রাশিয়ার সঙ্গে পাকা কথা হয়ে গিয়েছে। ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা আমেরিকায় গিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার স্বার্থেই ভারতের দরকার দূরপাল্লার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সিস্টেম।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সমস্যায় আটকে নিজ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে রাজি নয় ভারত। এজন্য এই দুই গুরুত্বপূর্ণ মিত্রের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। ভারতের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য এই দুই রাষ্ট্রের গুরুত্বই অপরিসীম। এজন্য এই দুই রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ভারত। একের জন্য অপরকে বেছে নেওয়ার কূটনীতি করতে আগ্রহী নয় মোদি সরকার। আর এজন্যই যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্রয় করেছে মোদি সরকার। এতে করে ভারতের কূটনৈতিক পরীক্ষা যেন আরও জটিল হয়ে পড়লো।

ভারতের কূটনীতিকদের জন্য পরবর্তী পরীক্ষা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা হতে কিভাবে ছাড় পাওয়া যায় তার প্রচেষ্টা শুরু করা।

মোদির রাজনীতি
নরেন্দ্র মোদি পুতিনের ভারত সফরকে তার রাজনৈতিক সুবিধালাভের পক্ষে কাজ করাতে অতিমাত্রায় তৎপর। কেননা সামনের বছরে ভারতে লোকসভা নির্বাচন। মোদির জন্য এই নির্বাচন খুব সুখকর নাও হতে পারে। দেশজুড়ে বিরোধী দল এখন মোদির বিরুদ্ধে ফ্রান্স থেকে রাফায়েল যুদ্ধ বিমান কেনার দুর্নীতির তদন্ত দাবি করছে। মোদি, বিরোধী দলের এই আওয়াজকে স্তব্ধ করে দিতে রাশিয়ার সঙ্গে সমরাস্ত্র কেনার এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইবেন। ভারত, চীন ও পাকিস্তানকে টেক্কা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমরাস্ত্র কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে। এই ইমেজকে নির্বাচনে কাজে লাগাতে চাইবেন মোদি।

অন্যদিকে, ভারতের হাতে এস-৪০০ ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা আসায় সেটা পাকিস্তানের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। পাকিস্তান এখন চাইবে রাশিয়ার কাছ থেকে এ ধরনের যুদ্ধাস্ত্র কিনতে।

চীন, ভারতের পর তাই রাশিয়ার লক্ষ্য হলো- পাকিস্তানের সমরাস্ত্র বাজারে রাশিয়ার নয়া অনুপ্রবেশ। সে হিসেবে এই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বাজার বিস্তৃত হবে। আমেরিকাও নড়েচড়ে উঠবে। ভারতের বাজারে আমেরিকান অস্ত্রসম্ভার বিক্রির যে ব্যবস্থা এতদিন ধরে তৈরি করেছে মার্কিন প্রশাসন তা এখন আরো সক্রিয় হয়ে উঠবে। রাশিয়া-আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসার প্রতিযোগিতা এই অঞ্চলে বাড়বে। এই অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হবে সরকারগুলো। এই এলাকার রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়বে।

মোদি চেয়েছিলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়িয়ে তার রাজনৈতিক ইমেজকে নির্বাচনি মাঠে হাজির করতে। পাকিস্তান ও চীনকে শত্রু বানিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণাকে চাউর করে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে চান মোদি। আপাতত পুতিনের আগমন এবং রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনার সফল চুক্তির ফলে সেটা বাস্তবায়িত হোল। মোদির গেম সফল হোল।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

আপনার মতামত লিখুন :