পুঁথিগত বিদ্যা এবং দৈনিক শিক্ষার সমন্বয়ে গড়ে উঠুক সুশিক্ষা

রহমান মৃধা, ছবি: বার্তা২৪

কথায় আছে, শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষার ওপর লেখালেখি গবেষণা হয়েছে অনেক। কিন্তু স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেই কি সঠিক শিক্ষা অর্জন করা সম্ভব? পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি কর্ম জীবনের পথ নির্দেশনার গাইডলাইন মাত্র। আমাদের দৈনিক শিক্ষা বলে যে একটি কথা রয়েছে তার সমন্বয়ে যখন পুঁথিগত শিক্ষার আবির্ভাব ঘটে এবং সেই দৈনিক শিক্ষা যদি মানব কল্যাণে সুন্দর ও সময়োপযোগী হয় এবং তা যদি ‘ক্রিয়েট সাম ভ্যালু ফর ম্যানকাইন্ড’ তখনই এই দৈনিক শিক্ষার সঙ্গে পুঁথিগত শিক্ষার মিশ্রণের প্রতিফলনকে বলতে পারি সুশিক্ষা। তাই আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, শুধু শিক্ষা নয় “সুশিক্ষাই হোক জাতির মেরুদণ্ড”।

এখন প্রশ্ন, কী করে পাব এই সুশিক্ষা? আছে কি আমাদের মাঝে এমন কোনো উদাহরণ যা তুলে ধরার মত? অবশ্যই আছে।

ছেলেটির নাম শাহজাহান মিয়া, মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার নহাটা ইউনিয়নের এক পরিচিত নাম। সবাই তাকে চিনতে পারে, তবে আমার সঙ্গে তার পরিচয় কিছুদিন আগে। একজন অসহায় ব্যক্তির বিপদে সাহায্যের হাত বাড়াতে সে লিখেছে তার একটি পোস্টে যা আমার চোখে পড়েছিল। তার সেই মহৎ কাজের সাথী হতে তাকে চেনা জানার সুযোগ মিলেছে।

সে পেশায় একজন ব্যাংকার, বাংলার অতি সাধারণ পরিবার থেকে স্কুলের লেখাপড়া শেষ করে ঢাকা কলেজ থেকে অনার্স এবং মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে এবং তার স্ত্রীও ইডেন থেকে এমএসসি সম্পন্ন করে প্রথম শ্রেণি পায়। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে।

একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সে তার স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা, ভাই-বোন এবং তাঁদের পরিবার নিয়ে দিব্বি ম্যানেজ করে চলছে একটি স্বচ্ছল ও সুখি জীবন।

বসে বসে অন্ন ধ্বংস না করে বরং নিজের রোজগারে নিজের পরিবার নিয়ে সুন্দর ও সাধারণ জীবন যাপন তার পেশাগত শিক্ষা এবং কর্মের সমন্বয়ে দৈনিক শিক্ষার ওপর বেস্ট প্র্যাকটিস করে চলছে। সে তার পেশাগত কাজের আগের এবং পরের সময়টুকু ব্যবহার করে চলছে শিক্ষাকে আরও তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া কাজে। সে জন্য সে গ্রামের অবহেলিত ও অসহায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে ক্লাসের পাশাপাশি আলাদাভাবে ক্লাস করিয়ে তাদের শিক্ষার ক্রমোন্নয়ন করছে। সে বিনা বেতনে এসব শিক্ষার্থীদের পড়াতে এগিয়ে এসেছে এবং অনুপ্রেরণা দিচ্ছে অন্যকেও।

স্বার্থপরতার এই যুগে এমন বড় মনের মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। বর্তমান সময়ে যেখানে দেশে কোচিং বাণিজ্যের রমরমা বাণিজ্য চলছে সেখানে এমন স্বার্থত্যাগী মানুষ পাওয়া একটু কঠিনই বটে! এলাকার মানুষ শিক্ষিত হোক, তাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক সভ্যতার সবটুকু আলো- এটা তার বহুদিনের স্বপ্ন।

যে সব ছেলে-মেয়েরা একটা সময় পড়াশোনার প্রতি ছিল পুরোপুরি উদাসীন, আজ তারা কোন মন্ত্রবলে শিক্ষার প্রতি এমন আগ্রহী হয়ে উঠলো! এখানেই শাহজাহান মিয়ার কৃতিত্ব। সে শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষার চেতনা জ্বেলে দিয়েছে। আঁধারের মাঝে সে আলোর মশাল হাতে করে এসেছে, ফলে অজ্ঞতার যে আঁধার তা কেটে যেতে শুরু করেছে। হয়ত এই মশাল একদিন পুরো এলাকাকে আলোকিত করে তুলবে। এটি আমার ভাবনা!

জীবনের হাজারো সমস্যা মানুষকে বাধ্য করেছে মনের দুয়ার বন্ধ করে রাখতে। সে জন্যই রবী বিশ্বাসের মতো লোক যিনি ৩৭ বছর মানব কল্যাণে পল্লী চিকিৎসক হিসাবে জীবন উৎসর্গ করেছেন, অথচ হঠাৎ তার স্ট্রোকের কারণে একটি চোখ নষ্ট, আরেকটি নষ্টের পথে। কিন্তু সমাজের চোখে তা ধরা পড়ে নি, যা ধরা পড়েছে শাহজাহান এবং আরো কিছু মানুষের চোখে। সমাজের লাখো লাখো চোখ তাহলে কি থাকতেও আজ অন্ধ হতে চলেছে? কয়েকদিন আগে দেখলাম, শাহজাহান রক্ত দান করছে এবং অন্যকেও উৎসাহিত করছে।

সে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য ধরে রাখতে পোলো দিয়ে মাছ ধরার আয়োজন থেকে শুরু করে মাদক সেবন থেকে নতুন প্রজন্মকে দূরে রাখার জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানে সাহায্য করছে। সারাদিন পরিশ্রমের পরও একজন মানুষ যখন সমাজের আর দশজনের চিন্তা করে, এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে ভাবে, তখন তাকে একজন মহান মানুষ হিসেবে অভিহিত করলে হয়ত খুব বেশি বলা যাবে না। যারা সত্যিকারের ভালো মানুষ তারা হয়ত এমনই হয়! দেশের প্রতিটি গ্রামে যদি তার মতো হাজারো মানুষের দৈনিক শিক্ষার প্রতিফলন হয়, তাহলে অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে জাতিকে মুক্ত করা এবং ধর্ম, গণতন্ত্র, সমৃদ্ধি, বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করা ও একই সাথে ভন্ডামী ও অনৈতিকতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশ ও জাতির খেদমত করা সম্ভব। আমাদের প্রতিদিনের সেই কমিটমেন্ট যা আমাদের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”, শাহজাহান কি তাহলে তার এই প্রতিশ্রুতির ওপর দৈনিক শিক্ষার বেস্ট প্রাকটিস করে চলছেন?

যাই হোক না কেন, শাহজাহানের মতো মানুষ সমাজে প্রয়োজন যারা পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনিক শিক্ষার বেস্ট প্র্যাকটিসের সমন্বয় ঘটিয়ে সুশিক্ষার জন্য কাজ করছে। অরাজকতা, কুশিক্ষা ও দুর্নীতি ধ্বংস হোক, মানবতা এবং দৈনিক শিক্ষার জয় হোক, এটিই কামনা।

রহমান মৃধা: সুইডেন প্রবাসী

 

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

‘#মি টু’ বাংলাদেশ!

'#মি টু' বানে ভেসে যাচ্ছে ভারত। প্রায় সারাদেশ থেকেই ‘#মি টু’ বিস্ফোরণে দেশের গণ্যমান্য ও বিখ্যাত পুরুষেরা কুপোকাত ...

দুর্গাপূজার কাহিনী

ভয়-ভীতি, শঙ্কা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যেও বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজা করে। কারণ দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর সবচেয়ে বড় ...

নৈতিকতা যখন জাদুঘরে

সকাল ১০-১১টার দিকে আমি বাসা থেকে বের হলে প্রায়ই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখি। স্কুলের ইউনিফর্ম পরা বেশ কিছু ছেলেমেয়ে জোড়া...