একজন সাধারণ নাগরিকের নির্বাচন ভাবনা

মোঃ সামসুল ইসলাম, ছবি: বার্তা২৪

দেশে নির্বাচন আসন্ন। আমি বোঝার চেষ্টা করছিলাম, আমার মতো রাজনৈতিক পরিচয় বিহীন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঢাকাবাসীর কাছে নির্বাচন আসলে কী অর্থ বহন করে।

এটি চিন্তা করতে গিয়ে আমার বেশ আগে পড়া প্রখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক সাদত হাসান মান্টোর এক গল্পের নায়কের কথা মনে পড়লো। বাংলা অনুবাদ পড়া, ঠিক মনেও নেই। যেটুকু মনে আছে তাহলো, গল্পের নায়ক বিয়ের প্রথম রাত পার করার পরের দিন সকালে বাড়ির বারান্দায় যান। বারান্দায় বের হয়ে সেখানে টাঙানো দড়িতে তিনি মহিলাদের অর্থাৎ তার স্ত্রীর অন্তর্বাস ঝুলতে দেখেন। এবং সেই মূহুর্তেই গল্পের নায়ক প্রথমবারের মতো উপলদ্ধি করেন যে তিনি বিবাহিত। তার জীবনে পরিবর্তন এসেছে!

এ গল্প বলার কারণ এই যে একইভাবে হঠাৎ করেই বাসার আশে পাশে আমার আসনে মনোনয়ন প্রার্থী নেতাদের প্রচুর সাইনবোর্ড, পোস্টার ইত্যাদি ঝুলতে দেখে অনেক দিন পর আবার আমি উপলব্ধি করছি যে আমি একজন ভোটার! আমার জীবনেও পরিবর্তন আসছে! দীর্ঘদিন পর হলেও আমি এলাকার নেতা কর্মীদের আমার বাসায় দেখব। তাদের ভালোবাসায় আবার সিক্ত হবো।

আরো অবাক বিস্ময়ে দেখছি এবং শুনছি যে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা না করলেও ঢাকার এলাকায় এলাকায় মনোনয়ন প্রার্থীদের জনসংযোগ শুরু হয়েছে। জ্যামে পর্যুদস্ত এ শহরে এ আরেক বিড়ম্বনা। কারণ প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতারা এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। আমি ঢাকার যে এলাকায় থাকি সেখানে ক্ষমতাসীন এক আওয়ামী লীগের বন্ধু জানালেন আমাদের এ আসনে তাদের দল থেকেই মনোনয়ন প্রত্যাশী নাকি ২৩ জন!

এছাড়া বিএনপি, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি বড়ছোট বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও তো আছেন। আরো রয়েছেন বিভিন্ন পেশার স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। তাদের সাইনবোর্ড, পোস্টার রাস্তার মোড়ে মোড়ে ঝুলছে। নিতান্তই এক ভজঘট অবস্থা। এলাকায় যে এত নেতা তা কখনো জানতাম না। এসব দেখে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পেশার লোকদের হঠাৎ করে রাজনীতিতে আসার বিপক্ষে প্রেসিডেন্টের বক্তৃতার কথা যে কতটাই প্রাসঙ্গিক তা উপলদ্ধি করছি।

রাজনীতিতে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সেইসাথে নেই জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা, অথচ নির্বাচন মৌসুমে অনেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন মনোনয়নের জন্য – তাদের প্রভাব বা অর্থের কাছে হেরে যান এলাকার অনেক ত্যাগী নেতা। আশা করি রাজনৈতিক দলগুলো আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের এ বক্তব্য আমলে নেবেন – আমলা বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা বিত্তবানদের মনোনয়ন দেয়া থেকে বিরত থাকবেন।

একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমি বলবো না যে আমার এলাকায় বা আশেপাশে কোনো উন্নয়ন হয়নি। এটি বললে তো মিথ্যা কথা বলা হবে। রাস্তাঘাটসহ এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন তো থেমে নেই। আর এখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে রাজনৈতিক নেতা যেমন সংসদ সদস্যদেরও সংশ্লিষ্টতা থাকে। তবে যেটার অভাব দেখি তাহলো উন্নয়নে জনসম্পৃক্ততা। উন্নয়নকে সবসময়ই একপেশে ও চাপিয়ে দেয়া ব্যাপার মনে হয়। জনগণের মতামত থাকে অবহেলিত।

যেমন বিগত কয়েক বছরে আমি আমার এলাকায় পাশে নতুন রাস্তা দেখছি। আরো শুনছি বাসা থেকে কিছুটা দূরে নাকি চার লেন সড়ক হবে। এর জন্য নাকি আশেপাশের জায়গা অধিগ্রহণ করা হবে। এলাকার সবাই জানেন কিছু একটা হবে বা হতে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ জানেন না সঠিক ব্যাপারটি। আমিও এলাকায় জানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। আবার কার কাছে গেলে প্রকৃত তথ্যটি জানা যাবে তাও কেউ জানেন না। যারা উন্নয়ন পরিকল্পনা করেন তাদের কাছে জনগণ একটি দূরবর্তী ব্যাপার। অথচ রাজনৈতিক নেতাদের মূল লক্ষ্যই হওয়া উচিত সর্বপ্রথম জনগণের মতামত নেয়া, তাদের জানানো।

পত্রপত্রিকায় মাঝেমাঝেই দেখি বা শুনি অনেক সংসদ সদস্যই নাকি তার এলাকায় থাকেন না। এলাকার সমস্যা মানুষ কার কাছে বলবে সেটাতো এক বড় সমস্যা। যেমন ঢাকায় আমরা যারা অনেকদিন থেকে আছি তারাও আসলে একধরণের দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগি এলাকার সমস্যা নিয়ে। আমরা কি সিটি কর্পোরেশনে কাউন্সেলরের কাছে যাবো নাকি এমপির কাছে যাবো সেটাও অনেকে জানি না। পত্রিকাগুলোতে আগে চিঠিপত্রের কলামে বিভিন্ন এলাকার সমস্যগুলো পাঠকের লেখাতেই তুলে ধরত। অথচ মিডিয়ার বিপ্লবের এ যুগে পাঠক বা দর্শকের প্রতিক্রিয়া প্রকাশে আমাদের মিডিয়ার এখন নিদারুণ অনীহা।

আমি আরেকটি উদাহরণ দেই। ঢাকার মিরপুর মাজার রোডের ক্রসিং যেটিকে পুরোনো গাবতলী বলা হয় সেটি এক ভয়াবহ বিপদজনক ক্রসিং। মিরপুর গাবতলী বাস টার্মিনালের ঠিক আগের বাসষ্ট্যান্ড হওয়াতে এটি ভয়ানক ব্যস্ত এক রাস্তা – চার রাস্তার মোড়ে পারাপার ভীষণ কঠিন এক ব্যপার। আমি প্রায়শই দেখি বৃদ্ধ, বৃদ্ধা, ছাত্রছাত্রী ভীষণ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাও অপ্রতুল। অথচ ভারি ভারি যানবাহন এ রাস্তা দিয়ে হয় সাভারের দিকে যাচ্ছে নতুবা ঢাকার ভেতরে ঢুকছে।

প্রায়শই আমার মনে হয় আমার উচিত এ সমস্যাটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো। কিন্ত কে সেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ? তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? পত্রিকায় চিঠিপত্রের কলাম তো এখন সংকুচিত। বিকল্প হলো কোনো সাংবাদিককে ধরে পত্রিকায় বা টিভিতে নিউজ করাতে হবে। সেটাও একটা কঠিন ব্যাপার। আমার কথাতেই বা তারা হুট করে আসবে কেন? আমার যেটা মনে হয়, অনেকে নাগরিকই ঠিক একই সমস্যায় ভোগেন, কার কাছে যাবেন বোঝেন না।

নির্বাচনের প্রাক্কালে আমার সব দলের অধিকাংশ জনপ্রতিনিধিদের সাথে জনগণের এই বিচ্ছিন্নতা আরো বেশিমাত্রায় মনে পড়ে। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির এই উন্নয়নের যুগে জনপ্রতিনিধিরা তাদের এলাকার জনগণের সাথে সহজেই সম্পর্ক রাখতে পারেন। মোবাইল, ইন্টারনেট আর ইমেইলের যুগে এটিতো কোনো কঠিন কাজ নয়।

সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে আমি সব রাজনৈতিক দলের কাছে এটাই চাইব যে যারা জনগণের সাথে আছেন, জনগণকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট করতে আগ্রহী এমন প্রতিনিধিদের মনোনয়ন দেন। তারাই জাতীয় সংসদে জনগণের আশা আকাঙ্খাকে তুলে ধরতে পারবেন। একজন অতি সাধারণ নাগরিক বা ভোটার হিসেবে আমরা এর চেয়ে বেশি আর কিইবা চাইতে পারি!

মোঃ সামসুল ইসলাম: গবেষক ও কলামিস্ট

যুক্তিতর্ক এর আরও খবর

নির্বাচনের অর্থনীতি

দীর্ঘ বিরতির পর আবার নির্বাচনী আমেজে সরগরম হয়েছে সারাদেশ। কারণ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিরোধী দল বর্জন করায় ভোট...

//election count down